তৃতীয় মুণ্ডক, দ্বিতীয় অধ্যায়ে মূলত ব্রহ্মজ্ঞানের স্বরূপ এবং মুক্ত জীবাত্মার চূড়ান্ত গন্তব্য বা মোক্ষ লাভের প্রক্রিয়া আলোচনা করা হয়েছে। মহর্ষি অঙ্গিরা এখানে বুঝিয়েছেন যে, কীভাবে একজন সাধক জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত হয়ে পরম ব্রহ্মের সাথে একীভূত হন।
মূলত, এই অধ্যায়টি আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মবিদ্যার চূড়ান্ত পরিণতি, যেখানে সাধক চিরতরে সংসার চক্র থেকে মুক্তি পেয়ে পরম সত্যে লীন হয়ে যান।
তৃতীয় মুণ্ডক দ্বিতীয় অধ্যায়
স বেদৈতৎ পরমং ব্রহ্মধাম
যত্র বিশ্বং নিহিতং ভাতি শুভ্রম্।
উপাসতে পুরুষং যে হ্যকামাস্তে
শুক্ৰমেতদতিবর্তন্তি ধীরাঃ॥১।।
অন্বয়: সঃ (যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন); এতৎ পরমং ব্রহ্মধাম (এই পরম আশ্রয় ব্রহ্মকে); বেদ (জানেন); যত্র (যাঁতে); বিশ্বম্ (জগৎ); নিহিতম্ (নিহিত আছে); শুভ্রং ভাতি (যিনি শুদ্ধ ও প্রকাশিত); যে অকামাঃ ধীরাঃ হি (যে নিষ্কাম জ্ঞানী ব্যক্তিরা); পুরুষম্ উপাসতে (সেই পুরুষের উপাসনা করেন); তে (তাঁরা); এতৎ (এই); শুক্রম্ (শুক্র সম্ভূত শরীরকে); অতিবর্তন্তি (অতিক্রম করেন)।
সরলার্থ: যে-ব্যক্তি নিজ আত্মাকে জানেন, তিনি ব্রহ্মকেও জানেন—যে-ব্রহ্ম জগৎকে ধারণ করে রেখেছেন। তিনি একথাও জানেন—এই জগৎকে যে দেখা যায় তার কারণ এ জগৎ ব্রহ্মে আশ্রিত। যে-সকল সাধক নিষ্কামভাবে ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের উপাসনা করেন, তাঁদের আর পুনর্জন্ম হয় না।
ব্যাখ্যা: ‘সঃ বেদ’—যখন কোন ব্যক্তি জানেন। কি জানেন? ‘এতৎ পরমং ব্রহ্মধাম’—এই পরম ব্রহ্মকে জানেন। ব্রহ্মই পরম, সর্বোচ্চ। কোন বিশেষণে তাঁকে বিশেষিত করা যায় না। ‘ব্রহ্মধাম’ বলতে ব্রহ্মের আবাসকে বোঝায়। এ ব্ৰহ্মত্বের অবস্থা অর্থাৎ যে অবস্থায় সাধক ব্রহ্মের সঙ্গে একহয়ে যান। সমগ্র বিশ্ব এই ব্রহ্মধামেই নিহিত আছে। যাঁরা একথা জানেন তাঁরা জন্ম-মৃত্যুর পারে চলে যান। এই শ্লোকে ‘অতিবর্তন্তি’ শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরিণামে আমরা সবাই এই অবস্থাই লাভ করব। ‘অতি’ শব্দটির অর্থ হল অতিক্রম করা আর ‘বর্তন’ অর্থ অস্তিত্ব। ‘শুক্রম্’ বলতে প্রাণবীজকে বোঝানো হয়েছে। তাঁরা প্রাণবীজকে অতিক্রম করেন। প্রাণবীজকে অতিক্রম করার অর্থ মৃত্যুর পারে যাওয়া। মানুষ যখন জন্ম-মৃত্যুর পরে যায় তখনই সে মুক্ত হয়। বর্তমানে আমরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ। বারে বারে আমরা এই পৃথিবীতে ফিরে আসি। কিন্তু ব্রহ্মধামে একবার প্রবেশ করতে পারলে, একবার ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্নতা অনুভব করতে পারলে আমরা জন্ম-মৃত্যুর চক্রকে অতিক্রম করে মুক্ত হয়ে যাই।
কামান্ যঃ কাময়তে মন্যমানঃ
স কামভির্জায়তে তত্র তত্র।
পর্যাপ্তকামস্য কৃতাত্মনস্তু
ইহৈব সর্বে প্রবিলীয়ন্তি কামাঃ॥২।।
অন্বয়: যঃ (যে ব্যক্তি); কামান্ মন্যমানঃ (কাম্য বস্তুসমূহের চিন্তা করে); কাময়তে ([তা] আকাঙ্ক্ষা করে); সঃ (সেই ব্যক্তি); কামভিঃ (সেই সকল কামনার দ্বারা); তত্র তত্র (সেই সেই স্থানে [যেখানে কাম্যবিষয় সকল ভোগ করতে পারবে]); জায়তে (জন্মগ্রহণ করে); পর্যাপ্তকামস্য (যাঁর কামনা পূর্ণ হয়েছে); কৃতাত্মনঃ তু (এবং আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন); [তাঁর] ইহৈব (এই জন্মেই); সর্বে কামাঃ (সমস্ত কামনা); প্রবিলীয়ন্তি (বিলীন হয়ে যায়)।
সরলার্থ: যে-সকল ব্যক্তি বাসনা তাড়িত হয়ে ভোগ্য বস্তু লাভের আশায় তার পেছনে ছোটে সেই সব ব্যক্তি কাম্য বিষয়ের মধ্যেই পুনরায় জন্মগ্রহণ করে। অপর দিকে, যিনি আপ্তকাম (অর্থাৎ যে-ব্যক্তির সকল কামনা বাসনা পূর্ণ হয়েছে) তিনি এই জীবনেই নিজ আত্মাকে উপলব্ধি করেন, এবং তাঁর সকল বাসনার নিবৃত্তি হয়।
ব্যাখ্যা: যথার্থ জ্ঞানী ব্যক্তি কখনও ক্ষণস্থায়ী বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হন না। সকল অনিত্য বস্তুকে তিনি এড়িয়ে চলেন। তিনি নিত্য অর্থাৎ যা চিরস্থায়ী, অবিনাশী সেই সব বস্তুই কামনা করেন। তিনি জানেন যে, ত্যাগই আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতির চাবিকাঠি। কিন্তু ধরা যাক, কোন ব্যক্তি কামনা বাসনার দ্বারা তাড়িত—সেই ব্যক্তি মৃত্যুর পর এমন পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন যেখানে তিনি কাম্য বস্তুগুলি ভোগ করতে পারেন। ‘সঃ কামভিঃ জায়তে তত্র তত্র’—কামনা বাসনা অনুযায়ী তাঁর পুনর্জন্ম হয়। এই কামনা বাসনাই আমাদের পুনর্জন্মের জন্য দায়ী। আমরা অর্থ, ক্ষমতা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা এসব লাভ করতে চাই। আমরা যা কামনা করি সেই কামনা অনুযায়ী আমরা আবার জন্মগ্রহণ করি। কিন্তু যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন, তার আর কোন কামনা বাসনা থাকে না। ‘পর্যাপ্তকামস্য’—যাঁর সকল কামনা পূর্ণ হয়েছে। ‘কৃতাত্মনঃ’—ত্যাগ ও চিত্তশুদ্ধির দ্বারা তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেন। তখন তাঁর কেমন অবস্থা হয়? উপনিষদ বলেছেন যে, ‘ইহ এব’—এখানেই, এ জীবনেই; ‘সর্বে কামাঃ প্রবিলীয়ন্তি’—তাঁর সকল কামনা বাসনা সমূলে বিনষ্ট হয়। তিনি পূর্ণকাম, আপ্তকাম। তিনি তাঁর আত্মাতেই তৃপ্ত। তিনি তখন আত্মা বহির্ভূত অন্য কোন বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করেন না।
ইদানীং আমরা মনোবিজ্ঞানীদের বলতে শুনি যে, এ যুগে আমরা নিজেরাই নিজেদের অপরিচিত। আমরা যেন নিজেরাই নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আমাদের ভেতরে নিরন্তর সংগ্রাম চলছে। আমার মস্তিষ্ক আমারই হৃদয়ের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত, আবার আমার কর্ম হয়তো আমার চিন্তার বিরোধী। সামঞ্জস্যের অভাবে আমরা পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠতে পারি না। কিন্তু বহু প্রাচীন কালেই ভারতীয় ঋষিরা এই সমস্যার সমাধান দিয়ে গেছেন: ‘কৃতাত্মা’—আত্মাতে স্থিত হও। নিজ আত্মাকে জয় করো। ব্রহ্মধামে প্রবেশ করলে সাধক নিজেকে জানতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তিনিই সেই একও অদ্বিতীয় আত্মা। তিনিই পরম অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ। আত্মজ্ঞানেই সব দ্বন্দ্বের অবসান।
নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো
ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন।
যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্যস্তস্যৈষ
আত্মা বিবৃণুতে তনুং স্বাম্॥৩।।
অন্বয়: অয়মাত্মা (এই আত্মা); প্রবচনেন (শাস্ত্র অধ্যয়নের দ্বারা); ন লভ্যঃ (লাভ করা যায় না); ন মেধয়া (বুদ্ধি বা বিচারশক্তির দ্বারা নয়); বহুনা (বার-বার); শ্রুতেন ন (শাস্ত্র-শ্রবণের দ্বারাও নয়); [যিনি] এষঃ (সে (সাধক]); যম্ এব (সেই পরমাত্মাকেই); বৃণুতে ( পেতে ইচ্ছা করেন); তেন (সেই [আন্তরিক] ইচ্ছার দ্বারাই); লভ্যঃ (লাভ করা যায়); তস্য (তাঁর [সেই সাধকের] কাছে); এষঃ আত্মা (এই আত্মা); স্বাম্ (নিজের); তনুম্ (স্বরূপ); বিবৃণুতে (প্রকাশ করেন)।
সরলার্থ: পাণ্ডিত্যের দ্বারা আত্মাকে লাভ করা যায় না, বুদ্ধি বা বিচার শক্তির দ্বারাও নয়। আবার শাস্ত্র শ্রবণের দ্বারাও তাঁকে পাওয়া যায় না। সাধকের আন্তরিক ইচ্ছার দ্বারাই তাঁকে লাভ করা যায়। সেই সাধকের কাছে তিনি নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন।
ব্যাখ্যা: যা আয়ত্ত করা যেতে পারে, এমন বস্তু আত্মা নন। আবার আত্মা আমার থেকে পৃথক কোন বস্তুও নন। সুতরাং আত্মাকে অর্জন করাও যায় না। বস্তুকে যেভাবে আয়ত্ত করা হয় সেভাবে আত্মাকে আয়ত্ত করা যায় না। কারণ, যাকে আয়ত্ত করা হয় তাকে একদিন না একদিন ছেড়েও দিতে হয়। আমি আমার থেকে পৃথক কোন বস্তুকে অর্জন করতে পারি। কিন্তু আমি আমাকে অর্জন করব কেমন করে? আমাদের অন্তরতম সত্তাই হলেন এই আত্মা।
‘নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ’—যুক্তিতর্কের দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায়। ‘মেধয়া’—বুদ্ধির দ্বারাও নয়। ‘ন বহুনা শুতেন’—আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক শোনার পরেও তা দুর্বোধ্য বলে মনে হতে পারে। তবে তাঁকে কেমন করে পাওয়া যায়? ‘যম্ এব এষঃ বৃণুতে তেন লভ্যঃ’। এখানে ‘যম্’ বলতে আত্মাকে এবং ‘এষঃ’ বলতে সাধককে বোঝানো হয়েছে। সাধক যদি আন্তরিকভাবে এবং নিষ্ঠা সহকারে একমাত্র আত্মাকেই লাভ করতে চান তবে ‘তেন লভ্যঃ’—তার দ্বারা তিনি আত্মাকে উপলব্ধি করেন। অর্থাৎ আন্তরিকভাবে আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত আত্মজ্ঞান লাভ হয় ততক্ষণ এই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আত্মাকে বাইরে নয় নিজের ভেতরে খুঁজতে হবে। হৃদয়দুয়ার যদি বন্ধ থাকে তবে সেই দরজায় করাঘাত করতে হবে। তবে একদিন না সেই দরজা খুলে যাবেই।
‘তস্য এষঃ আত্মা বিবৃণুতে তনুম্ স্বাম্’—সেই সাধকের কাছে (তস্য) আত্মা তখন নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন। আত্মা তখন নিজেকেই প্রকাশ করেন। এর ফলে সহসা যেন আমি আমাকেই আবিষ্কার করি। এ যেন দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখে বলছি, ‘হায়! আমি দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন কেউ এসে আমার হাতটা সরিয়ে দেন। তিনি গুরু হতে পারেন, শাস্ত্র হতে পারেন কিংবা কোন উপলব্ধিও হতে পারে। কিন্তু যে-মুহূর্তে হাত দুটো সরে যায় সেই মুহূর্তেই দেখা যায়। আত্মসাক্ষাৎকার ঠিক এভাবেই হয়।
নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যো
ন চ প্রমাদাত্তপসো বাঽপ্যলিঙ্গাৎ।
এতৈরুপায়ৈর্যততে যস্তু বিদ্বাং-
স্তস্যৈষ আত্মা বিশতে ব্রহ্মধাম॥৪।।
অন্বয়: অয়মাত্মা (এই [আলোচ্য] আত্মা); বলহীনেন (দুর্বল ব্যক্তির দ্বারা [যাঁরা আত্মাতে নিজেকে উৎসর্গ করেন না); ন লভ্যঃ (লভ্য নয়); প্রমাদাৎ ন চ (অমনোযোগী হলেও তাঁকে লাভ করা যায় না); অলিঙ্গাৎ তপসঃ বা অপি ন (বৈরাগ্যহীন তপস্যা দ্বারাও তাঁকে লাভ করা যায় না); যঃ বিদ্বান্ (যিনি জ্ঞানী); তু (কিন্তু); এতৈঃ উপায়ৈঃ যততে (এই সকল উপায় সযত্নে চেষ্টা করেন); তস্য (তাঁর [অর্থাৎ ঐ জ্ঞানী ব্যক্তির]); এষঃ আত্মা (এই আত্মা); ব্রহ্মধাম (ব্রহ্মরূপ আশ্রয়ে); বিশতে (প্রবেশ করেন)।
সরলার্থ: দুর্বল ব্যক্তি কখনও আত্মাকে জানতে পারেন না। আবার যাঁরা আত্মনিষ্ঠ নন তাঁরাও আত্মাকে জানতে পারেন না। একই ভাবে বলা যায় যে, ত্যাগ-বৈরাগ্য-হীন কঠোর পরিশ্রমের (দৈহিক অথবা মানসিক) দ্বারাও তাঁকে লাভ করা যায় না। কিন্তু যে-সকল জ্ঞানী ব্যক্তিরা কঠোর পরিশ্রমের সাথে এই সব উপায়গুলিকে অভ্যাস করেন, তাঁরাই আত্মাকে জানতে সক্ষম হন। অর্থাৎ তাঁরা ব্রহ্মধামে প্রবেশ করেন এবং এই নিখিল বিশ্বের সাথে এক হয়ে যান।
ব্যাখ্যা: কঠ উপনিষদে আত্মজ্ঞান লাভের পথকে ‘ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ক্ষুরের তীক্ষ্ণ অগ্রভাগের মতোই এ পথ দুর্গম। এ পথ দুর্বলের জন্য নয়। সাধককে শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বলে বলীয়ান হতে হবে। আচার্য শঙ্কর বলেন যে, যারা সংসারে আসক্ত এবং ইন্দ্রিয়সুখে মত্ত তারাই বলহীন অর্থাৎ দুর্বল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা এ কথা বলতে পারি। একই সাথে ঈশ্বর ও তাঁর ঐশ্বর্যকে (অর্থাৎ জগৎকে) লাভ করা যায় না। আমাদের যে কোন একটা পথ বেছে নিতে হবে। যদি আত্মাকে চাই, তবে শুধুমাত্র আত্মাকেই উপাসনা করতে হবে। এখানে কোন রকম আপস করা চলবে না।
‘ন চ প্রমাদাৎ’—প্রমাদ বলতে এখানে আলস্য, অবহেলা এবং অযত্নকে বোঝানো হয়েছে। এর আর এক অর্থ হল ইন্দ্রিয়সুখকে প্রশ্রয় দেওয়া। অর্থাৎ আরামপ্রিয় সুখী ব্যক্তি অলস জীবন যাপন করে। এখানে ‘তপসঃ’ কথাটির অর্থ জ্ঞান—জ্ঞান বলতে ত্যাগহীন (অলিঙ্গাৎ) শুষ্ক পাণ্ডিত্যকে বোঝানো হয়েছে। আমি একজন পণ্ডিত ব্যক্তি বা সুবক্তা হতে পারি, আমার অনেক উদ্ভাবনী শক্তিও থাকতে পারে, কিন্তু তা যদি আমি বাস্তবে প্রয়োগ না করি, আমার যদি ত্যাগ না থাকে তবে সেই জ্ঞান বৃথা।
কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি ত্যাগ, বৈরাগ্য ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে এই সব শর্ত পূরণে সক্ষম হন (এতৈঃ উপায়ৈঃ যততে) অর্থাৎ তিনি যদি শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক সব অবস্থাতেই দৃঢ় হন, তখন তিনি কি অবস্থা লাভ করেন? ‘বিদ্বান্ তস্য এষঃ আত্মা বিশতে ব্রহ্মধাম’, তিনি ব্রহ্মধামে প্রবেশ করেন (বিশতে)। সাধক যখন নিজ আত্মাকে উপলব্ধি করেন, তখন তিনি জ্ঞানী ব্যক্তিতে (বিদ্বান্) পরিণত হন।
সংপ্রাপ্যৈনমৃষয়ো জ্ঞানতৃপ্তাঃ
কৃতাত্মানো বীতরাগাঃ প্রশান্তাঃ।
তে সর্বগং সর্বতঃ প্রাপ্য ধীরা
যুক্তাত্মানঃ সর্বমেবাবিশন্তি॥৫।।
অন্বয়: ঋষয়ঃ (ঋষিরা [যাঁরা আত্মাকে জেনেছেন]); এনম্ (এঁকে [পরমাত্মাকে]); সংপ্রাপ্য (সম্যক্-ভাবে জেনে); জ্ঞানতৃপ্তাঃ (সেই আত্মজ্ঞানের দ্বারা তৃপ্ত হয়ে); কৃতাত্মানঃ (আত্মস্বরূপ হয়ে); বীতরাগাঃ (নিরাসক্ত); প্রশান্তাঃ [ভবন্তি] (সংযতেন্দ্রিয় [হন]); যুক্তাত্মানঃ তে ধীরাঃ (এই সকল নিত্য সমাহিত জ্ঞানী ব্যক্তিরা); সর্বগম্ (সর্বব্যাপী ব্রহ্মকে); সর্বতঃ প্রাপ্য (সর্বত্র প্রাপ্ত হয়ে); সর্বম্ এব আবিশন্তি (পূর্ণব্রহ্মে প্রবেশ করেন)।
সরলার্থ: সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা জ্ঞান লাভ করে সেই জ্ঞানে তৃপ্ত হন। এর ফলে তাঁদের বিষয়াসক্তি দূর হয় এবং তাঁরা প্রশান্তি লাভ করেন। এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা সর্বব্যাপী ব্রহ্মের সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন। ব্রহ্মে লীন হয়ে তাঁরা সর্বত্র এবং সর্ববস্তুতে অবস্থান করেন।
ব্যাখ্যা: আত্মাকে বোধে বোধ হলে ঋষিগণের আর কিছু জানবার থাকে না। তখন তাঁরা নিজেদের মধ্যে নিজেরাই ডুবে যান—‘আত্মতৃপ্ত’। এ অবস্থায় তাঁরা সকল দ্বিধা এবং সংশয়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। উপনিষদ পূর্বেই এ কথা বলেছেন, ‘ভিদ্যতে হৃদয় গ্রন্থিঃ ছিদ্যন্তে সর্ব সংশয়াঃ’, অর্থাৎ তাঁর হৃদয়ের সমস্ত জটিলতা দূর হয় এবং সকল সংশয় নাশ হয়। ঋষিগণ ‘বীতরাগাঃ’ অর্থাৎ আসক্তিমুক্ত হন, এবং ‘প্রশান্তাঃ’—অর্থাৎ তাঁদের মন তখন ধীর স্থির ও শান্ত। এমন অবস্থায় কোন বিরোধ বা উদ্বেগের অবকাশ থাকে না; ঋষিরা তখন পরম শান্তি লাভ করেন। এমন ব্যক্তির ইন্দ্রিয়সকল সংযত এবং তাঁর কোন আবেগ বা উচ্ছ্বাস থাকে না। তিনি শিশুর মতো সদা প্রফুল্ল ও আনন্দে ভরপুর হয়ে থাকেন। সাধুদের ‘বালবৎ’ বলা হয়ে থাকে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বুদ্ধি দিয়ে এই প্রশান্ত অবস্থার ব্যাখ্যা করা চলে না। একমাত্র যিনি ব্রহ্মকে উপলব্ধি করেছেন তিনিই পরম শান্তি অনুভব করে থাকেন।
‘সর্বগম্’ বলতে কি বোঝায়? এর অর্থ ব্ৰহ্ম, আত্মা। আকাশের মতো ব্রহ্মও সর্বত্র বিরাজ করেন। একমাত্র আকাশকেই ব্রহ্মের সঙ্গে তুলনা করা চলে। কারণ উভয়েই সর্বব্যাপী।
‘ধীরাঃ’—প্রাজ্ঞ ব্যক্তি, ‘সর্বতঃ প্রাপ্য’ অর্থাৎ আত্মাকে সম্পূর্ণভাবে জেনে, আত্মার সঙ্গে এক হয়ে যান (যুক্তাত্মানঃ)। অর্থাৎ আত্মাই হয়ে যান। তারপর ‘সর্বম্ এব আবিশন্তি’—সর্ববস্তুতে তাঁরা নিজেদেরকেই দেখেন। তখন ‘আমি-তুমি’র (অম্মদ্-যুম্মদ্) ভেদ চিরতরে ঘুচে যায়। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের গলার ঘা (ক্যানসার) যখন তীব্র হয় তখন তাঁর খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। শিষ্যরা কাকুতি মিনতি করে তাঁকে বলেন : ‘মা (ভবতারিণী) তো আপনার কথা খুব শোনেন, আপনি একবার মাকে বলুন না, যাতে আপনার খাওয়াটা বন্ধ না হয়।’ কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণদেব এই প্রস্তাবে রাজী হন না। শিষ্যরা তখন বলতে থাকেন: ‘অন্তত আমাদের মুখ চেয়ে আপনি মাকে একথা বলুন।’ শেষপর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণ মায়ের কাছে এই প্রার্থনা জানালে মা তাঁকে দেখান, তিনি শত মুখে খাচ্ছেন। অর্থাৎ এক আত্মাই সর্বত্র এবং সর্ববস্তুতে বিরাজ করছেন। ‘সবম্’ বলতে এ অবস্থাকেই বোঝানো হয়। মানুষ তখন সর্বত্র নিজেকেই দর্শন করে।
বেদান্তবিজ্ঞানসুনিশ্চিতর্থাঃ
সন্ন্যাসযোগাদ্যতয়ঃ শুদ্ধসত্ত্বাঃ।
তে ব্রহ্মলোকেষু পরান্তকালে
পরামৃতাঃ পরিমুচ্যন্তি সর্বে॥৬।।
অন্বয়: বেদান্ত-বিজ্ঞান-সুনিশ্চিতার্থাঃ (বেদান্তশাস্ত্রের দ্বারা যাঁদের প্রতিপাদ্য সুনিশ্চিত হয়েছে); সন্ন্যাসযোগাৎ শুদ্ধসত্ত্বাঃ (সন্ন্যাস বা ত্যাগ-বৈরাগ্যের দ্বারা যাঁদের চিত্তশুদ্ধি হয়েছে); তে সর্বে যতয়ঃ (সেই সকল সাধকরা); পরামৃতাঃ ([আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে] অমৃতত্ব লাভ করেন); পরান্তকালে (দেহত্যাগের সময়ে); ব্রহ্মলোকেষু (ব্রহ্মলোকসমূহ প্রাপ্ত হয়ে); পরিমুচ্যন্তি (মুক্ত হন)।
সরলার্থ: যাঁরা বেদান্তশাস্ত্রের মর্মার্থ জেনেছেন, ত্যাগ বৈরাগ্য অভ্যাসের ফলে যাঁদের চিত্তশুদ্ধি হয়েছে এবং যাঁদের স্বার্থবুদ্ধি চিরতরে ঘুচে গেছে সে সকল সাধকরা এই জীবনেই আত্মাকে উপলব্ধি করেন এবং মৃত্যুকালে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মে লীন হন।
ব্যাখ্যা: যখন আমি ‘আমাকে’ আবিষ্কার করি তখন আমি সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্ত হই। কখনও কখনও আমরা ‘হস্তামলকবৎ’ শব্দটি বলে থাকি। এই কথাটির অর্থ হল আমার হাতের মুঠোর মধ্যে একটি ফল আছে। স্বাভাবিক ভাবেই, আমি ফলটিকে দেখতে পাই ও অনুভবও করে থাকি। ফলটি যে আমার হাতের মুঠোতেই আছে এ ব্যাপারে আমার কোন সংশয় নেই। ঠিক এ ভাবেই আমরা যখন জানতে পারি আত্মজ্ঞান লাভই জীবনের লক্ষ্য এবং বেদান্ত আমাদের সেই শিক্ষাই দেয় তখন আর কোন সংশয় বা বিভ্রান্তি থাকে না। অর্থাৎ তখন আমি আমাকে জানতে সচেষ্ট হই। আত্মজ্ঞান ছাড়া পৃথিবীর কোন কিছুই আর তখন আমাকে আকৃষ্ট করে না।
‘সন্ন্যাস’ কথাটির অর্থ কি? সন্ন্যাস অর্থাৎ ‘সম্যক্ ন্যাস্’। ‘ন্যাস্’ অর্থাৎ ত্যাগ, বৈরাগ্য আর ‘সম্যক্’ অর্থ পুরোপুরি। অর্থাৎ যিনি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেন। কি ত্যাগ করেন? এই জগৎ সংসারকে। বর্তমানে এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকেই আমি সত্য বলে মনে করি। কিন্তু এই জগতের ঊর্ধ্বে আরও কিছু আছে যা আমার অজানা। কিন্তু যখন আমি এই জগতের প্রতিষ্ঠাভূমি অর্থাৎ ব্রহ্মকে জানতে পারি, তখন এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সংসারকে আমি প্রত্যাখ্যান করি। তখন আমি উপলব্ধি করি এ জগৎ অনিত্য অর্থাৎ মিথ্যা। ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। যিনি নিত্য সত্যকে লাভ করেছেন, আপেক্ষিক সত্য আর তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারে না। সাধক তখন নিত্য-অনিত্য বস্তু বিচার করে অনিত্য বস্তু ত্যাগ ও নিত্য বস্তু গ্রহণ করেন। একেই বলা হয় সন্ন্যাসযোগ। দীর্ঘকাল ধরে ত্যাগ-বৈরাগ্য অনুশীলনের দ্বারা সাধকের চিত্তশুদ্ধি হয়। অর্থাৎ তিনি শুদ্ধ-সত্ত্ব হন।
‘যতয়ঃ’ বলতে আত্মজ্ঞান লাভে সচেষ্ট তপস্বীদের বোঝায়, তাঁরা শুদ্ধ ও পবিত্র। দীর্ঘকাল ধরে ত্যাগ অভ্যাসের ফলে তাঁদের সকল কামনা বাসনা সমূলে বিনষ্ট হয়। ‘পরান্তকালে’—পরা এবং অন্তকালে। ‘অন্তকাল’ কথাটির অর্থ মৃত্যু এবং ‘পরা’ কথাটির অর্থ ‘চুড়ান্ত’। ব্রহ্মজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে ‘পরান্তকালে’ বলতে অন্তিম মৃত্যুকে অর্থাৎ শেষ জন্ম বোঝায়। যখন কোন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে তখন সে মৃত্যু আর একটি জীবনের সূচনা করে। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ এর ব্যতিক্রম। মৃত্যুর পর তাঁরা আর এ পৃথিবীতে ফিরে আসেন। না। ‘পরামৃতাঃ’—তাঁরা অমর হন। ‘পরিমুচ্যন্তি’ অর্থাৎ তিনি মোক্ষ লাভ করেন। একেই নির্বাণ বলা হয়। আচার্য শঙ্কর নির্বাণ অবস্থাকে নিভে যাওয়া প্রদীপ বা ভেঙ্গে টুকরো হয়ে যাওয়া মাটির পাত্রের সাথে তুলনা করেছেন। সাধক যখন মোক্ষ লাভ করেন তিনি তখন স্বর্গ বা অন্য কোথাও যান না। তিনি তখন ব্রহ্মে প্রবেশ করেন, অর্থাৎ ব্রহ্মের সঙ্গে এক হয়ে যান। ব্রহ্ম বলতে কোন ‘লোক’ বোঝায় না। মুক্ত পুরুষ তাঁর গন্তব্য পথের কোথাও কোন পদচিহ্ন রেখে যান না। যেমন, পাখি যখন ওড়ে এবং মাছ যখন জলে সাঁতার কাটে তখন পাখির পাখার দাগ বাতাসে বা মাছের ডানার দাগ জলে পড়ে না। মুক্ত পুরুষের আর আসা যাওয়া থাকে না।
গতাঃ কলাঃ পঞ্চদশ প্রতিষ্ঠা
দেবাশ্চ সর্বে প্রতিদেবতাসু।
কর্মাণি বিজ্ঞানময়শ্চ আত্মা
পরেঽব্যয়ে সর্ব একীভবন্তি॥৭।।
অম্বয়: [তেষাম] পঞ্চদশ কলাঃ ([তাঁদের] পনেরটি অংশ); প্রতিষ্ঠাঃ গতাঃ (তাঁদের কারণ অবস্থায় ফিরে যায়) সর্বে দেবাশ্চ (এবং সকল ইন্দ্রিয়সমূহ); প্রতি-দেবতাসু (নিজ নিজ অধিষ্ঠাত্রী দেবতায় প্রবেশ করে); কর্মাণি (কর্মসকল); বিজ্ঞানময়ঃ চ আত্মা (এবং বিজ্ঞানময় আত্মা); সর্বে (সকল); পরে অব্যয়ে একীভবন্তি (অব্যয় পরব্রহ্মে একত্ব লাভ করে)।
সরলার্থ: তখন দেহের পনেরটি অংশ তাদের মূল কারণাবস্থায় ফিরে যায়। ইন্দ্রিয়গুলিও তাদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতায় লীন হয়। কেবলমাত্র সঞ্চিত কর্ম যা এখনও ফল দিতে শুরু করেনি এবং বিজ্ঞানময় আত্মা অব্যয় পরব্রহ্মে একত্ব লাভ করে।
ব্যাখ্যা: সাধক যখন জ্ঞান লাভ করেন, যখন জানেন ‘তিনি কে’ তখন তিনি কি অবস্থা প্রাপ্ত হন? কি ধরনের অভিজ্ঞতাই বা তাঁর হয়ে থাকে? ‘একীভবন্তি’ এক হয়ে যান। সব কিছু তখন একে লীন হয়। ‘কলাঃ’ অর্থ খণ্ড বা অংশ। যখন আমরা আত্মাকে উপলব্ধি করি তখন এই অংশগুলি তাদের উৎসে ফিরে যায়। উপনিষদ বলছেন যে, এরকম পনেরটি অংশ আছে। আক্ষরিক অর্থে এগুলিকে ঠিক অংশ বলা যায় না। এই কলাসমূহ একই আত্মার প্রকাশ মাত্র। সেগুলি কি কি? ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ হল প্রাণ, দ্বিতীয় শ্রদ্ধা। অন্যগুলি যথাক্রমে ‘পঞ্চভূত’—আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল এবং পৃথিবী; ‘পঞ্চ ইন্দ্রিয়’, মন, খাদ্য, বীর্য, তপস্যা, বেদসমূহ, যাগ-যজ্ঞ, লোকাদি এবং তাদের নাম সমূহ। জীবাত্মাতে এই সব উপাদানই রয়েছে। কিন্তু আত্মোপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই এই উপাদান সকল অদৃশ্য হয় অর্থাৎ এগুলি তাদের উৎসে ফিরে যায় ।
‘দেব’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘দেব’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ, ‘যা প্রকাশ করে’। এর দ্বারা ‘পঞ্চেন্দ্রিয়’ অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বককে বোঝায়। এই সব ইন্দ্রিয় (তথা দেব) তাদের মূল উৎসে (অর্থাৎ প্রতিদেবে) ফিরে আসে। হিন্দুমতে ‘পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়’ সমষ্টি উপাদান থেকেই এসেছে। জীবাত্মার বিনাশের সঙ্গে সঙ্গেই তার অংশ তাদের সমষ্টি উৎসে ফিরে যায়।
তারপর হল কর্ম। হিন্দু দর্শনে কর্মের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। যদি প্রশ্ন করা যায়: ‘আমি গরীব কেন?’ হিন্দু দর্শন অনুযায়ী আমার কর্মফল এর জন্য দায়ী। আমাদের চরিত্র, জীবনের মান, এ সব কর্মফলের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। কর্মই আমাদের বদ্ধ করে। আবার এমন কিছু কর্ম থাকতে পারে যা এখনও ফল দিতে শুরু করেনি। এগুলিকে বলা হয় সঞ্চিত কর্ম। আত্মাকে জানতে পারলে এ জাতীয় কর্মের নাশ হয়।
বিজ্ঞানময় আত্মা বলতে এখানে জীবাত্মাকে বোঝানো হচ্ছে। জীবাত্মারও লয় হয়। তখন এই সব বস্তু অর্থাৎ জীবাত্মা কোথায় যায়? পরমাত্মায় ফিরে যায়। তখন জীবাত্মা পরমাত্মা হয়ে যান। পরমাত্মা থেকে পৃথক স্বতন্ত্র জীবরূপে তাঁর আর কোন অস্তিত্ব থাকে না। আচার্য শঙ্কর পরমাত্মার মহত্ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে কতগুলি সুন্দর শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন ব্রহ্ম হচ্ছেন পরা অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ; ‘অনন্তর’—অসীম; ‘অদ্বয়’—এক ও অদ্বিতীয়; শিব, শান্ত ও সমাহিত। সবশেষে আচার্য বলেছেন, সবকিছুই ব্রহ্ম।
সাধক যখন ব্রহ্মে লীন হন তখন তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান। আমরা ব্রহ্ম হয়েই আছি কিন্তু অবিদ্যার জন্য আমরা তা বুঝি না। শরীর অসুস্থ হলেই মনে করি আমিই অসুস্থ। আবার এই মুহূর্তে আমি হয়তো সুখী, ঠিক পর মুহূর্তেই দুঃখী। কারণ দেহমনের সঙ্গে আমরা নিজেদের এক করে ফেলি। ফলে দেহমনের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমিও যেন পরিবর্তিত হতে থাকি। আমি হয়ে যাই সতত পরিবর্তনশীল। কিন্তু পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে যাওয়াই আমাদের জীবনের লক্ষ্য। এই যে পরিবর্তন ঘটে তার কারণ আমি আমার প্রভু নই, আমি এখনও নিজেকে জয় করতে পারিনি। নিজেকে জয় করা যায় কিভাবে? একমাত্র আত্মজ্ঞান লাভেই তা সম্ভব।
আবার নিজেকে যখন পরমাত্মা বলে বোধ হয়, তখন দেখি অন্যদের মধ্যেও সেই আমিই রয়েছি। একরূপে আমি এখানে বসে আছি আবার অন্যরূপে আমিই ঘুরে বেড়াচ্ছি; আর একরূপে আমি হয়তো গান গাইছি, আবার কোথাও বা আমি লিখছি। নানা রূপে নানা পরিস্থিতিতে ও নানা কর্মের মধ্যে দিয়ে একই আত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন। সর্বত্র সেই একই আত্মা রয়েছেন। একথা সত্য যে, জগৎ বৈচিত্রময় এবং এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এই বৈচিত্রের পেছনে ঐক্য রয়েছে।
উপনিষদ বলছেন: ‘একীভবন্তি’, তারা এক হয়ে যায়। অর্থাৎ কার্য ও কারণ অভিন্ন হয়ে যায়। সূর্য এক কিন্তু তার প্রতিবিম্ব অনেক। প্রতিবিম্বগুলি বিভিন্ন পাত্রে প্রতিফলিত হয়। এখন পাত্রগুলি যদি সরিয়ে নেওয়া যায় তবে প্রতিবিম্বগুলি সূর্যেই ফিরে যায়। তখন সূর্য ও তার প্রতিবিম্বের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না; তারা এক হয়ে যায়। এই জন্যই বলা হয় যে, এক দেখাই জ্ঞান আর বহু দেখাই অজ্ঞান।
যথা ন্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রে-
ঽস্তং গচ্ছন্তি নামরূপে বিহায়।
তথা বিদ্বান্নামরূপাদ্বিমুক্তঃ
পরাৎপরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্॥৮।।
অন্বয়: যথা (যেরূপ); স্যন্দমানাঃ নদঃ (প্রবহমান নদী); নামরূপে (নাম এবং রূপ); বিহায় (ত্যাগ করে); সমুদ্রে (সমুদ্রে); অস্তম্ (অস্ত অর্থাৎ মিশে); গচ্ছন্তি (যায়); তথা (সেইরূপ); বিদ্বান্ (ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ); নামরূপাৎ (নাম ও রূপ থেকে); বিমুক্তঃ [সন] (মুক্ত হয়ে); পরাৎ পরম্ (সর্বশ্রেষ্ঠ [হিরণ্যগর্ভ, ঈশ্বর, ব্রহ্মা ইত্যাদি]); দিব্যম্ (জ্যোতিস্বরূপ); পুরুষম্ (পরমাত্মাকে); উপৈতি (প্রাপ্ত হন)।
সরলার্থ: বহমান নদীগুলি নিজেদের নামরূপ ত্যাগ করে অবশেষে সমুদ্রে মিশে যায়। অনুরূপভাবে ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ নামরূপ থেকে মুক্ত হয়ে জ্যোতিস্বরূপ পরমাত্মায় লীন হয়ে যান।
ব্যাখ্যা: ‘যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ’—যেমন বহমান নদীগুলি; ‘সমুদ্রে অস্তং গচ্ছন্তি’—সমুদ্রে মিলিত হয়। নদীগুলি সমুদ্রে মিলে গেলে কি অবস্থা প্রাপ্ত হয়? তারা নামরূপের পারে চলে যায়। তখন বলা যায় না যে, সমুদ্রের এই অংশটি গঙ্গা, আর ওই অংশটি যমুনা। তখন শুধুই জল। নদীগুলি তাদের স্বতন্ত্রতা হারিয়ে সাগরে মিশে যায়—‘একীভবন্তি’। অর্থাৎ নদীগুলি সমুদ্রেই পরিণত হয়। আত্মজ্ঞান লাভে আমরা অনুরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হই। এখন আমি নিজেকে পরমাত্মার থেকে পৃথক বলে মনে করি—‘আমি শ্ৰীযুক্ত অমুক, বা শ্ৰীমতী অমুক’। আমরা সকলেই এরকম মনে করে থাকি। আর এই দুই-বোধ থেকে নানা সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এমনকি বন্ধুরাও একে অপরকে হিংসা ও সন্দেহ করতে থাকে। নিজের স্বরূপ না জানার ফলেই এইসব অঘটন ঘটে।
স্বভাবতই নামরূপের গণ্ডির মধ্যে আমরা নিজেদের বদ্ধ করে ফেলি। স্বামী বিবেকানন্দ একবার এক যুবককে ‘ক্যাবলা’ বলে ডাকেন। যুবকটি তাঁকে বলে: আপনি আমাকে ‘ক্যাবলা’ বলছেন কেন? ওটা তো আমার নাম নয়। এর উত্তরে স্বামীজী বললেন: নামে কী আসে যায়? আমার নাম স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু তোমার ইচ্ছা হলে তুমি আমাকে অন্য যে কোন নামে ডাকতে পার। তাতে কিছুই যায় আসে না। কারণ ‘আমি’ তো নাম নই।—এটিই মূল কথা। অনুরূপভাবে, কোন ব্যক্তি হয়তো লম্বা কেউ আবার বেঁটে, কেউ হয়তো ফরসা, আবার কেউ বা কালো হতে পারেন, কিন্তু এসবই উপাধি মাত্র। আর উপাধির জন্যই আমরা নিজেদের একে অপরের থেকে পৃথক বলে মনে করি। আমাদের এই দেহও একটা উপাধিমাত্র।
‘নামবদপে বিহায়’—নিজেদের নাম রূপ হারিয়ে; ‘সমুদ্রে অস্তং গচ্ছত্তি’—নদীগুলি সমুদ্রে মিলিত হয়। ‘তথা’—সেই ভাবে, ‘বিদ্বান্’—যিনি নিজ আত্মাকে জানেন অর্থাৎ যাঁর বোধে বোধ হয়েছে তিনি। ‘নামরূপাৎ বিমুক্তঃ’—নামরূপের বন্ধন থেকে মুক্ত হন। অর্থাৎ সকল বন্ধন থেকেই তিনি মুক্ত। একেই নির্বাণ বলা হয়। ‘উপৈতি’—তিনি পৌঁছান অর্থাৎ পরমাত্মায় লীন হন। ‘পরাৎ পরম্’—এমনকি আত্মা পরমের থেকেও শ্রেষ্ঠ, সর্বশ্রেষ্ঠ। ‘দিব্যম্’—আত্মা শুদ্ধ এবং জ্যোতির্ময়। ‘পুরুষম্’—আত্মাকে পুরুষও বলা হয় কারণ ইনি সর্বব্যাপী। এই আত্মা সর্বত্র ও সকলের মধ্যে বিরাজ করেন। ইনিই সকলের অন্তরস্থ আত্মা।
স যো হ বৈ তৎ পরমং ব্রহ্ম বেদ
ব্ৰহ্মৈব ভবতি নাস্যাব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি।
তরতি শোকং তরতি পাপ্মানং
গুহাগ্রন্থিভ্যো বিমুক্তোঽমৃতে ভবতি॥৯।।
অন্বয়: যঃ হ বৈ (যে কেউ); তৎ (সেই); পরমং ব্রহ্ম (পরব্রহ্মকে); বেদ (জানেন); সঃ (তিনি); ব্রহ্ম এব (ব্রহ্মই); ভবতি (হন); অস্য (এঁর); কুলে (বংশে); অব্ৰহ্মবিৎ ন ভবতি (কেউই অব্রহ্মবিদ্ হন না); সঃ (তিনি); শোকং তরতি (শোককে অতিক্রম করেন); পাপ্মানং তরতি (পাপকে অতিক্রম করেন); গুহাগ্রন্থিভ্যঃ (হৃদয়ের অজ্ঞানরূপ গ্রন্থি থেকে); বিমুক্তঃ [সন্] (সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে); অমৃতঃ (অমর); ভবতি (হন)।
সরলার্থ: যিনি পরব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান, এবং তাঁর বংশে কেউ ‘অব্রহ্মবিদ্’ জন্মায় না। তিনি সব শোকদুঃখের পারে চলে যান। হৃদয়ের অজ্ঞানতাজনিত বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন।
ব্যাখ্যা: ‘সঃ যঃ হ বৈ ব্রহ্ম বেদ ব্ৰহ্মৈব ভবতি’—যিনি ব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান। এই উপনিষদের শুরুতে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই শ্লোকে তারই উত্তর দেওয়া হল। প্রশ্নটি ছিল : কি জানলে বা কাকে জানলে সব কিছুকে জানা যায়। এর উত্তরে উপনিষদ বলছেন : ‘যদি আমি ব্ৰহ্মকে জানি, তবে আমি ব্রহ্মাই হয়ে যাই। এবং তখনই আমি সবকিছুকে জানতে পারি।’
‘নাস্যাব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি’—পিতা যদি ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ হন তবে তাঁর বংশের সকলেই ব্রহ্মজ্ঞ হবেন। এ কেমন করে সম্ভব? কারণ পিতার প্রভাব তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে ঘিরে যাঁরা থাকেন তাঁরাও তখন ব্রহ্ম হয়ে যান। এই পরিবারের সকলেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন। এই জ্ঞান চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে প্রদীপ জ্বলছে তার চারপাশে কোথাও অন্ধকার থাকতে পারে কি? অনুরূপভাবে যখন আমি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করি তখন আমার চারপাশের মানুষও এই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়। এখানে একথাটিই বোঝানো হয়েছে।
‘শোকং তরতি’—তিনি শোকদুঃখের পারে যান। শুধুমাত্র দুঃখই নয়, তিনি সুখেরও পারে চলে যান। ‘পাপ্মানং তরতি’—তিনি পাপকে অতিক্রম করেন। একই সঙ্গে তিনি পুণ্যকেও অতিক্রম করেন। ‘গুহাগ্রন্থিভ্যঃ’, গুহা বলতে এখানে হৃদয়কে বোঝানো হয়েছে। আত্মার অবস্থান তো এই হৃদয়ে। আমার স্বরূপজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত আমি অজ্ঞানতার জালে বদ্ধ।
‘অমৃতঃ ভবতি’—তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন। তিনি অমর হন, কারণ তিনি যে ব্রহ্মই হয়ে গেছেন। এ অনেকটা সাগরে জলবিন্দু পড়ার মতো। সাগরে জলবিন্দু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সাগরের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। সেইভাবে মানুষ যখন ব্রহ্মকে জানেন তখন তিনি ব্রহ্মই হয়ে যান। এই জন্যই উপনিষদ সকলকে আত্মজ্ঞান লাভে সচেষ্ট হতে বলছেন। আমাদের সকল সমস্যার মূলে আছে অবিদ্যা অর্থাৎ অজ্ঞানতা। এই অজ্ঞানতাকে দূর করতে পারলেই মুক্তির পথ খুলে যায়। এই অবস্থায় মানুষ পরম শান্তি ও আনন্দ লাভ করেন।
তদেতদৃচাঽভ্যুক্তম্—
ক্রিয়াবন্তঃ শ্রোত্রিয়া ব্ৰহ্মনিষ্ঠাঃ
স্বয়ং জুহ্বত একৰ্ষিং শ্রদ্ধয়ন্তঃ।
তেষামেবৈতাং ব্রহ্মবিদ্যাং বদেত
শিরোব্রতং বিধিবদ্ যৈস্তু চীর্ণম্॥১০।।
অন্বয়: ঋচা (ঋক্-মন্ত্র দ্বারা); তৎ এতৎ (এই যে [সত্য]); অভ্যুক্তম্ ( প্রকাশিত হল); [যে] ক্রিয়াবন্তঃ (শাস্ত্রের নিয়ম মেনে যাঁরা কাজ করেছেন); শ্রোত্রিয়াঃ (বেদজ্ঞ); ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ [পুরুষঃ] (ব্রহ্মনিষ্ঠ পুরুষরা); শ্রদ্ধয়ন্তঃ (শ্রদ্ধাবান হয়ে); স্বয়ম্ (নিজেই); একৰ্ষিম্ (একর্ষি নামক অগ্নিতে); জুহ্বতে (আহুতি দেন); যৈঃ তু (যাঁদের দ্বারা); বিধিবৎ (যথা বিধি); শিরোব্ৰতম্ (মস্তকে অগ্নি ধারণ পূর্বক যে ব্রত); চীৰ্ণম্ (অনুষ্ঠিত হয়েছে); তেষাম্ এব (তাঁদের কাছেই); এতাম্ (এই); ব্রহ্মবিদ্যাম্ (ব্রহ্মবিদ্যাকে); বদেত (বলবে)।
সরলার্থ: শাস্ত্র বলেন : যিনি শাস্ত্রের নিয়ম মেনে কর্ম করেন, শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, ব্রহ্মনিষ্ঠ হন, একৰ্ষি যজ্ঞানুষ্ঠান করেন এবং শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী মস্তকে অগ্নি ধারণ করেন, তিনিই একমাত্র ব্রহ্মবিদ্যালাভের পক্ষে উপযুক্ত; অন্যরা নয়।
ব্যাখ্যা: ‘তৎ এতৎ ঋচা অভুক্ত’—ঋক্-বেদে একথাই বলা হয়েছে। উপনিষদ এখানে আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, এই জ্ঞান সকলের জন্য নয়। তখনকার দিনে আচার্যরা এই জ্ঞানদানের ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। ব্রহ্মজ্ঞান লাভের যোগ্যতা সকলের থাকে না। কে এই জ্ঞানলাভে সক্ষম? ‘ক্রিয়াবন্তঃ’—যাঁরা শাস্ত্র নির্দেশিত কর্ম সম্পন্ন করেছেন; ‘শ্রোত্রিয়াঃ’—যাঁরা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন; ‘ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ’—যাঁদের মন ব্রহ্মে সমর্পিত; ‘স্বয়ং জুহুতে একৰ্ষিম্’—যাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে একৰ্ষি যজ্ঞানুষ্ঠান করেছেন। একৰ্ষি যজ্ঞ সম্বন্ধে আমরা এখন কিছুই জানি না, শুধু জানা যায় যজ্ঞটি বড়ই দুরূহ। ‘শ্ৰদ্ধয়ন্তঃ’—যাঁরা আন্তরিকতা সম্পন্ন। ‘শিরোব্রতম্’—যে যজ্ঞে যজমানকে মস্তকে অগ্নি ধারণ করতে হয়। ‘বিধিবৎ যৈঃ তু চীর্ণম্’—যাঁরা এই সব যজ্ঞ বিধি মতে পালন করেছেন। উপনিষদের মতে কেবলমাত্র এই সব মানুষই ব্রহ্মবিদ্যালাভের পক্ষে উপযুক্ত। সাধককে তাঁর কর্তব্য পালন করতে হবে এবং শ্রদ্ধা আন্তরিকতার সাথে এই বিদ্যার্জনে আগ্রহী হতে হবে। মূল কথাটি হল, যদি আমি সত্যিই ব্রহ্মকে জানতে চাই তবে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং কষ্টকে মেনে নিতে হবে। এভাবেই সাধক নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য প্রস্তুত করেন। এর ফলে সাধকের চিত্তশুদ্ধি হয়। আর জ্ঞান তখন আপনা আপনিই প্রকাশ পায়।
তদেতৎসত্যমৃষিরঙ্গিরাঃ পুরোবাচ নৈতদচীর্ণব্রতোঽধীতে।
নমঃ পরমঋষিভ্যো নমঃ পরমঋষিভ্যঃ॥১১।।
অন্বয়: পুরা (প্রাচীন কালে); ঋষিঃ অঙ্গিরাঃ (অঙ্গিরা নামক ঋষি); তৎ এতৎ সত্যম্ উবাচ (সেই সত্যকে বলেছিলেন [তাঁর শিষ্য শৌনককে]); অচীর্ণব্রতঃ (যিনি ব্রত আচরণ করেননি); এতৎ ন অধীতে (তিনি এই [উপনিষদ] পাঠ করেন না); পরমঋষিভ্যঃ (ব্রহ্মবিদ্ ঋষিগণকে); নমঃ (নমস্কার); পরমঋষিভ্যঃ (ব্রহ্মবিদ্ ঋষিগণকে); নমঃ (নমস্কার)।
সরলার্থ: পুরাকালে ঋষি অঙ্গিরা শৌনককে পরম সত্যের অর্থাৎ এই ব্রহ্মতত্ত্বের শিক্ষা দান করেছিলেন। যে সব মানুষ যাগযজ্ঞ করেন না, তাঁরা উপনিষদও পাঠ করেন না। যাঁরা এই জ্ঞান দান করেন সেই পরম ঋষিদের বারবার নমস্কার করি।
ব্যাখ্যা: ঋষি অঙ্গিরা শিষ্য শৌনককে এই উপনিষদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। শৌনক যথাবিধি গুরুর কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্ত তিনি পালন করেছিলেন। এই জ্ঞান গুরু থেকে শিষ্যে, এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। এই ধারাকেই বলে পরম্পরা। এই জ্ঞানলাভের শর্তগুলি সবসময়েই এক। জ্ঞানের মধ্যে ব্রহ্মজ্ঞানই শ্রেষ্ঠ যদিও এই জ্ঞান অর্জন করা কঠিন, কিন্তু এই জ্ঞানই সর্বোচ্চ। গুরু কোন অযোগ্য শিষ্যকে এই জ্ঞান দান করতে পারেন কিন্তু এই জ্ঞান তার কোন কাজে লাগে না। কিন্তু যখন সৎ গুরু যোগ্য শিষ্যকে এই শিক্ষা দান করেন তখন সেই শিক্ষাদান সার্থক হয়।
যে সব আচার্য এই ব্রহ্মবিদ্যা দান করেন তাঁরা অতি উচ্চকোটির সাধক। সেই পরম ঋষিদের বারবার নমস্কার করি।
।। মুণ্ডক উপনিষদের তৃতীয় মুণ্ডকের দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।।
ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবা
ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ।
স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টুবাংসস্তনূভি-
র্ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥
