এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,৩০ মে : আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মার্কিন কমিশনের (USCIRF) একটি নতুন প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে, ফুলানি সন্ত্রাসীরা গত এক বছরে নাইজেরিয়ার মূলত খ্রিস্টান কৃষক সম্প্রদায়কে নিশানা করে বোকো হারাম বা আইসিসের চেয়েও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে। প্রতিবেদনটির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ওপেন ডোরস-এর সিইও হেনরিয়েটা ব্লাইথ বলেন,”আমার হৃদয় ভেঙে গেছে যখন আমি এমন নারী-পুরুষদের গল্প শুনেছি, যারা তাদের প্রিয় পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনে জবাই হতে দেখেছেন অথবা দাসত্বের জীবনে নিয়ে যেতে দেখেছেন।”
ইউএসসিআইআরএফ-এর নতুন প্রতিবেদন অনুসারে, নাইজেরিয়ায় আনুমানিক ৩০,০০০ ফুলানি সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম এবং তারা “ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের” কারণ হচ্ছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সংগঠিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের হামলার তুলনায়, গত এক বছরে নাইজেরিয়ার সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ফুলানি সন্ত্রাসীদের হিংসায় সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।”
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, তথাকথিত পশুপালক ফুলানিরা “মিডল বেল্ট এবং ক্রমবর্ধমানভাবে দক্ষিণাঞ্চলের খ্রিস্টান (কৃষি) সম্প্রদায়গুলোকে নিশানা করেছে, তাদের বাড়িঘর ও গির্জা পুড়িয়ে দিয়েছে এবং অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করেছে।”কিন্তু স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন প্রাক্তন সন্ত্রাসবাদ- বিরোধী বিশেষজ্ঞ ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেছেন যে, নাইজেরিয়ার সরকারি বাহিনীর সাথে মিলে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি দেশটির উত্তরে বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেটের মতো ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যে ধরনের হামলা চালিয়েছে, তা দেশটির প্রধানত খ্রিস্টান অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ফুলানিদের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে না।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের হয়ে নাইজেরিয়ায় কাজ করা ব্যুরো অফ কাউন্টারটেররিজমের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক স্টার্লিং টিলি বলেছেন যে, “কৃষক- পশুপালক সংঘাতের সামরিক মোকাবেলা করা সমীচীন নয়, কারণ এতে দেশে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” বর্তমানে হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির টমাস আর. পিকারিং গ্র্যাজুয়েট ফরেন অ্যাফেয়ার্স ফেলোশিপের পরিচালক টিলি আরও বলেন,’হিংসা দমনের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা করার জন্য নাইজেরিয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।”
চলতি সপ্তাহে, যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ নাইজেরিয়ার ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হামলার নির্দেশের বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, “সম্ভবত এক বছর আগে,প্রেসিডেন্ট আইএসআইএস-এর দ্বারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত ও নিহত নাইজেরীয় খ্রিস্টানদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। এবং তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই যুদ্ধ দপ্তর যেন এই বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর মনোযোগ দেয় যে, আমরা ঐ খ্রিস্টানদের রক্ষা করার জন্য আমাদের সাধ্যমতো সবকিছু করব।'”
নাইজেরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ৪৮ শতাংশ খ্রিস্টান। ইউএসসিআইআরএফ (USCIRF) এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফুলানি সন্ত্রাসীরা প্রায়শই বড়দিন বা ইস্টারের মতো খ্রিস্টান ছুটির দিনে অভিযান চালায়, যাতে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আরও বাড়ানো যায় এবং ওই সম্প্রদায়গুলোকে উৎসব বা উপাসনার জন্য একত্রিত হতে আতঙ্কিত করা যায়। হামলার সময়, হামলাকারীরা কখনও কখনও ধর্মীয় ভাবধারার স্লোগান দেয়, যেমন “আল্লাহু আকবার” (আরবিতে যার অর্থ “আল্লাহ মহান”)। তবে প্রতিবেদন অনুসারে, মুসলমানরাও হামলার শিকার হচ্ছে । প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “ফুলানি হামলাকারীরা মুসলমানদেরও ছাড় দেয়নি, তারা পশুপালকদের গবাদি পশু লুট করছে এবং অ-ফুলানি মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর সহিংস হামলা চালাচ্ছে।”
খ্রিস্টানদের ওপর নিপীড়নের বিষয়টি তুলে ধরে এমন একটি সংস্থা ওপেন ডোরস ইউকে অ্যান্ড আয়ারল্যান্ডের সিইও হেনরিয়েটা ব্লাইথ ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন,’বোকো হারাম বা আইএসডব্লিউএপি (ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকান প্রভিন্স)-এর মতো অন্য সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হিংসার চেয়ে ফুলানি উপজাতির সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত হিংসার সংখ্যা অনেক বেশি।”
যদিও তার সংস্থাটি এই প্রতিবেদনের অংশ ছিল না, তিনি বলেন, “আমি এমন নারী-পুরুষদের গল্প শুনে মর্মাহত হয়েছি, যারা তাদের প্রিয় পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনে জবাই হতে দেখেছে অথবা দাসত্বের জীবনে নিয়ে যেতে দেখেছে।”ব্লাইথ আরও বলেন: “পরিস্থিতি জটিল, এবং প্রতিবেদনটির উপসংহার অনুযায়ী, সকল অপরাধীই ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত—এ কথা বলাটা অতি সরলীকরণ হয়ে যায়। যা অনস্বীকার্য তা হলো, খ্রিস্টানরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং প্রায়শই তারাই ভুক্তভোগী, যাদের রক্তের বিনিময়ে মূল্য দিতে হয়। তাদের সুরক্ষার একান্ত প্রয়োজন এবং ঘরছাড়া হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য প্রয়োজন ক্ষত সারিয়ে তোলার ও জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ।”
ইউএসসিআইআরএফ (USCIRF) প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “ফুলানি সন্ত্রাসীদের হিংসার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনায় প্রায়শই তাদের প্রতিক্রিয়াকে বড়জোর অসন্তোষজনক এবং নিকৃষ্টতম ক্ষেত্রে অপরাধে সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।”
টিলি ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, আগামী বছর নাইজেরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এবং “একটি ভোটদানকারী গোষ্ঠী হিসেবে ফুলানিদের যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাই, নাইজেরীয় সরকার হিংসা দমনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে, এই ভয়ে যে তারা উত্তর ও মধ্য অঞ্চলে তাদের সমর্থনের ভিত্তি হারাতে পারে।”
