এইদিন ওয়েবডেস্ক,নয়াদিল্লি,২৭ মে : নির্বাচন কমিশনের (ECI) ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (Special Intensive Revision – SIR) পুরোপুরি বৈধ বলে জানাল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করতে নির্বাচন কমিশনের নেওয়া এই পদক্ষেপ সংবিধানের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মূল নীতিকেই আরও শক্তিশালী করে।প্রধান বিচারপতি বলেছেন,’এস আই আর সংবিধানকে প্রাণ দেয়। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করে ভোটার তালিকার সততা, নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। আদালত জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে পূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে । আদালত বলেছে,পরিচয়পত্র তলব করা মানেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা নয়।
এদিকে এস আই আর বিরোধী পক্ষের আইনজীবী কপিল সিবাল সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে বেজায় চটেছেন৷ সিবাল এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছেন,এস আই আর আসলে এনআরসি-র আরেকটি রূপ। নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের ওপর নাগরিকত্ব প্রমাণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, যা বিদেশিদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে আদালত রায় দিয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, ১৯৫০ সালের ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন’ (Representation of the People Act) এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision বা SIR) পরিচালনা করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।
গত বছরের জুন মাসে বিহারে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক শুরু করা এস আই আর কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের করা একাধিক পিটিশনের শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মালা বাগচি সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। রায় ঘোষণার সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পর্যবেক্ষণ করেন যে, যখন আইন নিজেই নির্বাচন কমিশনকে যেকোনো সময় একটি বিশেষ সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা প্রদান করে, তখন কেবল এই যুক্তিতেই সেই প্রক্রিয়াটিকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা যায় না যে, এটি প্রচলিত বা সাধারণ সংশোধন পদ্ধতির সাথে হুবহু সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সুপ্রিম কোর্ট অভিমত প্রকাশ করে যে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ভোট গ্রহণের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর জন্য এটিও অপরিহার্য যে, ভোটার তালিকা হতে হবে নির্ভুল, নির্ভরযোগ্য এবং ত্রুটিমুক্ত। আদালত স্বীকার করে নেয় যে, এস আই আর কার্যক্রম হাতে নেওয়ার পেছনে নির্বাচন কমিশন যেসব কারণ দর্শিয়েছে, তা ছিল যৌক্তিক। এই কারণগুলোর মধ্যে ছিল—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো ব্যাপক ও নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম পরিচালিত না হওয়া; ভোটার তালিকায় ক্রমাগত নাম সংযোজন ও বিয়োজনের ফলে সম্ভাব্য অনিয়ম দেখা দেওয়া; দ্রুত নগরায়ন; এবং মানুষের অভিবাসন। আদালত উল্লেখ করে যে, এমতাবস্থায় ভোটার তালিকার পবিত্রতা বা বিশুদ্ধতা বজায় রাখা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত সেই যুক্তিও খারিজ করে দেয় যে, নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি ১৯৫০ সালের ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন’ এবং ১৯৬০ সালের ‘ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা’ (Registration of Electors Rules)-এর লঙ্ঘন করেছে। আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, ভোটারদের কাছে নথিপত্র বা কাগজপত্র তলব করার অর্থ এই নয় যে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হচ্ছে; বরং এটি কেবল নথিপত্র যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত পর্যবেক্ষণ করেন যে, যদিও ইতিমধ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে একটি ‘অনুমান’ (presumption) বিদ্যমান থাকে, তবুও এর অর্থ এই নয় যে, যেকোনো পর্যায়ে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করার সুযোগ রুদ্ধ হয়ে যায়।
আদালত আরও রায় দেয় যে, ভোটার তালিকা প্রস্তুত করার সময় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো পরীক্ষা- নিরীক্ষা করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তবে, কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে নাগরিকত্বের মর্যাদার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক রায় হিসেবে গণ্য করা যাবে না। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন যে, যদি কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত হতে না পারে বা তাদের মনে সংশয় থেকে যায়, তবে আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কমিশনকে অবশ্যই ওই ব্যক্তির বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত বা নির্ধারণ কেবল নির্বাচনী উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকা থেকে সন্দেহজনক নাগরিকত্বের দায়ে যেসব ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের নাম কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রেরণ করতে হবে।।
