প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান ২৯ এপ্রিল : বয়স ১০৪ বছর। শরীর অশক্ত।নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী বাড়িতে বসে ভোট দওয়ার সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও সেই সূযোগ মেলেনি। তাই ছেলেদের কাঁধে ভর দিয়েই বুধবার বাড়ি থেকে ভোট কেন্দ্রে রওনা দিলেন পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার বাসিন্দা শেখ ইব্রাহিম। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে হওয়া প্রথম নির্বাচন থেকে ভোট দিয়ে আসা ইব্রাহিম এদিনও তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেন। ভোট দিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে তিনি বললেন,’দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সকল নাগরিকের ভোট দেওয়া উচিত।
প্রবীণ শেখ ইব্রাহিমের বাড়ি জামালপুর-১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বত্রিশবিঘা গ্রাম।তিনি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামের ১৩৮ নম্বর বুথের ভোটার এবং আদি বাসিন্দা।ইব্রাহিম দাবি করেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে তাঁর জন্ম। তাঁর স্ত্রী আসেমা বেগম ১৮ বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। ইব্রাহিমের ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে।মেয়েরা বিবাহিত। ছেলেরা বত্রিশবিঘা গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন।তাঁরা পরম স্নেহে তাঁদের বৃদ্ধ বাবাকে আগলে রেখেছেন। বত্রিশবিঘা গ্রামের বাসিন্দারাও তাঁদের গ্রামের সব থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ শেখ ইব্রাহিমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে স্থান দিয়ে রেখেছেন।
ভোটাধিকার টিকিয়ে রাখার জন্য শতায়ু পার করা শেখ ইব্রাহিমকে কম লড়াই করতে হয় নি। বাংলায় এসআইআর (SIR)লাগু হওয়ার পর গত ২৯ জানুয়ারি প্রবীণ শেখ ইব্রাহিমকে সশরীরে ব্লকের বিডিও অফিসে ’শুনানিতে’ হাজির হওয়ার নোটিশ ধরানো হয়েছিল।’লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির’ কথা উল্লেখ থাকে সেই নোটিশে। ওই নোটিশ বৃদ্ধর বাড়িতে পৌছাতেই এলাকায় তোলপাড় পড়ে।শেষে কমিশনের প্রতিনিধিরা ১০৪ বছর বয়সী শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে গিয়ে শুনানি সারেন।তার সাথে তারা বৃদ্ধর প্রয়োজনীয় নথিপত্রও যাচাই করে যান। তবুও চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় শেখ ইব্রাহিমের নাম ’বিচারাধীন’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। তবে শেষ অব্দি ন্যায় বিচার পান শেখ শেখ ইব্রাহিম। চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় ভারতের একজন স্বচ্ছ ভোটারের হিসাবে তিনি স্বীকৃতি পান ।
বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত শরীর নিয়েও এদিন নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে বেশ খুশি শেখ ইব্রাহিম । অতীতের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, আমি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি ,ভারত স্বাধীন হতেও দেখেছি। এমনকি হাওড়া ব্রিজ তৈরি থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও দেখেছি।গান্ধীজীর ডাকা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মিছিলে আমিও ছুটে গিয়েছি। এখন বয়সের ভারে আমি আর ভালো ভাবে হাঁটা চলা করতে পারি না। কমিশনের লোকজন বাড়িতে এসে আমার ভোট সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেই ভাল হত। কিন্তু কি আর করবো সেই সৌভাগ্য আমার হয় নি। তাই এদিন অনেক কষ্ট করে বুথে পৌছে আমাকে ভোট দিতে হল।
বৃদ্ধের ছেলে শেখ রাইহান উদ্দিন ও শেখ আরেফুল ইসলাম বলেন,’আমাদের বাবা দেশের একজন অতি প্রবীণ নাগরিক। তিনি শতায়ু পার করে ফেলেছেন।নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী ৮৫ বছরের বেশী বয়সী ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে ভোট নেওয়ার কথা। কিন্তু আমার বৃদ্ধ বাবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কেন কার্যকর হল না তা বুঝে উঠতে পারছি না। কমিশনের প্রতিনিধিরা বাড়িতে এসে ভোট নিয়ে গেলে এদিন ভোট দেওয়ার জন্য রোদে গরমে কষ্টকরে আমার বাবাকে বুথে যেতে হত না’। মান বাঁচাতে কমিশনের প্রতিনিধিরা এদিন একটা চারচাকা গাড়ি আর হুইল চেয়ার নিয়ে শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন ঠিকই।কিন্তু তা করে কমিশনের প্রতিনিধিরা বৃদ্ধ ইব্রাহিমের ছেলেদের মন গলাতে পারেনি।
কেন বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর ভোট সংগ্রহ করা গেল না,তা জামালপুর বিধানসভার নির্বাচনী আধিকারিক তথা বিডিও পার্থসারথি দের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,“ওটা ইলেকশন কমিশনের প্রবলেম। আমি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না।“ জামালপুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী ভূতনাথ মালিক বলেন, বাংলার ভোট নিয়ে কমিশনের গুচ্ছ গুচ্ছ ব্যর্থতার মধ্যে এটি অন্যতম। শতায়ু পার করা বৃদ্ধ শেখ ইব্রাহিমের প্রতি কমিশনের মানবিকতা দেখানো উচিত ছিল বলে ভূতনাথ মালিক মন্তব্য করেন ।।
