ইউরোপীয় দেশগুলির উদার অভিবাসন নীতির কারনে শরণার্থীদের ঢল নেমেছে ৷ সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা । বিশেষ করে ধর্ষণ বা গনধর্ষণের ঘটনা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন বয়সের নারীদের সুরক্ষাকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে । এমনই একটি ভুক্তভোগী ইউরোপীয় দেশ হল ইতালি ।
২০২৪ সালের ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের (ISTAT) নতুন তথ্য থেকে জানা যায় যে, সংঘটিত সব গুরুতর অপরাধের (felonies) প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী পটভূমির ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হয়; এর মধ্যে যৌন নিপীড়নমূলক অপরাধের ক্ষেত্রে এই হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক—যা ৯০ শতাংশ। ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ বিদেশিদের এই দলটি—যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ৯.৬ শতাংশ—তারা সব চুরির ঘটনার অর্ধেকেরও বেশি (৫০.২%), ডাকাতির ঘটনার প্রায় অর্ধেক (৪৮.১%) এবং যৌন হিংসার ঘটনার প্রায় অর্ধেক (৪৭.৭%)-এর জন্য দায়ী। মিলান শহরে ডাকাতি, ছুরিকাঘাত এবং ধর্ষণের ঘটনার ক্রমবর্ধমান হার স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে, যা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এমতবস্থায়,দক্ষিণ ইতালির সিসিলি দ্বীপের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী পালেরমোতে সাতজন পুরুষ ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে গণধর্ষণ করে এবং সেই ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিলে দেশ জুড়ে তোলপাড় পড়ে যায় । এর প্রতিক্রিয়ায় ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী রাসায়নিকভাবে খোজা বা বন্ধ্যাকরণের (chemical castration) একটি প্রস্তাব পেশ করেন।
ইতালিতে রাসায়নিক বন্ধ্যাকরণ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগটি মূলত বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর যৌন নিপীড়নের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জোরদার হয়ে ওঠে, যা জনবিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল । বিশেষ করে বামপন্থীরা এর তীব্র বিরোধিতা করছে । তবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ছিল ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সিসিলির পালেরমোতে সংঘটিত একটি গণধর্ষণ; যেখানে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী সাতজন পুরুষের বিরুদ্ধে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে ধর্ষণ এবং সেই হামলার ভিডিও রেকর্ড করার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে এবং যৌন অপরাধীদের জন্য আরও কঠোর শাস্তির দাবির পালে নতুন করে হাওয়া দেয় । ফলে কথিত সেকুলার বামপন্থীদেরও জনরোষের মুখে পিছু হঠতে হয় ।
চরম ডানপন্থী ‘লেগা’ (Lega) দলের নেতা এবং ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে রাসায়নিক খোজা বা বন্ধ্যাকরণের দাবি জানান। তিনি বলেন, “আপনি যদি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তবে স্পষ্টতই আপনার মধ্যে গুরুতর কোনো সমস্যা রয়েছে ।শুধুমাত্র কারাদণ্ড এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।”
তাঁর দল দীর্ঘকাল ধরেই তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে রাসায়নিক বন্ধ্যাকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে আসছিল; কিন্তু সংসদে বিলটি পাস করানোর মতো প্রয়োজনীয় জনসমর্থন তাদের ছিল না। এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে রোমের একটি পার্কে এক কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হওয়ার আর একটি ঘটনা সরকারকে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আরও তীব্র চাপের মুখে ফেলে দেয়।
উল্লেখ্য,ইউরোপীয় দেশিগুলিতে শরণার্থীদের সংখ্যা যত বাড়ছে,ততই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ বা গনধর্ষণের ঘটনা । ২০০০ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৮,৫৯৩ গুলি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে । এছাড়া জার্মানিতে ৮,১৩৩ গুলি , ফ্রান্স ৭,৫০০ গুলি এবং পোল্যান্ডে ২,৩৯৯ গুলি ধর্ষণ-গনধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল । ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেশ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় । ওই বছরে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৬৮,১০৯ গুলি, ফ্রান্সে ৪২,৪০০ গুলি এবং পোল্যান্ডে ১,১২৭ গুলি যৌন নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল । তবে ইতালির যৌন নির্যাতনের ঘটনা সরকারিভাবে কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি । তবে শরণার্থীদের দ্বারা সংঘটিত যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে খোদ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে । যেকারণে রাসায়নিকভাবে খোজা বা বন্ধ্যাকরণের শাস্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে মেলোনি সরকার ।
রাসায়নিক খোজাকরণ কী?
রাসায়নিক খোজাকরণ হলো যৌন হরমোন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য রাসায়নিক পদার্থ বা ওষুধের ব্যবহার । মানুষের শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি রক্তে হরমোন নিঃসরণ করে । এই হরমোনগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে শক্তি, বৃদ্ধি এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণের মতো নির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে যৌন হরমোন বয়ঃসন্ধিকাল শুরু করে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য পরিচালনায় সহায়তা করে।
তবে মূলত বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার রোধে এই বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় । কারন এই যৌন হরমোনের কারনে বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার বৃদ্ধি পায় । আর রাসায়নিক বন্ধ্যাত্বকরণ শরীরে যৌন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে এই ক্যান্সারগুলির চিকিৎসায় সাহায্য করে, যা হরমোনগুলিকে ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগাতে বাধা দেয়।
তবে ধর্ষকদের খোজা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবি উঠছে ইতালির অভ্যন্তরে । একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন : রাসায়নিক খোজা করা? সত্যিই?! আমি মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জোরালো দাবি জানাচ্ছি!এটি বহু সমস্যার সমাধান করবে: কারাবাসের মেয়াদ কম—ফলে খরচও কম,অপরাধে পুনরায় ফিরে আসার (backsliding) কোনো সুযোগ নেই,খোজা করা নিয়ে কোনো অর্থহীন বিতর্কের অবকাশ নেই,অপরাধ দমনে কার্যকর প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে,ব্যয়বহুল নির্বাসনের প্রয়োজন নেই,কোনো দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া বা আদালতের খরচ নেই,ভুক্তভোগীদের জন্য চরম তৃপ্তি ও স্বস্তি! ভুক্তভোগীদের মানসিক আঘাত (trauma) কাটিয়ে উঠতে সহায়তা! অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজের সামগ্রিক সন্তুষ্টি ।’ তিনি আরও লিখেছেন,’যে জাতি তার শিশু ও নারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই জাতির পরিণতি হলো গুরুত্বহীনতার অতলে তলিয়ে যাওয়া।’ অন্য একজন লিখেছেন,’এটি অকার্যকর; রাসায়নিক বন্ধ্যাকরণ পরিবর্তনযোগ্য এবং এর প্রভাব সাময়িক, পক্ষান্তরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বন্ধ্যাকরণ স্থায়ী।’।
