এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,২২ মার্চ : শনিবার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দিমোনা ও আরাদে চালানো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তত দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরাসরি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলি আঘাত হানে । সোরোকা মেডিকেল সেন্টার জানায় যে হতাহতের মোট সংখ্যা ১১৫ জন ; যার মধ্যে শিশুসহ অন্তত ১১ জন গুরুতর এবং ২০ জন মাঝারিভাবে আহত হয়েছে ।
আরাদ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে আইডিএফ হোম ফ্রন্ট কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল শাই কালপার বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে অবস্থান করছি, যেখানে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে; বিমান বাহিনী এই ঘটনাটি তদন্ত করছে—যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে।’ অন্যদিকে ইসরালের আবাসিক এলাকায় হামলায় ইরানের প্রশংসা করেছে ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাস । হামাসের সামরিক মুখপাত্র আবু ওবাইদা আইআরজিসি-র (IRGC) প্রশংসা করে বলেছে, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র আজ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষার প্রথম সারির প্রতিনিধিত্ব করছে।”
ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলায় গুরুতর আহতদের মধ্যে ছিল ডিমোনার হামলায় স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত এক ১২ বছর বয়সী বালক এবং আরাদে পরবর্তী হামলায় আহত এক ৫ বছর বয়সী বালিকা। শনিবার ডিমোনা এলাকায় ইরানের বারবার হামলার মধ্যেই এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দিনের শুরুতে ইরানের নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। হামলাটি ডিমোনার প্রায় ১০ কিলোমিটার (ছয় মাইল) এবং আরাদের ৩০ কিলোমিটার (১৮.৫ মাইল) বাইরে অবস্থিত ইসরায়েলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। ইরান ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে, যদিও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এতে কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।
শিমন পেরেজ নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রটিকে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সন্দেহাতীত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির মূল চাবিকাঠি বলে মনে করা হয়, যার অস্তিত্ব জেরুজালেম নীতিগতভাবে নিশ্চিতও করে না বা অস্বীকারও করে না।
নাতাঞ্জে কথিত হামলার আগে ইরান ডিমোনা শহরকেও লক্ষ্যবস্তু করেছিল। একাধিক কোণ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা ফুটেজে দেখা গেছে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি তীব্র গতিতে আকাশ থেকে নেমে এসে শহরকএ বিধ্বস্ত করে দেয় । সামরিক মূল্যায়ন অনুসারে, ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কয়েকশ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকসহ একটি প্রচলিত ইরানি ওয়ারহেড ছিল।ডিমোনার হামলায় গুরুতর আহত এক বালক ছাড়াও, ৩০-এর কোঠায় থাকা এক নারী কাঁচের টুকরোয় মাঝারিভাবে আহত হয়েছেন এবং শহরের আরও ৩১ জনকে সামান্য আঘাতের জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে মাগেন ডেভিড অ্যাডম জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে। এই আঘাতগুলো মূলত শ্র্যাপনেলের কারণে অথবা আশ্রয়ের জন্য দৌড়ানোর সময় লেগেছে। আরও ১৪ জনকে তীব্র উদ্বেগের জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে ।
ইউনাইটেড হাতজালাহর ড্রোন ফুটেজে আরাদের হামলার দৃশ্য রেকর্ড করা হয়েছে । কয়েকশ কিলোগ্রাম বিস্ফোরকসহ একটি প্রচলিত ওয়ারহেড বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রটি বেশ কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের মাঝখানে আঘাত হানে, এতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আহতদের হাসপাতালে সরিয়ে নিতে ঘটনাস্থলে কয়েক ডজন অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি এমডিএ হেলিকপ্টার এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার উপস্থিত ছিল।আরাদের আঘাতস্থলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার ড্যানি লেভি বলেন, এই হামলায় কেউ নিখোঁজ হয়েছেন বলে পুলিশ মনে করছে না, তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।“ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ নিখোঁজ নেই বা আমরা কাউকে ভুলে যাইনি, এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখান থেকে যাব না,” লেভি বলেন। তিনি আরও বলেন যে, ঘটনাস্থলে সশরীরে তল্লাশির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উপায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে।তিনি বলেন,“আমি যে প্রতিবেদন পেয়েছি, সে অনুযায়ী এই মুহূর্তে কেউ আটকা পড়ে নেই । আমরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি যাতে এখানকার কাউকে আমরা সত্যিই ভুলে না যাই।”
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছে। তারা নিশ্চিত করেছে যে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উভয় ক্ষেপণাস্ত্রকেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল, কিন্তু প্রতিহতকারী যানগুলো সেগুলোকে ভূপাতিত করতে ব্যর্থ হয়। হোম ফ্রন্ট কমান্ডও এই প্রভাবগুলোর পরিস্থিতি তদন্ত করছে।আইডিএফ মুখপাত্র এফি ডেফ্রিন জোর দিয়ে বলেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ভূপাতিত করতে ব্যর্থ হলেও, এগুলোর কোনোটিই নতুন কোনো হুমকির ইঙ্গিত দেয়নি।তিনি এক্স-এ একটি পোস্টে বলেছেন,
“বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় ছিল কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্রটিকে প্রতিহত করতে পারেনি। আমরা ঘটনাটি তদন্ত করব এবং তা থেকে শিক্ষা নেব। এটি কোনো বিশেষ বা অপরিচিত ধরনের যুদ্ধাস্ত্র নয়” ।ডেফ্রিন যোগ করেন,“আজ রাতে আরাদ ও ডিমোনার বাসিন্দাদের প্রতি আমাদের সমবেদনা রইল” । তিনি কয়েক ডজন ভুক্তভোগীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশিকা অনুসরণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
এছাড়াও শনিবার রাতে ইরানের আর একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে এইলাত ও তার আশপাশের এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং প্রাথমিক সামরিক মূল্যায়নে জানা গেছে, ইসরায়েলের দক্ষিণতম শহরের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একটি বিবৃতিতে দুটি ইরানি ক্ষেপনাস্ত্র হামলাকে “অত্যন্ত কঠিন সন্ধ্যা” বলে অবিহিত করেছেন । তিনি বলেন, তিনি ডিমোনা ও আরাদের মেয়রদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং শহর দুটিকে “সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য” সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, “আমরা দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সব ফ্রন্টে আমাদের শত্রুদের ওপর আঘাত হানতে থাকব” ।।
