আট দশক আগে, এক তরুণ ইহুদি বালক মানব ইতিহাসের এক চরম অন্ধকার অধ্যায় থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন; বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি ফ্রান্সের এক নিভৃত গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন এবং ছদ্মনাম ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। আজ, ৯৫ বছর বয়সে, সমগ্র বিশ্ব তাঁর প্রকৃত নাম জানে। রসায়নে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হেনরি বি. কাগান (Henri B. Kagan) হলেন সেই ইহুদি বালক যিনি মানব জাতির কল্যাণে নিজের অবদান রেখেছেন ।
‘অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে (asymmetric organic synthesis) অ-রৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটনা’ (autocatalysis) আবিষ্কারের জন্য জাপানি বিজ্ঞনি কেনসো সোয়াই-এর সাথে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে তাঁকে । জৈব সংশ্লেষণ (organic synthesis) ক্ষেত্রে আবিষ্কারের জন্য রসায়নে এটি ২৬তম নোবেল পুরস্কার৷
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে তাঁদের গবেষণা অণু-সংক্রান্ত এবং উন্নত ওষুধ উৎপাদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘদিনের একটি রহস্যের সমাধান করেছিল। কেনসো সোয়াই-এর সাথে যৌথভাবে কাগান ‘অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে অ-রৈখিক প্রভাব ও স্ব-অনুঘটন’ (non-linear effects and autocatalysis in asymmetric organic synthesis)-এর রহস্য উন্মোচন —আণবিক রসায়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য, যা আধুনিক চিকিৎসা ও ওষুধ শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস ঘোষণা করেছে যে, প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের (ফ্রান্স) হেনরি বি. কাগান এবং টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্সেসের (জাপান) কেনসো সোয়াই-কে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে “অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে (asymmetric organic synthesis) অ-রৈখিক প্রভাব এবং স্ব-অনুঘটন (autocatalysis) সংক্রান্ত আবিষ্কারের” জন্য।
প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে যে, কাগান এবং সোয়াই “এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা একটি রাসায়নিক রহস্যের” সমাধান করেছেন: কীভাবে একটি অণুর দর্পণ-প্রতিবিম্ব (specular image) তৈরি করা যায়—যা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। অনেক অণুই দুটি দর্পণ-প্রতিবিম্ব রূপে (specular forms) বিদ্যমান থাকে, কিন্তু জীবদেহ প্রায়শই এর মধ্যে কেবল একটি রূপই ব্যবহার করে; এই ঘটনাটি ‘হোমোচিরালিটি’ (homochirality) নামে পরিচিত। কাগান এবং সোয়াই-এর আবিষ্কার আমাদের রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় এই রূপগুলোর মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অণুর প্রতিটি রূপের কার্যকারিতা বা প্রভাব ভিন্ন হয়ে থাকে।
হেনরি বি. কাগানের জীবন হল সাহস, টিকে থাকা এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিভার এক অসাধারণ গল্প! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে বসবাসরত এক কিশোর ইহুদি বালক ছিলেন অঁরি কাগান (Henri Kagan); নাৎসিদের দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে তাঁকে পরিবারের সাথে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। সেই সময় কেবল বেঁচে থাকাই ছিল তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েক দশক পর, আজ বিশ্বজুড়ে তাঁর নাম সমাদৃত হচ্ছে।
হিটলার তাঁর অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। অথচ তার বদলে, তিনি বিজ্ঞানের নিয়মাবলী নতুন করে রচনা করেছেন এবং বিশ্বকে নিরাময়ে সহায়তা করেছেন। হলোকস্টের বিভীষিকা থেকে বেঁচে ফেরা এবং প্রায় এক শতাব্দী বয়সে মানব অর্জনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ—এ যেন জীবন, মেধা এবং অদম্য মানবিক চেতনার চূড়ান্ত বিজয়।
তাঁর এই যাত্রা কেবল একটি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অর্জনই নয়; এটি অদম্য মনোবল, আশা এবং মানবিক চেতনার বিজয়ের এক শক্তিশালী আখ্যান। পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হওয়া এক ইহুদি শিশু থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী—যাঁর কাজ মানবতার কল্যাণে নিবেদিত—হেনরি কাগানের জীবন অটল অধ্যবসায় ও জ্ঞানের শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।।

