এইদিন ওয়েবডেস্ক,কেরালা,০১ সেপ্টেম্বর : কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের গ্র্যান্ড মুফতি বলেছেন,’মুসলিম নারীদের ঘরেই আবদ্ধ থাকা উচিত।’ সর্বভারতীয় মুসলিম জামাতের প্রধান শাহাবুদ্দিন রাজভী বেরেলভী তাঁকে সমর্থন করে বলেছেন,’ঘরে থাকাই তাদের “সম্মান ও মর্যাদা”র পরিচায়ক, যদিও নারীরা হিজাব পরে কাজ করতে পারেন ।’ রাহুল গাঁধির “পিতৃতন্ত্রকে চূর্ণ করার” প্রতিজ্ঞা করার এক সপ্তাহ পর ওই ইসলামি পন্ডিতদের বক্তব্য সামনে এলো । ফলে মহা ফাঁপড়ে পড়েছেন রাহুল গাঁধি । প্রশ্ন উঠছে যে,তিনি কি এখানেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করবেন, নাকি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা যখন কংগ্রেসের মুসলিম ভোটব্যাংকের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, তখন তারা আবারও পিছু হটবে?
কেরালার কান্থাপুরম এপি আবু বকর মুসলিয়ারের মন্তব্যের সমর্থন করে মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভী বেরেলভী বলেছেন,’ঘরে থাকলেই নারীদের সম্মান ও মর্যাদা সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত হয় এবং একই সাথে তিনি এও বলেন যে, শরিয়া মুসলিম নারীদের হিজাব পরে অফিসে কাজ করতে বাধা দেয় না।’
সর্বভারতীয় মুসলিম জামাতের সভাপতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভী বেরেলভী জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে কেরালার গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবুবকর আহমদ, যিনি কান্থাপুরম এপি আবুবকর মুসলিয়ার নামে পরিচিত, তাঁর মন্তব্যের সমর্থনে এগিয়ে আসার পর তাঁকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। এই বিতর্কের জবাবে রাজভী বেরেলভী বলেন যে,’শরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে গ্র্যান্ড মুফতির বক্তব্য “একেবারে সঠিক” এবং দাবি করেন যে তাঁর মন্তব্য ভুলভাবে বোঝা হয়েছে।
বেরেলভীর মতে, কান্থাপুরম যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইসলাম নারীদেরকে জনসমক্ষে অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শন থেকে রক্ষা করার মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করে। তিনি যুক্তি দেন যে নারীরা হলেন “গৃহের অলঙ্কার” এবং তাদের মর্যাদাকে জনসমক্ষে প্রদর্শন বা উপহাসের বিষয়ে পরিণত করা উচিত নয়।বেরেলভী আরও দাবি করেন যে, গ্র্যান্ড মুফতি এটা বোঝাতে চাননি যে মুসলিম নারীরা কাজ করতে বা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। বরং তিনি বলেন, নারীরা হিজাব পরিধান করে অফিসে কাজ এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে পারেন।
নারীদের ঘরে আবদ্ধ থাকা উচিত এবং জনপরিসরে প্রবেশ করা উচিত নয় বলে কান্থাপুরমের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জেরে কেরালায় যে বিতর্ক বাড়ছে, তার মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্য এসেছে।
কাঁথাপুরম এপি আবুবকর মুসলিয়ার, যিনি ভারতের গ্র্যান্ড মুফতি হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং অল-ইন্ডিয়া সুন্নি জমিয়্যাতুল উলামা এবং সামস্থ কেরালা জেম-আইয়্যাতুল উলামার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, কোচিতে হুব্বুল রসূল সম্মেলনে বক্তৃতাকালে এই মন্তব্য করেন।তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, নারীদের ঘরের মধ্যে থাকা উচিত এবং জনপরিসর থেকে দূরে থাকা উচিত, এবং এই অবস্থানের জন্য তিনি কোরানকে দায়ী করেছেন।কান্থাপুরম বলেন,’নারীদের ঘরেই আবদ্ধ থাকা উচিত। তাদের জনসমক্ষে আসা উচিত নয়। পবিত্র কোরানেও এমনটাই বলা আছে ।’
ধর্মগুরু পর্দা প্রথার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন যে, নারীদের সুরক্ষা দিতে এবং নারীদের জনপরিসরে প্রবেশের ফলে যে ‘মহাবিপর্যয়’ ঘটতে পারে, তা প্রতিরোধ করার জন্যই এই প্রথা নির্ধারিত হয়েছে।
তিনি বলেন,’নারীদেরকে এভাবে জনমঞ্চে নিয়ে আসা যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়, তা উপলব্ধি করেই ইসলাম নারীদের জন্য পর্দা বাধ্যতামূলক করেছে।’
কান্থাপুরম তার অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য স্বর্ণালঙ্কারের একটি উপমা ব্যবহার করেছিলেন।
তিনি বর্ণনা করলেন, কীভাবে একজন ক্রেতাকে দেখানোর আগে একটি সোনার হার যত্ন করে আলমারি, বাক্স এবং তার মোড়কের ভেতরে রাখা হয়। এর বিপরীতে, তিনি বললেন, পাথরের যাঁতাকলের মতো জিনিসপত্র একই রকম যত্ন ছাড়াই দোকানের বাইরে ফেলে রাখা যেতে পারে । এরপর তিনি স্বর্ণালঙ্কারের সঙ্গে নারীদের তুলনা টেনে যুক্তি দেন যে, জনসমক্ষে নারীদের অনাবৃত করা তাদের মর্যাদা ও মূল্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
কান্থাপুরম বলেন,’হারটির সৌন্দর্য ধরে রাখতে হলে এটিকে বাক্সের ভেতরে নিরাপদে রাখতে হবে ।’ তিনি সতর্ক করে বলেন যে, নারীদের জনপরিসরে নিয়ে আসা “ব্যাপক ধ্বংস” ডেকে আনতে পারে।ধর্মগুরু আরও জোর দিয়ে বলেন যে, এই পদের উদ্দেশ্য নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা নয়। বরং, তিনি নারীদের প্রকাশ্য অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধকে তাদের সম্মান ও সুরক্ষার একটি উপায় হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কান্থাপুরম আরও দাবি করেন যে, সুন্নি ধর্মীয় পণ্ডিতগণ, বিশেষ করে সামাস্থা দলের নেতারা, প্রায় ১০০ বছর ধরে এই শিক্ষা দিয়ে আসছেন এবং যুক্তি দেন যে এটি নারীদের সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। সমালোচনা সত্ত্বেও কান্থাপুরম ধর্মীয় পণ্ডিতদের এ ধরনের ফতোয়া দেওয়ার কর্তৃত্বকেও সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামী পণ্ডিতগণ ধর্মটি নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং তাই মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এর শিক্ষা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব তাঁদের রয়েছে।তিনি বলেন,’আমরা ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সুতরাং, এ কথা বলা আমাদের কর্তব্য। আমরা এটা বলব এবং বলতেই থাকব। কেউ তা থামাতে পারবে না ।’ জনসমাগমপূর্ণ কর্মসূচি ও ইসলামিক উৎসবে নারীদের অংশগ্রহণ বিষয়ে সামাস্থা-র কান্থাপুরম গোষ্ঠীর নির্দেশিকা জারির কয়েকদিন পর তিনি এই মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, সংস্থাটি মহল, মসজিদ ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে বলেছে যেন নারী ও মেয়েরা মঞ্চে বা জনসমক্ষে অপরিচিত পুরুষদের পাশে উপস্থিত না হয়। এই নির্দেশনায় উদযাপনের মধ্যে অ-ইসলামিক রীতিনীতি অন্তর্ভুক্ত করারও বিরোধিতা করা হয়েছে।
মালাবার অঞ্চল জুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলিম ছাত্রীদের ওনাম উদযাপনের ভিডিও এবং মিলাদ-এ-শরীফ অনুষ্ঠানে নারীদের অংশগ্রহণের ঘটনার পর এই নির্দেশনা জারি করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে, মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভী বেরেলভী এখন কান্থাপুরমের অবস্থানকে সমর্থন করে যুক্তি দিয়েছেন যে, গ্র্যান্ড মুফতি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা ভুল বোঝাবুঝির কারণেই এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বেরেলভী বলেছেন, গ্র্যান্ড মুফতির মন্তব্যকে শরিয়া এবং নারীর সম্মান রক্ষার ইসলামী ধারণার প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে নারীরা হলেন “গৃহের অলঙ্কার” এবং তাদের মর্যাদা জনসমক্ষে প্রদর্শন করা উচিত নয় কিংবা বাজারে উপহাস বা তুচ্ছ করার মতো কোনো বস্তুতে পরিণত করা উচিত নয়।
বিজেপি নেতা অমিত মালব্য বলেছেন,’কেরালার একজন ইসলামি পণ্ডিত বলেছেন, নারীদের জনসমক্ষে আসা “ব্যাপক ধ্বংস” ডেকে আনবে এবং তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে নারীদের ঘরেই আবদ্ধ থাকা উচিত। সামাস্থা কেরালা জামিয়্যাতুল উলামার সভাপতি ই. সুলাইমান মুসলিয়ার এবং কান্থাপুরম- এর সাধারণ সম্পাদক এ.পি. আবু বকর মুসলিয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন যে নারীরা যেন পুরুষদের সাথে মঞ্চ ভাগাভাগি না করেন বা জনসমক্ষে তাদের পাশে উপস্থিত না হন।“পিতৃতন্ত্র ধ্বংস করো”-এর স্বঘোষিত ত্রাণকর্তা রাহুল গান্ধী কোথায়? যখন পিতৃতন্ত্র ধর্মীয় রক্ষণশীলতার আবরণে মোড়া হয়ে আসে, তখন এই কানে তালা লাগানোর মতো নীরবতা কেন?’
★ ওপি ইন্ডিয়া ইংরাজির প্রতিবেদনের অনুবাদ ।
