একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে কখন মারা যাবে? এটি একটি রহস্যময় প্রশ্ন যার উত্তর আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। কিন্তু এখন বিজ্ঞান জগতে এমন কিছু ঘটেছে যা আমাদের এই রহস্য সমাধানের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসবে। বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন যা জিনোম বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তির জৈবিক বয়স এবং তার শরীর কতদিন টিকে থাকাবে তা অনুমান করতে পারে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল এবং জাপানের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণাটি ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই নতুন প্রযুক্তিকে কল্পবিজ্ঞানকে বাস্তবে পরিণত করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘ট্রান্সক্রিপটোমিক ক্লক’ কী ?
এখন পর্যন্ত, আমরা আমাদের জন্মের পর থেকে অতিবাহিত বছরের সংখ্যা দিয়ে আমাদের বয়স অনুমান করে এসেছি, যাকে বলা হয় কালানুক্রমিক বয়স। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন ট্রান্সক্রিপ্টোমিক ক্লক নামক একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা বছর বা মাসের পরিবর্তে আমাদের শরীরের কোষের কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে জৈবিক বয়স পরিমাপ করে।
এই পদ্ধতিটি তৈরি করার জন্য, বিজ্ঞানীরা চারটি ভিন্ন প্রজাতির—ইঁদুর, ইঁদুরের আর একটি প্রজাতি, রিসাস ম্যাকাক বানর এবং মানুষ—প্রায় ১১,০০০ জিনের অভিব্যক্তি প্রোফাইল বা ট্রান্সক্রিপ্টোম নিয়ে গবেষণা করেছেন। বার্ধক্যের সময় কোন জিনগুলো সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হয়, অথবা কোন পরিবর্তনগুলোর এপিজেনেটিক প্রভাব রয়েছে, তা দেখার জন্য তারা শরীরের ২৫টি ভিন্ন টিস্যু পরীক্ষা করেছেন।
নতুন আবিষ্কার এবং পুরানো কৌশলের মধ্যে পার্থক্য
বিজ্ঞানীরা আগেও বয়স নির্ধারণের জন্য এপিজেনেটিক ক্লক ব্যবহার করেছেন। পুরোনো পদ্ধতিগুলো মূলত সময় ও চাপের কারণে ডিএনএ-তে ঘটা রাসায়নিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করত, যেমন মিথাইলেশন নামক একটি প্রক্রিয়া। পুরোনো পদ্ধতিগুলো সবসময় নির্ভুল ছিল না। কিন্তু এই নতুন পদ্ধতিটি নির্ভুলতা ও সূক্ষ্মতার দিক থেকে পুরোনো এপিজেনেটিক ক্লকের সমকক্ষ।
গবেষণা চলাকালীন বিজ্ঞানীরা একটি আকর্ষণীয় আবিষ্কার করেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, রোগ প্রতিরোধকারী কোষ, স্টেম সেল, লিভার সেল এবং পেশী কোষ—সবগুলোতেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে একই ধরনের আণবিক পরিবর্তন ঘটে। গবেষণাটির প্রধান লেখক আলেকজান্ডার টিশকভস্কি ব্যাখ্যা করেন যে, যেসব কোষে সুস্থ কোষ বিভাজন এবং ক্ষত নিরাময়ের সাথে সম্পর্কিত জিন ছিল, সেগুলোর বয়স ধীরে ধীরে বাড়ছিল। অন্যদিকে, যেসব কোষে প্রদাহ এবং কোষ মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত জিন ছিল, সেগুলোর বয়স দ্রুত বাড়ছিল এবং মৃত্যু ঘটছিল। মানুষের মধ্যে এই জিনগুলোর আচরণের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি কখন মারা যেতে পারেন, তা ভবিষ্যদ্বাণী করা এখন সম্ভব হয়েছে।
ঔষধশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা
এই গবেষণার লেখক, ভাদিম গ্লাডিশেভ বলেন যে, এই ‘বার্ধক্য ঘড়ি’ ভবিষ্যতের চিকিৎসা পদ্ধতিকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে পারে। এর মাধ্যমে চিকিৎসকেরা রোগীর জৈবিক বয়স অনুযায়ী স্বতন্ত্র চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবেন। ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বেশি উপকারী হবে। এই ট্রান্সক্রিপ্টোমিক ঘড়ির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে শরীরের বায়োমার্কারের উপর নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রভাব দেখতে সক্ষম হবেন। এর ফলে ইঁদুর এবং মানুষের উপর চিকিৎসা পরীক্ষার সময় ব্যাপকভাবে কমে যাবে।
‘বার্ধক্য ঘড়ি’ কি মৃত্যুর সঠিক তারিখ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবে ?
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন যে এই যন্ত্রটি বর্তমানে শুধুমাত্র একটি গবেষণামূলক সরঞ্জাম। মানুষের উপর সরাসরি ব্যবহার করার আগে আরও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া, এই যন্ত্রটি শুধুমাত্র স্বাভাবিক বার্ধক্য এবং রোগের কারণে হওয়া মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। এটি সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্যোগ বা আকস্মিক ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না।।
