প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,২৪ জুলাই : বিপ্লবী রাসবিহারী বসু ১৮৮৬ সালের ২৫ মে পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না ২ নম্বর ব্লকের বড়বৈনান অঞ্চলের সুবলদহ গ্রামে জন্মগ্রহন করেছিলেন । ওই মহান বিপ্লবীকে সম্মান জানানো তো দুরের কথা,বিপ্লবীর সেই পৈত্রিক জন্মভিটাতে “পাবলিক টয়লেট’ নির্মাণ করে দিয়ে গেছে পূর্বতন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস । আজ শুক্রবার বিধানসভার অধিবেশনে এনিয়ে গর্জে উঠলেন পূর্বস্থলী উত্তরের বিজেপি বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায়। আগামী ১৫ আগষ্টের আগে ওই পাবলিক টয়লেট ভেঙে ফেলার দাবি রাখেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের কাছে ।
সুবলদহ গ্রামের ভূমিপুত্র রাসবিহারী বসুর বাবা বিনোদ বিহারী বসুর কর্মক্ষেত্র ছিল হুগলীর চন্দননগর। তাই স্ত্রী ভুবনেশ্বরী দেবী ও সন্তান রাসবিহারী কে সঙ্গে নিয়ে বিনোদ বিহারী চন্দননগরেই থাকতেন। সেখানেই কাটে রাসবিহারী বসুর শিক্ষা জীবন । জন্মভূমি সুবলদহ গ্রামে থাকা রাসবিহারী বসুর পৈত্রিক ভিটের সরকারি রেকর্ড ( মৌজা- সুবলদহ/জে,এল নম্বর-১৯৪ / দাগ নম্বর-৩১৫৭) থেকেও তাঁর নাম কাটা গিয়েছে। সেই কারণে ওই ভিটেতে রাসবিহারী বসুর স্মৃতি ধরে রাখার মতো কিছু করা যাচ্ছে না।তাই দেশের স্বাধীনতার ৭৯ টা বছর পরেও বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জন্মভিটে অবহেলা ও অনাদরে পড়ে আছে।বিপ্লবীরঅনুগামীরা বিপ্লবীর সম্পত্তি রক্ষার লড়াই দীর্ঘ দিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু না সিপিএম বা তার পরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বিপ্লবীর জন্মভিটা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই নেয়নি ।
রাসবিহারী বসুর জন্ম ভিটাতে ’পাবলিক টয়লেট’ নির্মান হওয়া নিয়ে বিজেপি বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবাদ যথার্থ বলে সুবলদহ গ্রাম নিবাসী বিপ্লবীর অনুগামীরা এদিন দাবি করেছেন।
তাঁরা জানান,২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে রাজ্য পর্যটন দপ্তরের দেওয়া ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৮ টাকায় ওই পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়। এ নিয়ে রাজ্যের পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ এদিন বলেন,’বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জন্ম ভিটাতে যদি “পাবলিক টয়লেট“ নির্মান হয়ে থাকে তবে তা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।’ জেলাশাসকের(পূর্ব বর্ধমান) কাছেও পুরো বিষয়টি জানতে চাইবেন চলে শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন ।
ছাত্র জীবনে দেশের পরাধীনতা রাসবিহারী বসুকে ব্যাথিত করতো।সেই থেকেই তিনি নানা বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। ১৯০৮ সালে তিনি আলীপুর বোমা বিস্ফোরণ মামলায় অভিযুক্ত হন। কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি চলে যান দেরাদুনে। সেখানে গিয়ে তিনি বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের হেডক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে ওখানেও তিনি আন্দোলন বিমুখ থাকেন নি।দেরাদুনে থেকেই তিনি গোপনে বাংলা,উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন।
এখানেই থেমে থাকেনি রাসবিহারী বসুর বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মকাণ্ড তিনি ।ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন বিপ্লবী নেতা এবং ’ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির’ সংগঠক হিসাবেও পরিচিতি লাভ করেন। দিল্লিতে গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এর ওপর বোমা হামলায় নেতৃত্ব দানের কারণে তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু তারা ব্যার্থ হয় । ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়িয়ে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ মে তিনি কলকাতার খিদিরপুর বন্দর থেকে জাপানি জাহাজ ‘সানুকি- মারুতে’ চড়ে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন তিনি । তার আগে তিনি নিজেই পাসপোর্ট অফিস থেকে রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়,রাজা প্রিয়নাথ ঠাকুর ছদ্মনামে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।মূলত রাসবিহারী বসুর আবেদনেই জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের পাশে দাঁড়ায় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন যোগায় ।
রাসবিহারী বসু ১৯৪২ সালে জাপানে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করেছিলেন।যার উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। সেই লড়াইয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজকে জাপান ভীষণভাবে সমর্থন করেছিল।১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারী রাসবিহারী বসুর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে রাসবিহারী বসুকে জাপান সরকার সম্মানসূচক “‘Second Order of the Merit of the Rising Sun’“খেতাবে ভূষিত করে।
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের পাতায় আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর নাম। দেশ ও জাতি আজও এই বেরেণ্য বিপ্লবীকে স্মরণ করে । কিন্তু এত সবের মধ্যেও নিজ ভূমেই ব্রাত্য হয়ে গিয়েছেন রাসবিহারী বসু। বাঙালি ও দেশের গৌরব রাসবিহারী বসুর জন্মভিটাটি বিগত অর্ধ শতাব্দীর অধিক সময় ধরে সিপিএম এবং তৃণমূল কেন উপেক্ষা করে গিয়েছিল তা স্পষ্ট নয় । এখন দেখার বিষয় এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বর্তমান বিজেপি সরকার যোগ্য সম্মান দেয় কিনা ।।
