কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার প্রাক্তন নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খতমের ১৫তম বার্ষিকীতে, মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) তাকে হত্যাকারী অভিযানটি সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই অভিযানটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা অত্যাধুনিক গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়ের ফল।শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সিআইএ বিশ্লেষকরা বিন লাদেনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের নেটওয়ার্কের ওপর তাদের নজরদারি বাড়ায় এবং তদন্ত চলাকালে তারা ছদ্মনামধারী এক বার্তাবাহকের সন্ধান পায়, যাকে পরে শনাক্ত করা হয়। এই সূত্রগুলো অবশেষে ইসলামাবাদের নিকটবর্তী অ্যাবোটাবাদের একটি সন্দেহজনক আস্তানার দিকে নিয়ে যায়।
সিআইএ জানায়, ওই কম্পাউন্ডটিতে কিছু অস্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, যার মধ্যে কাঁটাতারযুক্ত উঁচু দেয়াল, জোড়া গেট, ঢাকা জানালা, শনাক্ত করা যায় এমন কোনো টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকা এবং আবর্জনা পোড়ানো অন্যতম। সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বিন লাদেন সেখানে লুকিয়ে আছে৷
কমপ্লেক্সটির একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল তৈরি সহ কয়েকমাসের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের পর, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই অভিযানের আদেশ দেন। সিআইএ-এর তথ্যমতে, ২০১১ সালের ১ মে বিশেষ বাহিনী আফগানিস্তানের একটি ঘাঁটি থেকে অ্যাবোটাবাদে যাত্রা করে এবং মধ্যরাতে এলাকাটিতে প্রবেশ করে। এই অভিযানে দুটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি বিধ্বস্ত হয়, কিন্তু মিশনটি অব্যাহত ছিল।প্রতিবেদন অনুসারে, বাহিনী প্রবেশের প্রায় নয় মিনিট পর ভবনটির তৃতীয় তলায় বিন লাদেনকে শনাক্ত ও হত্যা করা হয়।
তার মৃতদেহ শনাক্ত করার পর, সেটি একটি হেলিকপ্টারে স্থানান্তর করা হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া কিছু নথি ও সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়। পরে হেলিকপ্টারগুলোর মধ্যে একটি ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং সৈন্যরা ঘাঁটিতে ফিরে আসে। বিন লাদেনের মৃতদেহ সেই দিনই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস কার্ল ভিনসনে স্থানান্তর করে আরব সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
সিআইএ আরও ঘোষণা করেছে যে, অভিযান থেকে উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ নথি থেকে দেখা গেছে, বিন লাদেন তার শেষ দিন পর্যন্ত আল-কায়েদাকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং এর সদস্যদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিল । একটি যৌথ দল কর্তৃক বিশ্লেষিত নথিগুলো থেকে দেখা যায় যে, অভিযানের আগেও তিনি সক্রিয় ছিলেন । অবশেষে, সিআইএ এই অভিযানটিকে আল- কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং এটিকে মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক সহযোগিতার ফল হিসেবে বিবেচনা করেছে।
আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন ছিলেন ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলার অন্যতম প্রধান কুশীলব, যে হামলায় নিউইয়র্কে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয় এবং আল-কায়েদার বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের সূচনা হয়। ওসামা বিন লাদেনের তালেবানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানে বসবাস করতেন। জানা গেছে, ওয়াশিংটন তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরকে তাকে হস্তান্তর করতে বলেছিল, কিন্তু তালেবান নেতা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।আরও বলা হয় যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর ওসামা বিন লাদেন নানগারহারের তোরা বোরা এলাকা দিয়ে পাকিস্তানে যান এবং সেখানে বেশ কয়েক বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে গোপনে বসবাস করেন।
তার মৃত্যুর পর আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের কার্যকলাপও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের এখনও কেন্দ্র রয়েছে এবং তালেবানদের এই গোষ্ঠীটির প্রতি বিশেষ সহানুভূতি রয়েছে।তালেবান শাসনের প্রথম বছরে কাবুলের শেরপুরে মার্কিন বিমান হামলায় আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরিও খতম হয় ।
বিন লাদেনকে হত্যা অভিযানের সময়রেখা
১ মে (পূর্বাঞ্চলীয় সময়):
মার্কিন সময় দুপুর ১:২৫ (পাকিস্তান সময় মধ্যরাত) – রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, সিআইএ পরিচালক প্যানেটা এবং বিশেষ অভিযান কমান্ডার অ্যাডমিরাল ম্যাকক্রিয়ন অভিযানটির অনুমোদন দেন।
দুপুর ১:৫১ – আফগানিস্তান থেকে দুটি হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করে।
বিকেল ৩:৩০ – হেলিকপ্টারগুলো অ্যাবোটাবাদে পৌঁছায়; একটি বিধ্বস্ত হলেও অভিযান চলতে থাকে।
বিকেল ৩:৩২ – হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ওবামা ব্রিফিং গ্রহণ করেন।
বিকেল ৩:৩৯ – তৃতীয় তলায় বিন লাদেনকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং হত্যা করা হয়।
বিকেল ৩:৫৩ – বিন লাদেনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার খবর রাষ্ট্রপতিকে জানানো হয়।
বিকেল ৩:৫৫ –মৃতদেহ প্রথম তলায় নিয়ে আসা হয়।
বিকেল ৩:৩৯ থেকে ৪:১০ – ঘটনাস্থল থেকে নথি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিকেল ৪:০৫ – সৈন্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
বিকেল ৪:০৮ – বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ধ্বংস করা হয়।
বিকেল ৪:১০ – সৈন্যরা অ্যাবোটাবাদ ত্যাগ করে।
বিকেল ৫:৫৩ – দলটি আফগানিস্তানে ফিরে যায়।
সন্ধ্যা ৭:০১ – ওবামা বিন লাদেনের পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ পান।
রাত ১১:৩৫ – ওবামা আমেরিকান জনগণের কাছে এই খবর ঘোষণা করেন ।।
