নির্গুণ মানস পূজা (Nirguna Manasa Puja) হলো
ঈশ্বর বা ব্রহ্মের সেই রূপের মানসিক আরাধনা, যার কোনো আকার, গুণ, বা বৈশিষ্ট্য নেই (নির্গুণ ব্রহ্ম)।
এটি আসলে মন ও চেতনার সাহায্যে নিরাকার ও গুণাতীত ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের উপাসনা। আদি শঙ্করাচার্য রচিত এই পূজায় কোনো বাহ্যিক উপকরণ (যেমন- ফুল, চন্দন, প্রদীপ) লাগে না; বরং ভক্ত নিজের মনকে সচ্চিদানন্দ রূপে কল্পনা করে ঈশ্বরের নিরাকার রূপের আরাধনা করেন।
সনাতন ধর্মে এই মানসিক উপাসনার মূল ধারণা ও পদ্ধতি হল :
দার্শনিক ভিত্তি: উপাসক প্রশ্ন করেন যে, ঈশ্বর যদি অখণ্ড, পূর্ণ, ও নির্লেপ হন, তবে তাঁকে কীভাবে স্নান, আসন বা নৈবেদ্য নিবেদন করা সম্ভব, যা মূলত দ্বৈত ধারণার প্রতীক?
উপকরণের মানসিক রূপান্তর: এই পূজায় বাহ্যিক উপকরণের পরিবর্তে ভক্তের ভিতরের অনুভূতিগুলোকেই নিবেদন করা হয়:
★ মনকে সুদৃশ্য পুষ্প হিসেবে
★ প্রাণকে নিবেদিত ধূপ হিসেবে
★ মনের তেজকে প্রদীপ হিসেবে
★ নিজের ভেতরের অমৃতকে নৈবেদ্য হিসেবে নিবেদন করা হয়।
লক্ষ্য: সমস্ত বাসনা, অহংকার ও ভেদবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নির্গুণ ব্রহ্মে নিজের মনকে বিলীন করে দেওয়াই হলো এই পূজার মূল উদ্দেশ্য। এটি ধ্যানের একটি উচ্চতর রূপ।
নির্গুণ মানস পূজা
শিষ্য উবাচ
অখণ্ডে সচ্চিদানন্দে নির্বিকল্পৈকরূপিণি ।
স্থিতেঽদ্বিতীয়ভাবেঽপি পূজা বিধীয়তে ॥১॥
পূর্ণস্যাবাহনং কুত্র সর্বাধারস্য চাসনম্ ।
স্বচ্ছস্য পাদ্যমর্ঘ্যং চ শুদ্ধস্যাচমনং কুতঃ ॥২॥
নির্মলস্য কুতঃ স্নানং বাসো বিশ্বোদরস্য চ ।
অগোত্রস্য ত্ববর্ণস্য কুতস্তস্যোপবীতকম্ ॥৩॥
নির্লেপস্য কুতো গন্ধঃ পুষ্পং নির্বাসনস্য চ ।
নির্বিশেষস্য কা ভূষা কোঽলংকারো নিরাকৃতেঃ ॥৪॥
নিরংজনস্য কিং ধূপৈর্দীপৈর্বা সর্বসাক্ষিণঃ ।
নিজানংদৈকতৃপ্তস্য নৈবেদ্যং কিং ভবেদিহ ॥৫॥
বিশ্বানংদয়িতুস্তস্য কিং তাংবূলং প্রকল্পতে ।
স্বয়ংপ্রকাশচিদ্রূপো যোঽসাবর্কাদিভাসকঃ ॥৬॥
গীয়তে শ্রুতিভিস্তস্য নীরাজনবিধিঃ কুতঃ ।
প্রদক্ষিণমনংতস্য প্রণামোঽদ্বয়বস্তুনঃ ॥৭॥
বেদবাচামবেদ্যস্য কিং বা স্তোত্রং বিধীয়তে ।
অংতর্বহিঃ সংস্থিতস্য উদ্বাসনবিধিঃ কুতঃ ॥৮॥
শ্রী গুরুরুবাচ
আরাধয়ামি মণিসংনিভমাত্মলিংগম্
মায়াপুরীহৃদয়পংকজসংনিবিষ্টম্ ।
শ্রদ্ধানদীবিমলচিত্তজলাভিষেকৈ-
র্নিত্যং সমাধিকুসুমৈর্নপুনর্ভবায় ॥৯॥
অয়মেকোঽবশিষ্টোঽস্মীত্য়েবমাবাহয়েচ্ছিবম্ ।
আসনং কল্পয়েত্পশ্চাত্স্বপ্রতিষ্ঠাত্মচিন্তনম্ ॥১০॥
পুণ্যপাপরজঃসংগো মম নাস্তীতি বেদনম্ ।
পাদ্যং সমর্পয়েদ্বিদ্বন্সর্বকল্মষনাশনম্ ॥১১॥
অনাদিকল্পবিধৃতমূলাজ্ঞানজলাংজলিম্ ।
বিসৃজেদাত্মলিংগস্য তদেবার্ঘ্যসমর্পণম্ ॥১২॥
ব্রহ্মানংদাব্ধিকল্লোলকণকোট্যংশলেশকম্ ।
পিবংতীংদ্রাদয় ইতি ধ্যানমাচমনং মতম্ ॥১৩॥
ব্রহ্মানংদজলেনৈব লোকাঃ সর্বে পরিপ্লুতাঃ ।
অচ্ছেদ্য়োঽযমিতি ধ্যানমভিষেচনমাত্মনঃ ॥১৪॥
নিরাবরণচৈতন্য়ং প্রকাশোঽস্মীতি চিন্তনম্ ।
আত্মলিংগস্য সদ্বস্ত্রমিত্য়েবং চিংতয়েন্মুনিঃ ॥১৫ ॥
ত্রিগুণাত্মাশেষলোকমালিকাসূত্রমস্ম্যহম্ ।
ইতি নিশ্চয়মেবাত্র হ্য়ুপবীতং পরং মতম্ ॥১৬॥
অনেকবাসনামিশ্রপ্রপংচোঽয়ং ধৃতো ময়া ।
নান্য়েনেত্যনুসংধানমাত্মনশ্চন্দনং ভবেত্ ॥১৭॥
রজঃসত্ত্বতমোবৃত্তিত্য়াগরূপৈস্তিলাক্ষতৈঃ ।
আত্মলিংগং যজেন্নিত্যং জীবন্মুক্তিপ্রসিদ্ধয়ে ॥১৮ ॥
ঈশ্বরো গুরুরাত্মেতি ভেদত্রয়বিবর্জিতৈঃ ।
বিল্বপত্রৈরদ্বিতীয়ৈরাত্মলিংগং যজেচ্ছিবম্ ॥১৯॥
সমস্তবাসনাত্য়াগং ধূপং তস্য বিচিংতয়েত্ ।
জ্য়োতির্ময়াত্মবিজ্ঞানং দীপং সংদর্শয়েদ্বুধঃ ॥২০॥
নৈবেদ্যমাত্মলিংগস্য ব্রহ্মাংডাখ্যং মহোদনম্ ।
পিবানংদরসং স্বাদু মৃত্য়ুরস্য়োপসেচনম্ ॥২১ ॥
অজ্ঞানোচ্ছিষ্টকরস্য ক্ষালনং জ্ঞানবারিণা ।
বিশুদ্ধস্যাত্মলিংগস্য হস্তপ্রক্ষালনং স্মরেত্ ॥২২॥
রাগাদিগুণশূন্যস্য শিবস্য পরমাত্মনঃ ।
সরাগবিষয়াভ্য়াসত্য়াগস্তাংবূলচর্বণম্ ॥২৩॥
অজ্ঞানধ্বাংতবিধ্বংসপ্রচংডমতিভাস্করম্ ।
আত্মনো ব্রহ্মতাজ্ঞানং নীরাজনমিহাত্মনঃ ॥২৪॥
বিবিধব্রহ্মসংদৃষ্টির্মালিকাভিরলংকৃতম্ ।
পূর্ণানংদাত্মতাদৃষ্টিং পুষ্পাংজলিমনুস্মরেত্ ॥২৫ ॥
পরিভ্রমংতি ব্রহ্মাণ্ডসহস্রাণি ময়ীশ্বরে ।
কূটস্থাচলরূপোঽহমিতি ধ্যানং প্রদক্ষিণম্ ॥২৬॥
বিশ্ববংদ্যোঽহমেবাস্মি নাস্তি বংদ্যো মদন্যতঃ ।
ইত্য়ালোচনমেবাত্র স্বাত্মলিংগস্য বন্দনম্ ॥২৭॥
আত্মনঃ সত্ক্রিয়া প্রোক্তা কর্তব্যাভাবভাবনা ।
নামরূপব্যতীতাত্মচিংতনং নামকীর্তনম্ ॥২৮॥
শ্রবণং তস্য দেবস্য শ্রোতব্য়াভাবচিন্তনম্ ।
মননং ত্বাত্মলিংগস্য মংতব্য়াভাবচিন্তনম্ ॥২৯॥
ধ্য়াতব্যাভাববিজ্ঞানং নিদিধ্যাসনমাত্মনঃ ।
সমস্তভ্রাংতিবিক্ষেপরাহিত্য়েনাত্মনিষ্ঠতা ॥৩০॥
সমাধিরাত্মনো নাম নান্যচ্চিত্তস্য বিভ্রমঃ ।
তত্রৈব বহ্মণি সদা চিত্তবিশ্রাংতিরিষ্যতে ॥৩১॥
এবং বেদান্তকল্পোক্তস্বাত্মলিংগপ্রপূজনম্ ।
কুর্বন্না মরণং বাপি ক্ষণং বা সুসমাহিতঃ ॥৩২॥
সর্বদুর্বাসনাজালং পদপাংসুমিব ত্যজেত্ ।
বিধূয়াজ্ঞানদুঃখৌঘং মোক্ষানংদং সমশ্নুতে ॥৩৩॥
আদি শঙ্করাচার্যের স্তোত্রের একটি প্রধান অংশ হলো—শিষ্য গুরুকে জিজ্ঞাসা করেন, “অখণ্ড, সচ্চিদানন্দ ও নির্গুণ ব্রহ্মের পূজা কীভাবে সম্ভব?” জবাবে গুরু ব্যাখ্যা করেন যে, বাহ্যিক উপাসনার উপাদানগুলি ব্রহ্মের ক্ষেত্রে খাটে না; তাই তাঁর পূজা হলো মূলত তাঁরই স্বরূপ ‘আত্মা’ বা ‘ব্রহ্ম’-তে মনকে স্থির ও লীন করে দেওয়া।
