শ্যামসুন্দর ঘোষ,মন্তেশ্বর(পূর্ব বর্ধমান),৩১ জুলাই : আজ শুক্রবার ভোরে বর্ধমানের শহরের রেনেসাঁ হাউসিং কমপ্লেক্সের জিম থেকে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জয়শ-ই-মহম্মদের সদস্য হামিদ মন্ডলকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই তোলপাড় পড়ে গেছে দেশ জুড়ে । হামিদ পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম মূল চক্রী সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠীর সদস্য এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর হ্যান্ডলার হিসেবে কাজ করছিল। বর্ধমান শহরের উপকন্ঠে জাতীয় সড়কের পাশে ওই আবাসনটিতে মূলত হিন্দুদের বসবাস । তারই মধ্যে একটি আবাসনের জনৈক মিসেস একতা মেহেরার আরএইচ ৯/২৮ নম্বর ফ্লাটে বিগত দুই থেকে তিন মাস ধরে ভাড়ায় ছিল হামিদ মন্ডলসহ আরও কয়েকজন, বলে জানা গেছে । এখন প্রকাশ্যে আসছে যে জয়শ সন্ত্রাসী হামিদ মন্ডলের আসল বাড়ি জেলার পূর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর থানা দীর্ঘনগর গ্রামে । সে ওই ফ্লাটে বসে মুখ্যমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল । এমনকি সে পাকিস্তান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েও এসেছিল বলে সূত্রের খবর । একটা অজপাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা এক যুবকের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র মেলায় কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে গোয়েন্দাদের ।
আজ ভোরে রেনেসাঁ হাউসিং কমপ্লেক্সের জিম থেকে থেকে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাক্স ফোর্স (এসটিএফ) যখন হামিদ মন্ডলকে পাকড়াও করে আনে তার আগে শারীরিক কসরত করছিল সে । তার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে । অতি সাধারণ দেখতে হামিদ। তবে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও ধূর্ততায় স্তম্ভিত গোয়েন্দারাও। হাওড়ার পিলখানার একটি গেঞ্জির কারখানায় হামিদ ও তার বাবা কাজ করছিল । সেখানেই থাকত তারা । কিন্তু বিগত দুই থেকে তিন মাস ধরে বর্ধমানের শহরের রেনেসাঁ হাউসিং কমপ্লেক্সের একটি ফ্লাটে পরিবার নিয়ে ভাড়ায় থাকতে শুরু করে হামিদ ৷ ঠিক যেই সময়ে রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। তাহলে বর্ধমানে বসেই কি তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপরে হামলার ছক কষছিল সে ?
রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দাদের মাথায় এই প্রশ্ন আসার সুনির্দিষ্ট কারনও রয়েছে । কারন তার কাছ থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল নথিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সোশ্যাল মিডিয়ায় গতিবিধির উপর নজর রাখার প্রমান পেয়েছে এসটিএফ । বর্ধমানের যে রেনেসাঁ হাউসিং থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেই হাউসিং সোশ্যাইটি বর্ধমানের হাইওয়ের উপরই অবস্থিত। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নানা কর্মসূচিতে গোটা রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন। তবে কি নিজের বাড়ির আড়াল থেকেই হামলার ছক ছিল? এর উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দারা । তবে বর্ধমান শহরে জয়শ-ই-মহম্মদের এক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী । আজ নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রীকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,’অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু । আন্তর্জাতিক যোগ থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে । তদন্ত চলছে । এই বিষয়ে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না । ধৃতকে আদালতে তুলে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে বর্ধমান পুলিশ । যা বলার আগামীকাল এস টি এফ বলবে ।’
সূত্রের খবর, পূর্ব ভারতে ক্রমশ জাল বিস্তার করছে সাজ্জাদ ভাট্টি গোষ্ঠী । হামিদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পূর্ব ভারতে জয়শ-ই-মহম্মদের এই জাল বিস্তারের। মুসলিম যুবকদের মগজ ধোলাই করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করত সে। পাশাপাশি সংগঠনের কাজ বিস্তারের জন্য কেউ এলে, তাকে সবরকমভাবে সাহায্য করত ।
এর আগে অসম পুলিশ পাকিস্তানের শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত একটি সন্ত্রাসী মডিউলের সন্ধান পায়। গত শনিবার (২৫ জুলাই) তিন জইশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গত শুক্রবার ধুবড়ি, চিরাং ও বরপেটা জেলার অসম পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) অভিযান চালায়। অভিযানে ৫টি মোবাইল ফোন, ৭টি সিম কার্ড, আধার কার্ড, ব্যাঙ্ক পাসবুক, ডেবিট কার্ড এবং সন্দেহজনক নথিপত্রও বাজেয়াপ্ত করা হয়। জানা গিয়েছে, এই নেটওয়ার্কটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সদস্য সংগ্রহ, অনলাইনে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধকরণ, রেইকি , লজিস্টিক সহায়তা, গুপ্তচরবৃত্তি, অবৈধভাবে অস্ত্র সংগ্রহ, স্লিপার সেল গঠন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তা করার মতো কাজে জড়িত ছিল।
আরও জানা গিয়েছে, এই নেটওয়ার্কটি পাকিস্তানের হ্যান্ডলারের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সহযোগিতায় কাজ চালাত। ২০২৬ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি এবং ২৪ মে পঞ্জাব পুলিশের ২ কর্মীর সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি । নলবাড়ি জেলায় একটি তদন্তের সময় অসমে সাজ্জাদ ভাট্টি গোষ্ঠীর কার্যকলাপ প্রথম নজরে আসে, যার জেরে ২২ মে এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এবারে কলকাতা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে বর্ধমান শহরে বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে হত্যার ছক কষছিল বর্ধমানেরই বাসিন্দা সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠীর সদস্যরা ।।
