২০১১ সালে সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস । তৃণমূল সুপ্রিমো তথা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি “বদলা নাই বদল চাই”-এর বার্তা দিলেও সিপিএমকে সেভাবে আর রাজনীতির ময়দানে দেখা যায়নি । অভিযোগ ওঠে যে সিপিএমের “তোষামোদি নীতি”-কে কার্যত আত্মসাৎ করে তার পরিবর্তিত রূপ আমদানি করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি । মমতা ব্যানার্জির একের পর এক মুসলিম তোষামোদি সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিয়ে কথিত জনবিন্যাস পরিবর্তনের অভিযোগকে ইস্যু করে রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয় বিজেপি । ফলশ্রুতিতে ২০২৬ সালের আগের ভোটগুলিতে যেখানে এককাট্টা মুসলিম ভোট ও দ্বিধাবিভক্ত হিন্দু ভোটের চিত্র স্বাভাবিক ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে উলটো চিত্র দেখা গেছে । ধর্মীয় ভিত্তিতে ভোটের মেরুকরণ ! যার ফলে ৪৫ শতাংশের অধিক হিন্দু ভোট পেয়ে বর্তমানে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় এখন বিজেপি। অন্যদিকে দ্বিধাবিভক্ত হতে দেখা যায় মুসলিম ভোটকে ।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরে যে সিপিএম ও কংগ্রেসকে কার্যত গর্তে ঢুকে থাকতে দেখা গিয়েছিল বিজেপি আসার পর তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে । বিশেষ করে সিপিএমের নেতানেত্রীদের মধ্যে পথেঘাটে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতি সক্রিয়তা দেখাচ্ছেন । একই কাজ করছে কংগ্রেস ও তৃণমূলও । এমনকি মাঝেমধ্যেই তাদের বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছেন না । হিন্দু সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতেই কি এই ব্যকুলতা ?
ত্রিপুরার প্রক্তন রাজ্যপাল ও হিন্দুত্ববাদী লেখক, তথাগত রায় আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেছেন । তিনি লিখেছেন,
‘আজকে এস ওয়াজেদ আলীর জন্মবার্ষিকী। জন্ম ১৮৯০, হুগলী জেলার বড় তাজপুর গ্রামে, মৃত্যু ১৯৫১। এস ওয়াজেদ আলী হচ্ছেন সেই মানুষটি, যিনি একটা মুদিখানার দোকানে দেখেছিলেন, মুদি তার ছেলেকে কোলে বসিয়ে সাপখেলানো সুরে রামায়ণ পড়ে শোনাচ্ছে । তার বহু বছর পরে, সেই পাড়ায় গিয়ে একই দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে জেনেছিলেন, যে ছোট ছেলেটিকে তিনি বাবার কোলে বসে থাকতে দেখেছিলেন সেই ছেলেটিই এখন বড় হয়ে তার ছেলেকে সেই একই সাপখেলানো সুরে রামায়ণ পড়ে শোনাচ্ছে। দেখে সেই অমর উক্তি করেছিলেন, “সেই tradition সমানে চলেছে” !
এরপর তিনি লিখেছেন,হায়, বাঙালি হিন্দুর জীবনে সেই tradition আজকে অন্তর্হিত, ছেদ পড়ে গেছে যখন বামপন্থা আমাদের জীবন ও চিন্তাকে কলুষিত করেছে। এই কলুষ আমাদের দূর করতে হবে। ব্যর্থ নেতা ও দার্শনিক ইন্দ্রিয়পরায়ণ মার্ক্স্ আর লেনিনকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে আমাদের শাশ্বত চিন্তাকে আবার বাঙালি হিন্দুর পাথেয় করতে হবে । এস. ওয়াজেদ আলীকে প্রণাম।’
সিপিএম, তৃণমূল আর কংগ্রেসের তোষণ নীতি
তথাগতবাবুর এই দৃষ্টান্ত নিছক অমূলক নয় । বাস্তবিক এরাজ্যে নির্লজ্জ মুসলিম তোষামোদির রাজনীতির আমদানি করেছিল মূলত সিপিএম । এই তোষামোদকে তারা এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে, প্রতিবাদী হিন্দুদের তারা সংগঠিত আক্রমণ করতে পর্যন্ত পিছপা হত না । এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার বর্ণনা প্রাসঙ্গিক হবে ।
সময়টা ৮০-এর দশক । রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু । ঘটনাস্থল “লালদুর্গ” পূর্ব বর্ধমানের ভাতার থানার হিন্দু অধ্যুষিত ভাতার গ্রাম । বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সেমিফাইনাল খেলায় পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নেয় ভারত । পার্শ্ববর্তী মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামে আতসবাজি ফাটিয়ে উদযাপন করা হয় । পরে ফাইনালে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হয় পাকিস্তান । পাকিস্তান পরাজিত হয় । ভাতার গ্রামের কয়েকজন গ্রামের পাশে পুকুরপাড়ে তারই আতসবাজি ফাটিয়ে পালটা শ্রীলঙ্কার জয় উদযাপন করে। যে অপরাধে ভাতার গ্রামের এক সিপিএমের এক হিন্দু নেতার নেতৃত্বে আতসবাজি ফাটানোর উদ্যোগ নেওয়া একটি বাড়ি ঘিরে ধরে হামলা হয় । ওই নেতা মনে করেছিলেন হয়তো যে, পাকিস্তানের পরাজয়ে বোমা ফাটিয়ে উদযাপন করলে “সংখ্যালঘু ভাইরা”
(সিপিএমের কথায়)মনে কষ্ট পাবে !
আসলে সিপিএম তার দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনে সন্ত্রাস চালিয়ে রাজ্যের হিন্দুদের “সেকুলিরাজমের পাঁচন” খাওয়াতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে । দ্বিতীয় কেরালা বানাতে চেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গকে ।সিপিএমের কথিত “ভূমি সংস্কার আন্দোলন” তাদের সেই পরিকল্পনারই একটি অঙ্গ ছিল বলে দাবি করা হয় । অনেক ভূমিহীন তফসিলি জাতি উপজাতিরা কিছু জমির মালিক হয়ে যায় রাতারাতি । যদিও পরে তাদের অধিকাংশ জন দুর্নীতিগ্রস্ত ভূমিদপ্তরকে হাত করে সেই জমির চরিত্র বদল করে মোটা টাকায় কাঠাদরে বিক্রি করে দেয় । এদিকে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেনারেল কাস্ট হিন্দুরা । যার ক্ষতি তাদের প্রজন্ম আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি । ফলশ্রুতিতে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের কার্যত বিলোপ হয়ে যায় । কিন্তু এই কথিত “ভূমি সংস্কার আন্দোলন” সিপিএমের একটা বড় লাভ করে দিয়েছে । আর সেটা হল আজও তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে অল্প সংখ্যক হলেও সিপিএমের প্রভাব অক্ষুন্ন আছে ।
মমতা ব্যানার্জি মূলত সিপিএম সরকারের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, তোষামোদি রাজনীতি আর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের দিয়ে জনবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটানো প্রভৃতিকে ইস্যু করেই হিন্দু ভোটব্যাংককে নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছেন । কিন্তু তিনিও সিপিএমের মত ‘নির্লজ্জ তোষণের’ রাজনীতি শুরু করলে ধ্বস নামে হিন্দু ভোটব্যাংকে। যেটা তিনি ২০১৬ সালের বিধানসভার ভোটের পর থেকেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয় । কারন মূলত তার পর থেকেই তিনি মুসলিম ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট করতে একের পর এক পদক্ষেপ নেন । আর এটাকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি । যেকারণে মমতা ব্যানার্জির দলের সীমাহীন দুর্নীতির পরেও ২০২৬ সালের ভোটের প্রচারে বিজেপির মূল ইস্যু ছিল হিন্দুত্ববাদ ও রাজ্যের জনবিন্যাসের পরিবর্তন ।
হিন্দুত্ববাদের উত্থানে কি ভীত কথিত ধর্মনিরপেক্ষরা ?
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের উত্থানে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সিপিএম। যার ফলেই মূলত বামপন্থী ও উগ্রবামপন্থীদের ঘাঁটি বলে পরিচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংঘর্ষ । এটা তাদের আদর্শিক লড়াই নয়, বরঞ্চ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই । আগামী ৫ বছর কোন পথে এরাজ্য চলবে তার দিশা গতকাল রাতে হাওড়ার লিলুয়ায় দরবারে মোটামুটি দেখিয়ে দিয়েছেন বাগেশ্বর ধামের মহারাজ ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী । তিনি ধর্মান্তরিতদের “ঘর বাপসি” করানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে মঞ্চে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আহ্বান জানান । পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে আরও বেশি করে যাতে দরবার বসানো যায় তার ব্যবস্থা করার জন্য আবেদন করে ৷ মুখ্যমন্ত্রী নিজেও চাইছেন যে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী আরও বেশি বেশি এরাজ্যে এসে দরবার বসান । তার আগে কলকাতায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্কুলে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্য জুড়ে আরও ১০০০ টা স্কুল চালু করার জন্য আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী । অর্থাৎ, আগামী ৫ বছর এরাজ্যে হিন্দু ধর্মীয় কার্যকলাপ যে বৃদ্ধি পাবে সেটা দিনের আলোর মত স্পষ্ট । ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী গতকাল বলেছেন, “দাদার (মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী) হিন্দুত্বের উপর পুরো বিশ্বাস আছে যে, পশ্চিমবঙ্গ গেরুয়া ময় তো হল এবার রামময় হবে । পশ্চিমবঙ্গে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে ।”
আর এতেই প্রমাদ গুনছে পপশ্চিমবঙ্গের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি । কারন বিজেপি যদি হিন্দু ভোটব্যাংককে আরও বেশি এককাট্টা করে ফেলে তাহলে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে পারে তারা । যে সঙ্কটে ভুগছে উত্তরপ্রদেশের অধিলেশ যাদব,দিল্লির কেজরিওয়াল, বিহারের লালু প্রসাদ যাদবরা । সম্ভবত কর্ণাটকের পরবর্তী বিধানসভার ভোটে কংগ্রেস ডিগবাজি খেতে পারে।।
