প্রশ্নোপনিষদ্ – ষষ্ঠ প্রশ্ন
অথ হৈনং সুকেশা ভারদ্বাজঃ পপ্রচ্ছ। ভগবন্ হিরণ্যনাভঃ কৌসল্যো রাজপুত্রো মামুপেত্যৈতং প্রশ্নমপৃচ্ছত।
ষোড়শকলং ভারদ্বাজ পুরুষং
বেত্থ। তমহং কুমারমব্রুবং নাহমিমং বেদ। যদ্যহমিমমবেদিষং কথং তে নাবক্ষ্যমিতি। সমূলো বা এষ পরিশুষ্যতি যোঽনৃতমভিবদতি তস্মন্নার্হাম্যনৃতং বক্তুম্।
স তূষ্ণীং রথমারুহ্য প্রবব্রাজ। তং ত্বা পৃচ্ছামি ক্বাসৌ পুরুষ ইতি॥১
অন্বয়: অথ হ (তারপর); এনম্ (তাঁকে [পিপ্পলাদকে]); ভারদ্বাজঃ সুকেশা (ভরদ্বাজপুত্র সুকেশা); পপ্ৰচ্ছ (জিজ্ঞাসা করলেন); ভগবন্, (ভগবান); কৌসল্যঃ রাজপুত্রঃ হিরণ্যনাভঃ (কোসলদেশীয় রাজপুত্র হিরণ্যনাভ); মাম্ উপেত্য এতং প্রশ্নম্ অপৃচ্ছত (আমার কাছে এসে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন); ভারদ্বাজ (হে ভরদ্বাজপুত্র); ষোড়শকলং পুরুষং বেত্থ (ষোড়শকলা বিশিষ্ট পুরুষকে আপনি জানেন কি?); অহং তং কুমারম্ অব্রুবম্ (আমি রাজকুমারকে বলেছিলাম); ন অহম্ ইমং বেদ (আমি এই পুরুষকে জানি না); যদি অহম্ ইমম্ অবেদিষম্ (যদি আমি তাঁকে জানি); কথং তে ন অবক্ষ্যম্ (তবে কেন আপনাকে তা বলব না); যঃ অনৃতম্ অভিবদতি (যিনি মিথ্যা বলেন); এষঃ সমূলঃ পরিশুষ্যতি (তিনি সমূলে শুষ্ক [অর্থাৎ বিনষ্ট] হন); তস্মাৎ (সেই কারণে); অনৃতং বক্তুং ন অর্হামি (আমি মিথ্যা কথা বলতে পারি না); সঃ (তিনি, রাজপুত্র); তূষ্ণীম্ (শান্তভাবে); রথম্ আরুহ্য প্রবব্রাজ (রথে চড়ে সেই স্থান ত্যাগ করলেন); তং ত্বা পৃচ্ছামি (এখন আমি আপনাকে সেই [পুরুষ] বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি); ক্ক অসৌ পুরুষঃ (কোথায় সেই পুরুষ)?
সরলার্থ: তারপর ভরদ্বাজপুত্র সুকেশা পিপ্পলাদকে বললেন: ভগবান, কোসলদেশীয় রাজপুত্র হিরণ্যনাভ একসময়ে আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে ভরদ্বাজপুত্র, ষোলকলাবিশিষ্ট পুরুষকে আপনি জানেন কি?’ আমি সেই কুমারকে বললাম, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। যদি আমি জানতাম তবে আপনাকে বলব না কেন?’ যে লোক মিথ্যা কথা বলে সে সমূলে বিনষ্ট হয়। অতএব আমি মিথ্যা কথা বলতে পারি না।’ এই কথা শুনে তিনি নীরবে রথে চড়ে চলে গেলেন। এখন আমি আপনাকে সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছি, ‘সেই পুরুষ কোথায়?’
ব্যাখ্যা: ভরদ্বাজপুত্র সুকেশা এই ষষ্ঠ প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তিনি পিপ্পলাদকে বললেন, একসময়ে কেমন করে কোসলদেশীয় এক রাজপুত্র তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ষোলকলাবিশিষ্ট পুরুষকে আপনি জানেন কি?’ অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সেই পুরুষকে তিনি জানেন কিনা। ষোল আনায় যেমন এক টাকা তেমনি তিনি ষোলকলাবিশিষ্ট এক পূর্ণসত্তা।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে সুকেশা বিদ্বান ব্যক্তি বলেই রাজপুত্র তাঁর কাছে এসেছিলেন। রাজপুত্র তো তাঁকে ডেকে পাঠাতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। রাজপুত্র অত্যন্ত বিনীতভাবে সুকেশার নিকট উপস্থিত হলেন। এভাবেই সত্যলাভে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী গুরুর কাছে যান। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে গুরুকে প্রশ্ন করেন।
সুকেশার মধ্যে কোন কপটতা ছিল না। তাই তিনি খোলাখুলি বললেন, এ প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না। রাজপুত্র শিষ্য হবার পক্ষে অনুপযুক্ত তাই সুকেশা জেনেও না জানার ভান করছেন—পাছে রাজপুত্র এমন কথা মনে করেন তাই সুকেশা বলছেন, ‘তোমার প্রশ্নের উত্তর আমার জানা থাকলে তোমায় বলব না কেন?’
শিষ্য অনেকসময়ই গুরুকে প্রশ্ন করে থাকেন। প্রশ্নের ধরন দেখে গুরু বুঝে নেন শিষ্য কি প্রশ্ন করার জন্যই প্রশ্ন করছেন, না তিনি প্রকৃতই জিজ্ঞাসু। শিশুরাও কখনও কখনও প্রশ্ন করে থাকে। প্রশ্ন শুনে বেশ বোঝা যায় তারা এ ব্যাপারে মনোযোগী নয় এবং এ বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। তাই সে প্রশ্নের উত্তর শুনলেও তারা কিছু বুঝে উঠতে পারে না।
কিন্তু শিষ্য যদি আন্তরিকতার সাথে গুরুকে প্রশ্ন করেন এবং গুরু যদি প্রশ্নের উত্তর দিতে না চান তাহলে তিনি খুব অন্যায় করবেন। উপনিষদ বলেন, এরকম অবস্থায় তাঁর সকল জ্ঞান সমূলে বিনষ্ট হয়। শুকিয়ে গেলে গাছের যেরকম অবস্থা হয়, এও যেন ঠিক তাই। এমনও অনেক গুরু আছেন যিনি তাঁর লব্ধ জ্ঞান শিষ্যকে দান করেন না অর্থাৎ জেনেও না জানার ভান করে মিথ্যা কথা বলেন। তখন তাঁর জীবনে অভিশাপ নেমে আসে। তাঁর সমস্ত জ্ঞান লোপ পায়।
সুকেশা দেখলেন রাজপুত্র নীরবে ঘোড়ায় চড়ে চলে গেলেন। রাজকুমারের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার জন্য সুকেশার ভীষণ খারাপ লাগল। তখন থেকেই তিনি সেই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে সচেষ্ট হলেন। আচার্য শঙ্কর বলছেন, জ্ঞানলাভে ইচ্ছুক ব্যক্তির মনে হয় তাঁর হৃদয়ে যেন তীর গেঁথে আছে। ব্যথায় তিনি ছটফট করছেন। বেদান্তসারে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তির মাথায় আগুন জ্বললে তিনি যেমন জলের জন্য ছটফট করতে থাকেন শিষ্যের আত্মজ্ঞান লাভের ব্যাকুলতাও ঠিক সেইরকম, তাঁকে অবশ্যই এই জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সেজন্য শিষ্য আদর্শ গুরুর খোঁজ করবেন যিনি পথ দেখাবেন।
এই ষষ্ঠ প্রশ্নটি আত্মার সম্বন্ধে করা হয়েছে, যে আত্মা নিজেকে জগৎরূপে প্রকাশ করেছেন। আত্মাকে এখানে ‘পুরুষ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ইনিই সকলের অন্তরস্থ আত্মা। এখানে এই আত্মাকে ষোলকলাবিশিষ্ট পুরুষ বলা হয়েছে। ষোলকলা বলতে সম্ভাব্য সকল বৈশিষ্ট্য বা উপাধিকে বোঝায়। এই সকল উপাধির নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই, এরা আত্মার ওপর আরোপিত মাত্র। এ সকল উপাধি অনিত্য।
শঙ্করাচার্য এই শ্লোকের সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন সমগ্র বিশ্ব (সমস্তং জগৎ) এই কার্যকারণের যোগবিয়োগ বা তার পরিণতি ছাড়া আর কিছুই না। সুষুপ্তিতে (স্বপ্নহীন গভীর নিদ্রায়) আমরা কোথায় যাই? জাগ্রত অবস্থায় আমরা চারপাশের জগৎ সম্পর্কে সচেতন। স্বপ্নাবস্থায় আমরা বিছানায় শুয়ে থাকলেও আমাদের মন কিন্তু পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় দেহ, মন কোনটিই কাজ করে না। মনে হয় আমরা যেন মৃত। সুষুপ্তি ভাঙ্গার পর আমরা যখন জাগ্রত হই তখন পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে আমাদের একটু সময় লাগে। ‘এটি সকাল না সন্ধ্যা? আমি কোথায় আছি? আমার কি হয়েছিল?’—ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তখন আমাদের মনে এসে ভীড় করে।
আচার্য শঙ্করের মতে, সবকিছুই তার উৎসে ফিরে যায়। সেই উৎসটি তাহলে কি? পরমাত্মা। পরমাত্মা চৈতন্য ও জ্ঞানস্বরূপ। আমরা যখন জেগে থাকি তখন পরমাত্মা মন ও ইন্দ্রিয়সমূহের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন। তখনই সেই আত্মা জগতের সংস্পর্শে আসেন। আমরা কোন কিছু দেখি কিভাবে? এই চোখ কিছুই না, এমনকি মনও কোন কাজ করে না। আত্মা আছেন বলেই আমরা দেখতে পাই। আত্মা মনের মধ্য দিয়ে কাজ করে থাকেন এবং মন কাজ করে চোখের মধ্য দিয়ে। পরমাত্মা তখনই সবকিছু দেখেন।
শঙ্করাচার্য আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পরমাত্মা সবকিছুর উৎসই শুধু নন, সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকেই প্রকাশ করেন। পরমাত্মা নিজেকে হিরণ্যগর্ভ (সমষ্টি মন) এবং বিরাটরূপে (সমষ্টি দেহ) ব্যক্ত করেন। পরমাত্মা থেকেই সব কিছু এসেছে আবার পরমাত্মাতেই সবকিছু ফিরে যায়। কোন কিছুর আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই।
জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থায় আমরা অনেক কিছু দেখি ও অনুভব করে থাকি। এই সবকিছুর আশ্রয় হল পরমাত্মা। কিন্তু সুষুপ্তি অবস্থায় আমরা কিছু দেখি না বা অনুভব করতে পারি না। সবকিছু তখন কোথায় যায়? সাময়িকভাবে এসবই পরমাত্মায় লীন হয়। কার্য কারণে ফিরে যায়। জগতের যখন লয় হয় তখন তা আত্মায় ফিরে যায়।
তস্মৈ স হোবাচ। ইহৈবান্তঃশরীরে সোম্য স পুরুষো
যস্মিন্নেতাঃ ষোড়শকলাঃ প্ৰভবন্তীতি॥২।।
অন্বয়: সঃ তস্মৈ হ উবাচ (তিনি [পিপ্পলাদ] তাঁকে বললেন); সোম্য (হে সৌম্য); ইহ এব অন্তঃশরীরে (এখানে হৃৎপদ্মাকাশে); সঃ পুরুষঃ (সেই পরমাত্মা [আছেন]); যস্মিন্ (যাতে); এতাঃ ষোড়শকলাঃ (এই ষোড়শকলা যেমন প্রাণ); প্রভবন্তি (উৎপন্ন হয়)।
সরলার্থ: পিপ্পলাদ তাঁকে বললেন, হে সৌম্য, দেহের মধ্যে হৃৎপদ্মকাশে পরমাত্মা বিরাজিত। এই ষোলকলা (যেমন প্রাণ) পরমাত্মার কাছ থেকেই এসেছে।
সরলার্থ: পিপ্পলাদ তাঁকে বললেন, হে সৌম্য, দেহের মধ্যে হৃৎপদ্মকাশে পরমাত্মা বিরাজিত। এই ষোলকলা (যেমন প্রাণ) পরমাত্মার কাছ থেকেই এসেছে।
ব্যাখ্যা: ‘পুরুষ’ কথার অর্থ হল ‘অন্তরতম সত্তা’, যা আমাদের সকলের মধ্যে রয়েছে। ‘পুর’ শব্দের অর্থ আবাস। আর ‘শী’ অর্থ হল যা শায়িত বা বিশ্রাম নিচ্ছে। হৃদয়কে অনেকসময় ‘হৃৎপদ্ম’ বলা হয় কারণ মনে করা হয় হৃদয়ের আকৃতি পদ্মের মতো। ‘পুরুষ’ এই হৃদয়াকাশেই বিরাজ করেন। ঘটাকাশ আর পটাকাশ, একই আকাশ ঘটের মধ্যেও রয়েছে আবার বাইরেও রয়েছে। ঠিক তেমনি পুরুষ বা ব্রহ্ম প্রত্যেকের ভেতরেও রয়েছেন আবার বাইরেও রয়েছেন। অর্থাৎ তিনিই সর্বত্র বিরাজ করছেন।
এই পুরুষই ষোলকলাবিশিষ্ট। ‘কলা’ শব্দটির অর্থ হল অঙ্গ বা অংশ। এ যেন বীজ যার থেকে অঙ্কুর বেরিয়েছে। পুরুষ হলেন সেই বীজ যা থেকে এই ষোলকলা-বিশিষ্ট জগতের সৃষ্টি হয়েছে। এরা (এই জগৎ) বীজ থেকে আলাদা নয়। ব্রহ্ম নিজেকে এই জগরূপে প্রকাশ করেছেন।
উপনিষদ এখানে ষোলকলাবিশিষ্ট পুরুষ বলতে সগুণ ব্রহ্মের কথা বলেছেন। বস্তুত এই সমগ্র জগৎ ব্রহ্মের উপাধিমাত্র। এ জগৎ ব্রহ্মের ওপর আরোপিত (অধ্যারোপ)। ব্রহ্মই এ জগতের আশ্রয়।
শঙ্করাচার্য একথাই আমাদেরকে বিশেষভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, কোনকিছুই ব্রহ্মকে প্রভাবিত করতে পারে না। ব্রহ্ম ব্রহ্মই থাকেন, যা নির্গুণ, নিরাকার। কোনও বিশেষণের দ্বারা ব্রহ্মকে বিশেষিত করা যায় না। যদিও এ জগৎরূপে তিনি নিজেকেই প্রকাশ করে থাকেন। এ জগৎ ব্রহ্মের কাছ থেকেই আসে। আবার ব্রহ্মেই লয় হয়।
স ঈক্ষাংচক্রে।
কস্মিন্নহমুৎক্রান্ত উৎক্রান্তো ভবিষ্যামি কস্মিন্বা প্রতিষ্ঠিতে প্রতিষ্ঠাস্যামীতি॥৩।।
অন্বয়: সঃ (সেই [ষোলকলা বিশিষ্ট] পুরুষ); ঈক্ষাং চক্রে (চিন্তা করলেন); কস্মিন্ উৎক্রান্তে (কে শরীর ত্যাগ করেন); অহম্ উৎক্ৰান্তঃ ভবিষ্যামি (যার জন্য আমি ত্যাগ করি); কস্মিন্ বা প্রতিষ্ঠিতে কে থাকেন); প্রতিষ্ঠাস্যামি (যার জন্য আমি থাকব)।
সরলার্থ: সেই পুরুষ চিন্তা করলেন : যখন আমি এই শরীর ছেড়ে চলে যাই তখন আসলে কে শরীর ত্যাগ করেন? একইভাবে কার জন্যই বা আমি অনুভব করি যে, আমি এই দেহে আছি?
ব্যাখ্যা: এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘পুরুষ’ কে? ইনিই অন্তরতম সত্তা, যিনি আমাদের সকলের মধ্যে রয়েছেন। আমরা কি তাঁকে দেখতে পাই? না, কিন্তু যোগীরা ধ্যানে তাঁকে উপলব্ধি করেন। তাঁরা তাঁকে আপন হৃদয়ে জ্যোতিরূপে দেখেন। আমাদের মধ্যে এই পুরুষ আছেন বলেই আমাদের এই ‘আমি’বোধ আছে। এমনকি ছোট কীটের মধ্যেও এই ‘অহং’বোধ রয়েছে।
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এই ‘আমি’ কে? কখনও কখনও এই ‘আমি’ দেহ ধারণ করেন। তখন তিনি সগুণ ও চিন্তা করতে সক্ষম। এই সকল গুণকে বলা হয় কলা বা অংশ। এ শুদ্ধ ‘আমি’ নয়। এই ‘আমি’ দেহ, মন ও বুদ্ধির অধীন। কিন্তু শুদ্ধ ‘আমি’র কোন কলা বা অংশ থাকে না।
সুতরাং ‘কলা’ আর ‘পুরুষের’ মধ্যে সম্পর্ক কি? বেদান্তমতে এই কলাসমূহ পুরুষের কাছ থেকেই এসেছে আবার পুরুষেই ফিরে যাবে। এরা পুরুষের ওপর আরোপিত মাত্র। আমাদের সকলের মধ্যেই সেই এক ও অভিন্ন ‘আমি’ রয়েছে। কলাসমূহ এই ‘আমি’র ওপরেই আরোপিত। এর ফলেই আমরা নিজেদেরকে একে অপরের থেকে পৃথক বলে মনে করি, যেমন লম্বা-বেঁটে, সুখী-অসুখী ইত্যাদি। আমাদের দেহের ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ‘আমি’ অপরিবর্তনীয়, নিত্য এবং শাশ্বত।
কিন্তু এই পুরুষ অর্থাৎ পরমাত্মা নিজেকে প্রকাশ করেন কি ভাবে? তিনি কেমন করে এই কলা, দেহ এবং অন্যান্য বিষয়ের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন? উপনিষদ বলেন, ‘স ঈক্ষাং চক্রে’—তিনি চিন্তা করেন। ঈক্ষ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল দেখা। কিন্তু এখানে এর অর্থ হল চিন্তা করা। শুধুমাত্র চিন্তার দ্বারা তিনি অর্থাৎ পরমাত্মা বা ব্রহ্ম নিজের মধ্য থেকেই সবকিছুকে প্রকাশ করেন। বাইবেলেও আছে : ‘ভগবান বললেন, আলো হোক এবং আলো প্রকাশিত হল।’
‘কস্মিন্ অহম্ উৎক্রান্তে উৎক্ৰান্তঃ ভবিষ্যামি’—কে শরীর থেকে চলে গেলে আমার মনে হয় আমি শরীর ত্যাগ করেছি? যখন কেউ মারা যান তখন আসলে শরীর ছেড়ে কে বেরিয়ে যান? যার জন্য আমরা বলে থাকি তিনি এই শরীর ত্যাগ করেছেন অর্থাৎ মৃত্যুর সময় কে আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে যান? আবার কার জন্যই বা আমরা জীবিত আছি?
স প্রাণমসৃজত প্ৰাণাচ্ছ্রদ্ধাং খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবীন্দ্রিয়ং মনঃ।
অন্নমন্নাদ্বীর্যং তপো মন্ত্রাঃ কর্ম লোকা লোকেষু চ নাম চ॥৪।।
অন্বয়: সঃ (তিনি অর্থাৎ ব্রহ্ম); প্রাণম্ (হিরণ্যগর্ভ); অসৃজত (সৃষ্টি করলেন); প্রাণাৎ শ্রদ্ধাম্ (প্রাণ থেকে শ্রদ্ধা [অর্থাৎ শাস্ত্রাদিতে শ্রদ্ধা]); খম্ ([শ্রদ্ধা থেকে] আকাশ); বায়ুঃ ([আকাশ থেকে] বাতাস); জ্যোতিঃ (অগ্নি); আপঃ (জল); পৃথিবী (পৃথিবী); ইন্দ্রিয়ম্ (ইন্দ্রিয়); মনঃ (মন); অন্নম্ (খাদ্য); অন্নাৎ (খাদ্য থেকে); বীর্যম্ (বীর্য); তপঃ (তপস্যা); মন্ত্রাঃ (বেদসমূহ); কর্ম (যজ্ঞকর্ম); লোকাঃ (কর্মের দ্বারা প্রাপ্ত লোকসমূহ); লোকেষু চ নাম চ (এবং সেই লোকসমূহে বিভিন্ন নামরূপ)।
সরলার্থ: সেই পুরুষ (সগুণ ব্রহ্ম) হিরণ্যগর্ভকে (প্রাণাত্মা) সৃষ্টি করলেন। হিরণ্যগর্ভ বা প্রাণ থেকে সৃষ্টি হল শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা থেকে আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী এবং ইন্দ্রিয় এল (সৃষ্টি হল)। তারপর তিনি সৃষ্টি করলেন মন এবং অন্ন। অন্ন থেকে ক্রমে বীর্য, বেদসমূহ, কর্ম (যাগযজ্ঞ), স্বর্গ এবং অন্যান্য লোক, এবং লোকসমূহে বিভিন্ন নাম বা পদসমূহ এল (সৃষ্টি হল)।
ব্যাখ্যা: মৃত্যুর সময় আমাদের দেহ ছেড়ে কে বেরিয়ে যান? উত্তরটি হল প্রাণ অর্থাৎ প্রাণশক্তি। এই প্রাণকে হিরণ্যগর্ভও বলা হয়। হিরণ্যগর্ভই হল ব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ। এঁর অপর নাম হল সূত্ৰাত্মা। সূত্র অর্থ সুতো। বিভিন্ন প্রাণীকে ইনি একই সুতোয় গেঁথে রাখেন। কোন মানুষ হয়তো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, তার ইন্দ্রিয়সকলও হয়তো অক্ষত। কিন্তু মৃত্যুর পর তার আর কোন ইন্দ্রিয়ই কাজ করতে পারে না। কারণ প্রাণ দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।
উপনিষদ বলেন, শ্রদ্ধা আসে এই প্রাণ থেকেই। শ্রদ্ধা শব্দটির অর্থ হল বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস বা আত্মশ্রদ্ধা। কিন্তু এর অপর অর্থ হল আস্তিক বুদ্ধি, গুরুবাক্যে ও শাস্ত্রে বিশ্বাস। শ্রদ্ধা শব্দের দ্বারা সৎ ইচ্ছাকেও বোঝানো হয়। শ্রদ্ধা যেন একরকমের সংগ্রাম, ভাল থেকে ভালতর, ভালতম হওয়ার সংগ্রাম। এই শ্রদ্ধা শুধুমাত্র মানুষেরই থাকে।
তারপর শ্রদ্ধাসম্পন্ন প্রাণশক্তি থেকে একে একে পাঁচটি উপাদান প্রকাশ পায়। প্রথম হল ‘খম্’—যা আকাশ হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি উপাদানেরই নির্দিষ্ট গুণ আছে যেমন আকাশের গুণ হল শব্দ। আকাশ থেকে আসে বাতাস। বায়ুর দুটি গুণ। এর প্রধান গুণ হল স্পর্শ। কিন্তু আকাশের গুণ শব্দও এর সাথে জড়িত। এর পরের উপাদান হল জ্যোতি যাকে অগ্নিও বলা হয়। এর নিজস্ব গুণ হল রূপ কিন্তু শব্দ ও স্পর্শ গুণও অগ্নির সাথে যুক্ত। বায়ুকে দেখা যায় না কিন্তু এর শব্দ শোনা যায় এবং একে অনুভব করা যায়। আবার আগুনকে দেখা যায়, শোনা যায় এবং স্পর্শ করা যায়।
জল আসে আগুনের কাছ থেকে। জলের নিজস্ব গুণ হল রস (স্বাদ)। তবে শব্দ, স্পর্শ ও রূপ এই তিন গুণই এর মধ্যে রয়েছে। তারপর জল থেকে আসে এই পৃথিবী বা ক্ষিতি। পৃথিবীর মধ্যে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ এ সকল গুণই রয়েছে। গন্ধ হল পৃথিবীর নিজস্ব গুণ। কাজেই এই প্রকাশ সূক্ষ্ম থেকে ধীরে ধীরে স্থূল হয়।
কর্ম ছাড়া জীব এ সংসারে থাকতে পারে না। তাই উপাদান থেকে ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়—প্রথমে জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পরে কর্মেন্দ্রিয়। পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় হল—কান (শ্রোত্র), চোখ (চক্ষু), নাসিকা (ঘ্রাণ), জিভ (জিহ্বা), ত্বক (স্পর্শেন্দ্রিয়)। এগুলো আবার উপাদানের বিভিন্ন গুণ যথা—শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ-এর অনুরূপ। জ্ঞানেন্দ্রিয় সকল খুবই সূক্ষ্ম। তারপরে আসে আমাদের কর্মেন্দ্রিয় যা অপেক্ষাকৃত স্থূল। কর্মেন্দ্রিয়গুলি হল বাক্, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ।
এখন প্রশ্ন হল, এই ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে কে? মনঃ অর্থাৎ মন। এই মনকে অন্তঃকরণও বলা হয়ে থাকে। মনের চারটি দিক আছে। মন শব্দটি প্রথম দিককে অর্থাৎ মনের বিষয়কে প্রকাশ করে। এই দিকটি যেন সবসময়ই দুলছে। যেমন—আমি এটা করব না ওটা করব? বুদ্ধিই সিদ্ধান্ত নেয়। এটাই হল বোধশক্তি। ‘আমি কি করব, আমার কি করা উচিত’—বুদ্ধি তা স্থির করে। ‘চিত্ত’ হল মনের আর একটি দিক যাতে অনুভূতি, আবেগ ও স্মৃতি জমা থাকে। তারপর হচ্ছে অহঙ্কার অর্থাৎ আমিত্ব বোধ। এই আমিত্ব বোধ থেকেই জীবের উৎপত্তি। ব্যক্তি মাত্রেই এই অহংবোধ থাকে।
পরবর্তী প্রকাশ হল অন্ন বা খাদ্য। ব্যক্তিমাত্রেরই জীবনধারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্য থেকেই আসে বীর্য ও তেজ। বীর্য থেকেই আসে তপঃ অর্থাৎ কৃচ্ছ্রতা। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা ক্রমশ বুঝতে পারি এ জগতে কিছু লাভ করতে গেলে শক্তি, কৃচ্ছ্রসাধন এবং আত্মসংযমের প্রয়োজন। এর জন্য একজন পথপ্রদর্শক প্রয়োজন, যিনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। আমরা এই সমাজের জন্য কিছু করতে চাই এবং আমাদের মধ্যে হয়তো সে ক্ষমতাও আছে। তা সত্ত্বেও একজন পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন যিনি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। তারপর আসে মন্ত্র। মন্ত্র বলতে এখানে বেদকে বোঝানো হয়েছে। শাস্ত্রের নির্দেশমতো আমাদের চলা উচিত।
মন্ত্র থেকেই কর্মের উৎপত্তি। বেদের বিধান অনুসারে আমরা যাগযজ্ঞ এবং অন্যান্য কার্যকলাপ করতে পারি। এর ফলস্বরূপ আমরা বিভিন্ন লোক প্রাপ্ত হই। লোক অর্থাৎ জগৎ। তপস্যা, আত্মসংযম, শাস্ত্রপাঠ এবং যাগযজ্ঞাদি কর্মের দ্বারা আমরা নিজেদেরকে উন্নত করতে পারি। আমরা ভাল আছি কিন্তু আরো ভাল হতে পারি। আবার লোক শব্দের দ্বারা আমাদের অবস্থা বোঝানো হয়ে থাকে। যদি আমি সৎ, সাধু, দয়ালু ও নিঃস্বার্থপর হই এবং সৎসঙ্গে জীবন কাটাই তবে তা হবে স্বর্গবাসের সমান। ঠিক সেরকমভাবে আমি যদি বাজে কাজ করি, অসৎসঙ্গে দিন কাটাই তাহলে সবসময়ই আমাকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে এবং অসুখী হব। একেই নরকবাস বলা হয়ে থাকে। লোক বলতে এখানে চৈতন্যের স্তর, অস্তিত্বের স্তরকে বোঝানো হয়েছে। তারপর এই জগৎ থেকেই নামের সৃষ্টি হয়েছে। নিজ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমরা একে অপরের থেকে আলাদা অর্থাৎ স্বতন্ত্র।
কাজেই নির্গুণ, নিরাকার পুরুষ থেকেই এই ষোলকলা এসেছে। তারা পুরুষ থেকে পৃথক নয়। পুরুষ এইভাবেই নিজেকে প্রকাশ করে চলেছেন।
স যথেমা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্ৰায়ণাঃ সমুদ্রং প্রাপ্যান্তং গচ্ছন্তি ভিদ্যেতে তাসাং নামরূপে সমুদ্র ইত্যেবং প্রোচ্যতে৷
এবমেবাস্যপরিদ্ৰষ্টুরিমাঃ ষোড়শকলাঃ পুরুষায়ণাঃ পুরুষং প্রাপ্যাস্তং গচ্ছন্তি,ভিদ্যেতে চাসাং নামরূপে পুরুষ ইত্যেবং পোচ্যতে স এমোঽকালো-ঽমৃতো ভবতি তদেষ শ্লোকঃ॥৫।।
অন্বয়: সঃ (এর দৃষ্টান্ত রূপে); যথা (যেমন); ইমাঃ (এইগুলি); সমুদ্ৰায়ণাঃ (সমুদ্রের পথে); স্যন্দমানাঃ (বয়ে চলেছে); নদঃ (নদীসমূহ); সমুদ্রং প্রাপ্য (সমুদ্রে গিয়ে); অস্তং গচ্ছন্তি (অদৃশ্য হয়); তাসাং নামরূপে (তাদের নাম এবং রূপ); ভিদ্যেতে (লোপ পায়); [তদা (তখন থেকে)]; সমুদ্রঃ ইতি এবং প্রোচ্যতে (সমুদ্র রূপে পরিচিত); এবম্ এব (ঠিক এইরূপে); অস্য পরিদ্রষ্টুঃ (যিনি সবকিছু জানেন [সূর্য সবকিছু দেখেন]); পুরুষায়ণাঃ (পুরুষের দিকে যাচ্ছে); ইমাঃ ষোড়শকলাঃ (এই ষোল কলা); পুরুষং প্রাপ্য (লাভ করে); অস্তং গচ্ছন্তি (অদৃশ্য হন); চ আসাং নামরূপে ভিদ্যেতে (তাঁদের নাম এবং রূপ লোপ পায়); পুরুষঃ ইতি এবং পোচ্যতে (তখন তাঁদের পুরুষ বলা হয়); সঃ এষঃ (সেই জ্ঞানী ব্যক্তি); অকলঃ অমৃতঃ ভবতি (সকল গুণের ঊর্ধ্বে এবং অমর); তৎ এষঃ শ্লোকঃ (এখানে এই বিষয়ে একটি শ্লোক আছে)।
সরলার্থ: দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় সমুদ্রে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত নদীসমূহ বইতে থাকে। সমুদ্রে মিলিত হবার পর তাদের আর কোন পৃথক অস্তিত্ব থাকে না, অর্থাৎ তাদের নামরূপ লোপ পায়। তখন তারা সমুদ্রই হয়ে যায়। অনুরূপভাবে, কোন ব্যক্তি যখন নিজেকে জানেন তখন তিনি ‘পুরুষ’ হয়ে যান। এর ফলে তাঁর সমস্ত উপাধি লোপ পায়। তখন থেকে তিনি নিজেই পুরুষ যিনি নির্গুণ এবং অমর। এ বিষয়ে একটি শ্লোক আছে।
ব্যাখ্যা: এই সকল কলা কি গতি লাভ করে থাকে? জীবনের উদ্দেশ্য কি? উপনিষদ এখানে সুন্দর একটি উপমা দিয়েছেন। আমরা যেন সকলেই এক একটি নদী, তুমি একটি নদী, আমি হয়তো আর একটি—এভাবে প্রত্যেকেই এক একটি নদীর মতো। এরকম অসংখ্য নদী দ্রুতবেগে সমুদ্রের দিকে বয়ে চলেছে। তারা যেন বলছে : ‘আমি বৃহৎ হতে চাই, আমি অসীম হতে চাই।’ ক্ষীণ জলধারা হয়ে গঙ্গানদী হিমালয় থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা নদীর রূপ নেয় এবং ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। তার যেন সবসময় একটা তাড়া থাকে যে, ‘আমাকে সমুদ্রে মিলিত হতে হবে।’ সে অল্পে সন্তুষ্ট নয়, সে সমুদ্র হতে চায় ।
আমরা বৃহৎ হতে চাই কেন? কারণ আমরা যে স্বরূপত অসীম। যদিও আমরা নিজেদেরকে ক্ষুদ্র, দুর্বল বলে মনে করি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা তা নই। আমরা অনন্ত। আমরা অসীম।
নদী যখন সমুদ্রে গিয়ে পড়ে তখন কি হয়? ‘অস্তং গচ্ছন্তি’—তাদের পৃথক অস্তিত্ব তখন লোপ পায়। সমুদ্রের সাথে তারা মিলিত হয়। অর্থাৎ তারা সমুদ্রই হয়ে যায়। অনুরূপভাবে, আত্মজ্ঞান লাভ হলে জীবাত্মা পরমাত্মাই হয়ে যান। ‘নাম-রূপে ভিদ্যেতে’—তাদের নামরূপ লোপ পায়। সেই গঙ্গা এখন কোথায়? কোথায় বা সেই যমুনা? সেই নামরূপে তারা আর এখন নেই। আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা নাম এবং রূপ আছে। সেই নামরূপের বিভিন্নতার জন্যই আমরা একে অপরের থেকে আলাদা। কিন্তু এই সবই উপাধিমাত্র। আমি তো কোন নাম নিয়ে জন্মাইনি। নামকরণ হয়েছিল জন্মের পরে। ছোট শরীর নিয়ে আমি জন্মেছিলাম। এবং ক্রমশ তা বড় হয়েছে। প্রথমে আমার যে গঠন ছিল এখন আর তা নেই। এই নামরূপ চিরস্থায়ী নয়।
‘পরিদ্রষ্টুঃ’ অর্থ হল প্রকৃত দর্শক, জ্ঞানী ব্যক্তি, চিন্তাশীল ব্যক্তি। ‘পরি’ অর্থাৎ নির্ভুলভাবে এবং ‘দ্রষ্টুঃ’ অর্থাৎ দর্শক বা পর্যবেক্ষক। জ্ঞানী ব্যক্তি যদি মনোযোগের সাথে নিজেকে লক্ষ্য করেন তবে তিনি শীঘ্রই উপলব্ধি করেন যে তিনি দেহ নন। তিনি দেহ অপেক্ষা অনেক বেশি কিছু। তখন তিনি অনুভব করেন এই সকল কলা আরোপিত মাত্র। তারা পুরুষের কাছ থেকেই এসেছে, পুরুষকে আশ্রয় করেই আছে এবং পুরুষেই লয় হয়ে যাবে। তাদের আর পৃথক অস্তিত্ব থাকে না।
সাধক যখন এই সত্যকে উপলব্ধি করেন তখন তিনি পুরুষে লীন হয়ে যান। ‘পুরুষ’ই ব্রহ্ম, এটাই হল আমাদের প্রকৃত পরিচয়। সাধক তখন উপলব্ধি করেন। তিনি কেবলমাত্র এই দেহতেই সীমাবদ্ধ নন। তিনি অসীম, তিনি পূর্ণ। ‘অকলঃ’— তিনি উপাধিরহিত, নির্গুণ। তিনি তখন অমর হয়ে যান—‘অমৃতঃ ভবতি’। এ দেহের মৃত্যু ঘটে কিন্তু তিনি তো আর দেহ নন। তিনি আত্মা। তিনি ব্রহ্ম।
অরা ইব রথনাভৌ কলা যস্মিন্ প্রতিষ্ঠিতাঃ।
তং বেদ্যং পুরুষং বেদ যথা মা বো মৃত্যুঃ পরিব্যথা ইতি॥৬।।
অন্বয়: রথনাভৌ (রথচক্রের নাভিতে) [কেন্দ্রবিন্দু]; অরাঃ ইব (শলাকার মতো); যস্মিন্ (যে পুরুষে); কলাঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ (গুণসকল [যেমন প্রাণ ইত্যাদি] আরোপিত); তং বেদ্যং পুরুষম্ (সেই পুরুষকে [সেই পরমাত্মাকে] জানতে হবে); বেদ (তাঁকে জান); যথা (যাতে); মৃত্যুঃ বঃ মা পরিব্যথাঃ ইতি (মৃত্যু তোমাদের ব্যথা দিতে না পারে)।
সরলার্থ: রথনাভিতে (রথচক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে) রথচক্রের শলাকাগুলি প্রতিষ্ঠিত। একইভাবে জীবাত্মার উপাধিসকলও পুরুষের (পরমাত্মার) ওপর আশ্রিত। সেই পুরুষকে জানতে চেষ্টা কর। তাঁকে জানতে পারলে মৃত্যু আর তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
ব্যাখ্যা: উপনিষদ এখানে আর একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন। চক্রের মধ্যে শলাকা থাকে। সেই শলাকাগুলি একটি কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ রথচক্রের নাভি থেকেই এসেছে এবং নাভির ওপরেই আশ্রিত। এখানে কলা বা উপাধিসকলকে রথচক্রের শলাকার সাথে এবং ব্রহ্মকে রথচক্রের কেন্দ্রবিন্দুর (নাভি) সাথে তুলনা করা হয়েছে। এমন কোন একটা আশ্রয় বা অধিষ্ঠানের প্রয়োজন যার ওপর এই জগৎ স্থিত। আর সেই আশ্রয়ই হলেন ব্রহ্ম। রথচক্রের শলাকাগুলি যেমন তার নাভির ওপর আশ্রিত ঠিক তেমনি এ জগৎ ব্রহ্মে স্থিত।
‘তং বেদ্যং পুরুষং বেদ’—‘তুমিই সেই পুরুষ, তুমিই আত্মা’—একথা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। ‘আমি নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত আত্মা’—এই জ্ঞান অর্জন করতে পারলে মৃত্যুভয় আর আমাদের স্পর্শ করতে পারে না। আমরা তখন উপলব্ধি করি, ‘আমি পূর্ণ, আমিই পৃথিবীর সবকিছু হয়েছি’ এবং ‘আমি অমর’।
তান্ হোবাচৈতাবদেবাহমেতৎ পরং ব্রহ্ম বেদ।
নাতঃ পরমস্তীতি॥৭।।
অন্বয়: তান্ উবাচ হ [পিপ্পলাদ] (তাদের [অর্থাৎ শিষ্যদের] বললেন); অহম্ (আমি); এতৎ পরং ব্রহ্ম (এই পরব্রহ্ম); এতাবৎ এব (এই পর্যন্ত); বেদ (জানি); অতঃ পরম্ (এর চেয়ে উচ্চতর); ন অস্তি (আর নাই)।
সরলার্থ: পিপ্পলাদ শিষ্যদের বললেন : ‘পরব্রহ্মকে আমি এই পর্যন্তই জানি। তাঁর সম্পর্কে জানবার আর কিছু নেই।’
ব্যাখ্যা: এই হল গুরুর শেষ কথা। আমাদের মনে পড়বে, একদল তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী ঋষি পিপ্পলাদের কাছে এসেছিলেন। এই সকল তরুণ শাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও পরম সত্য সম্পর্কে তাঁদের কোন প্রত্যক্ষ উপলব্ধি ছিল না। শাস্ত্রের শব্দার্থ তাঁরা বুঝেছিলেন কিন্তু মর্মার্থকে তাঁরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাই এইসব শিক্ষার্থীরা পিপ্পলাদকে বলেছিলেন : ‘সবকিছু (শাস্ত্র) পড়েও আমাদের মনে হচ্ছে আমরা কিছুই জানি না। অনুগ্রহ করে আপনি আমাদের শিক্ষা দিন। আমরা ব্রহ্মকে জানতে চাই।’
তখন পিপ্পলাদ সবকিছু ব্যাখ্যা করলেন। সবশেষে তিনি বললেন : ‘এই হল পরমতত্ত্ব। এর অতিরিক্ত আমি আর কিছুই জানি না এবং আমি মনে করি এর বাইরে আর কিছুই নেই।’ মুণ্ডক উপনিষদে আছে, যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি সব কিছু জানেন। আমরা অনেক কিছু জানতে পারি, কিন্তু সে জ্ঞানই চূড়ান্ত নয়। যতক্ষণ ব্রহ্মকে জানতে না পারি ততক্ষণ আমরা কিছু জানি না। আমাদের মধ্যে তখন শূন্যতার বোধ জন্মায়। ঋষি পিপ্পলাদ বললেন: ‘পরব্রহ্ম ছাড়া আর জানবার কিছুই নেই। আমি তোমাদেরকে এই পরব্রহ্মের কথাই বলেছি। এছাড়া পরব্রহ্ম সম্পর্কে আর কিছু বলবার নেই।’
সুতরাং এই সিদ্ধান্ত। পরব্রহ্মকে জানাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য। তুমি হয়তো একজন পণ্ডিত ব্যক্তি এবং শাস্ত্রে তোমার অগাধ পাণ্ডিত্যও আছে। কিন্তু পাণ্ডিত্য এবং ব্রহ্মজ্ঞান এক নয়। শাস্ত্রনিহিত সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করতে না পারলে তা হবে বুদ্ধির মারপ্যাঁচ মাত্র। আত্মজ্ঞান লাভ হলে মানুষের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটে। তিনি এক অন্য মানুষে পরিণত হন। এটাই জ্ঞানের পরীক্ষা। আমরা শাস্ত্র নিয়ে নানা আলোচনা করতে পারি, এমনকি তা থেকে উদ্ধৃতিও দিতে পারি। কিন্তু আমরা যদি নীচ, স্বার্থপর ও অসৎ হই তবে এই সকল আলোচনা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের জীবনই আমাদের বলে দেয় তিনি পরম সত্যকে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর জীবন আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁর চরিত্র আমাদের আকৃষ্ট করে। তাঁকে ভগবান বলে মনে হয়। তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু আগুনকে কি কখনও লুকিয়ে রাখা যায়? শত চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারেন না। আমরা তাঁকে দেখে আনন্দ পাই। কারণ তিনি যে আনন্দস্বরূপ। এই লক্ষণ দেখেই ঈশ্বরতুল্য ব্যক্তিকে চেনা যায়।
তে তমৰ্চয়ন্তস্ত্বং হি নঃ পিতা যোঽস্মাকমবিদ্যায়াঃ পরং পারং তারয়সীতি।
নমঃ পরমঋষিভ্যো নমঃ পরমঋষিভ্যঃ॥৮।।
অন্বয়: তে (ঐ শিষ্যেরা); তম্ অৰ্চয়ন্তঃ (তাঁকে অর্চনা করতে আরম্ভ করলেন); ত্বং হি নঃ পিতা ([তাঁরা বললেন] আপনিই আমাদের পিতা); যঃ ([কারণ আপনি) যিনি); অস্মাকম্ (আমাদের); অবিদ্যায়াঃ পরং পারম্ (অবিদ্যার পরপারে); তারয়সি (নিয়ে গেলেন); নমঃ পরম-ঋষিভ্যঃ (আমরা মহান ঋষিদের প্রণাম করি); নমঃ পুরম-ঋষিভ্যঃ ([পুনরায়] আমরা মহান ঋষিদের প্রণাম করি)।
সরলার্থ: শিষ্যরা গুরুর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করলেন। তাঁরা বললেন : ‘আপনি আমাদের পিতা, কারণ আপনিই আমাদের অজ্ঞানতার পরপারে নিয়ে গেছেন। আমরা সেই মহান ঋষিদের বারবার প্রণাম করি।’
ব্যাখ্যা: শিষ্যরা এখন সবকিছু জেনেছেন। তাই তাঁরা গুরুর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আত্মজ্ঞানই সর্বোচ্চ দান। অর্থদানও দান। কিন্তু অর্থ তো চিরস্থায়ী নয়। আবার শিক্ষাদানও যথেষ্ট নয়। কারণ শিক্ষার সাহায্যেও সব সমস্যার সমাধান হয় না। আধ্যাত্মিক জ্ঞানই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান। তাই অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে শিষ্যরা গুরুকে তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন।
‘ত্বং হি নঃ পিতা’—আপনিই আমাদের পিতা। পিতা যেমন ধনসম্পদ তাঁর সন্তানদের দিয়ে যান ঠিক তেমনি আপনি আমাদের এই সর্বোচ্চ জ্ঞান দান করেছেন।
আমরা গুরুকে পিতা বলি কেন? শঙ্করাচার্য বলেন : যিনি তোমাকে এই শরীর দিয়েছেন তিনিই তোমার পিতা। এই কারণে তিনি পূজনীয়। আমরা তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আমরা তাঁকে ভালবাসি এবং শ্রদ্ধা করি। কিন্তু যিনি আমাকে মুক্তির পথ দেখান, যিনি আমাকে অভয়ধামে পৌঁছে দেন তাঁকে আমরা কোন্ স্থান দেব? তিনি কি আমাদের পিতা নন?
‘অস্মাকম্ অবিদ্যায়াঃ পরং পারং তারয়সি’—তিনি আমাদের অজ্ঞান নদীর পরপারে নিয়ে যান। প্রায় সবধর্মেই এই নদীর ধারণা দেখতে পাওয়া যায়। এই সেই নদী যার পরপারে আমাকে যেতে হবে। কিন্তু কিভাবে অপর পারে যাব আমি তা জানি না। এই নদীটি কি? এ অজ্ঞানতার নদী। কে আমাদের এই নদীর অপর পারে পৌঁছে দেবেন? গুরু, তিনিই তো আমাদের কর্ণধার।
‘নমঃ পরমঋষিভ্যঃ’—এবার আমরা সকল গুরুপরম্পরাকে প্রণাম করি, যাঁরা এই জ্ঞান—আত্মজ্ঞান বা পরমজ্ঞান আমাদের দান করেছেন। কিন্তু এখানে ‘নমঃ পরমঋষিভ্যঃ’ কথাটি দুবার বলা হয়েছে কেন? গুরুর প্রতি ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য।
।। প্রশ্ন উপনিষদের ষষ্ঠ প্রশ্ন সমাপ্ত।।
ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবা ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ।
স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টুবাংসস্তনূভির্ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ॥
