শ্যামসুন্দর ঘোষ,মন্তেশ্বর(পূর্ব বর্ধমান),২৪ আগস্ট : সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্টের ৩৪ বছর আর তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছর মিলে প্রায় অর্ধ শতাব্দী সব প্রকার সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত পূর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর থানার রাউত গ্রামের বামুন পুকুর পাড়ের অন্তত ৫০ টি হিন্দু পরিবার ৷ গ্রামে যাতায়াতের মূল রাস্তাটি সেই আদ্যিকালের মেঠোপথ । আজও বর্ষায় হাঁটুর উপর কাদা জমে । পানীয় জলের ব্যবস্থা বলতে একটিমাত্র টিউবওয়েল । ফলে প্রচন্ড চাপ পড়ে । বিকল হলে পানীয় জলের জন্য হাহাকার পড়ে যায় । পার্টির ক্যাডার থেকে পঞ্চায়েত প্রধান পর্যন্ত বহু তদ্বির,বহু অনুনয় বিনয় করেও কোনো কাজ হয়নি । তবে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই আশায় বুক বেঁধে আছে রাউৎ গ্রামের বামুন পুকুর পাড়ের বাসিন্দারা। স্থানীয় বিজেপি নেতাও তাদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, এবারে সমস্ত সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন বামুন পুকুর পাড়ের বাসিন্দারা। তবে কেন সিপিএম আর তৃণমূলের রোষের মুখে পড়তে হল, তা আজও গ্রামবাসীদের কাছে রহস্য হয়েই রহে গেছে ।
মন্তেশ্বর থানার রাউত গ্রামের বামুন পুকুর পাড়ের বাসিন্দাদের মূল পেশা মূলত কৃষিকাজ ও খেতমজুরি । সেই বামফ্রন্টের জমানায় প্রায় ৫০ টি পরিবার ঘর বেঁধেছিল বামুন পুকুর পাড়ে । বাড়িগুলি মাটির ছিড়েবেড়া দেওয়াল আর খড় অথবা করগেটের ছাউনি । সময়ের সাথে সাথে সেগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে । গ্রামে যাতায়াতের রাস্তাটি সেই মেঠোপথ রয়েই গেছে । বর্ষায় হাঁটুর উপর কাদা হয়ে যায় । ফলে স্কুল পড়ুয়াদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ । তবে সবচেয়ে অসুবিধায় পড়তে হয় কেউ অসুস্থ হলে বা সন্তানসম্ভবা নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলে । তখন খাটিয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই ।
স্থানীয় গৃহবধূ খুকু দাস বলেন,’বহুকাল আগে থেকে আমাদের গ্রামে মাত্র একটা টিউবওয়েল রয়েছে । ওটাই মূলত আমাদের পানীয় জলের একমাত্র উৎস । চাপ পড়ার কারনে কলটা প্রায়ই অকেজো হয়ে যায় । তখন জল সংগ্রহের জন্য ছুটতে হয় আশপাশের গ্রামে । তারপর নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ফের কলটা মেরামতি করা হয় ।’ তাঁর অভিযোগ,’তৃণমূলের সময়ে সজল ধারা প্রকল্পের পাইপলাইন বসানো হয়েছিল । তখন পরিবার পিছু ৫০ টাকা করে আমাদের কাছে নেওয়া হয় । কিন্তু এযাবৎ ওই পাইপ লাইনে একফোঁটা জল গড়ায়নি । জানিনা কি অপরাধে আমাদের এতদিন মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে ।’
গ্রামবাসীরা জানান,নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তারা টিউবওয়েল সারান,রাস্তাটিকে মোটামুটি চলাচলের যোগ্য করে তোলেন । তবে ঘরবাড়ি মেরামতি ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ বিপজ্জনক বাড়িতেই বসবাস করতে বাধ্য হন । ছোট্ট ওই গ্রামটিকে এক ঝলক দেখলে মনে হবে মধ্য যুগের কোনো এক হতদরিদ্র অখ্যাত গ্রাম । চারদিকে বন জঙ্গলে ভরা । সাপের উপদ্রব । মাঝে মধ্যে শিয়ালের দলের দেখাও মেলে । পেশায় খেতমজুর মিষ্টি বয়রা বলেন, ‘সিপিএমের জমানায় তো আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি । ২০১১ সালে পরিবর্তনের পর ভেবেছিলাম হয়ত আমাদের গ্রামের কিছু পরিবর্তন হবে । কিন্তু সিপিএমের মতই তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান থেকে শুরু করে নেতারা আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। কত তদ্বির করেছি কিন্তু বাবুদের মন গলেনি ।’ তিনি আফশোস করে বলেন,’এতগুলো বছর ধরে কেন আমাদের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হল জানি না ।’
তবে যেটা জানা যাচ্ছে যে,মন্তেশ্বরের রাউতগ্রামের বামুন পুকুর পাড়ের হিন্দু পরিবারগুলি বরাবরই বিজেপি সমর্থক । আর তাদের এই অপরাধেই সিপিএম এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসের রোষের মুখে পড়তে হয় । দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী নুন্যতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পরিবারগুলি “বঞ্চিত হওয়া জন্মগত অধিকার” বলেই ধরে নিয়েছিল । রাউতগ্রামের বামুন পুকুর পাড়ের হিন্দু পরিবারগুলি যে এতবছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিল, সেটা স্বীকার করেছেন পূর্বস্থলী উত্তর বিধানসভার বিজেপির এক নম্বর মন্ডল সভাপতি গৌতম হালদার । তিনি বলেন,’আমরা জানি সিপিএম আর তৃণমূলের জমানায় ওই গ্রামে উন্নয়নমূলক কোনো কাজই হয়নি । মমতা ব্যানার্জি বা তার ভাইরা উন্নয়ন হয়েছে বলে যে এত ঢাক পেটাত, তা ওই গ্রামে একবার গেলেই বুঝতে পারত কি উন্নয়ন হয়েছে৷ তবে এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার এসেছে । ওই গ্রামে সমস্ত রকম সরকারি প্রকল্পের সুবিধা আমরা পৌঁছে দেবো৷’
স্থানীয় মহিলারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে গ্রামের বেশ কয়েকজন মহিলার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ৩০০০ টাকা করে অনুদান ঢুকেছে । এনিয়ে তারা খুশি প্রকাশ করেন । তবে কিছু মহিলার অভিযোগ যে, বিগত তিন মাসে তারা অন্নপূর্ণা ভান্ডারের সরকারি অনুদান পাননি । এনিয়ে তাদের গলায় শোনা যায় উদ্বেগের সুর ।।
