এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৩ জুলাই : আজ থেকে এরাজ্যে চালু হয়ে গেল ‘গুন্ডাদমন আইন’ । যার পোশাকি নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬’ (Anti-social Activities Act) । এই আইনের মধ্য দিয়ে মূলত তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও প্রশাসনকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হল । সিপিএম ও তৃণমূল জমানা মিলে বিগত প্রায় অর্ধ দশক ধরে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য এই আইন বিশেষ কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে ।
গত ২৯ জুন বিধানসভায় পাস গুন্ডা দমন সংক্রান্ত জোড়া বিল পাস হয়। প্রথমটি হল : অ্যান্টি সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটি অ্যাক্ট । এবং দ্বিতীয়টি : দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার সংশোধনী আইন । আইনের খসড়ায় ‘গুন্ডা’র স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। গুন্ডা বলতে প্রধানত বলা হয়েছে, নিজে অথবা কোনও দল, গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য বা নেতা হিসেবে নিয়মিতভাবে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ করে, করার চেষ্টা করেন, উস্কানি দেওয়া, অর্থ জোগান বা সহায়তা করে এমন ব্যক্তিকে। মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি, জীবন বা সম্পত্তির নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, আইনসম্মত ব্যবসায় বাধা দেওয়া, জমি দখল, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি, বেআইনি খনি বা বালি কারবার এবং বনজ সম্পদের ক্ষতিসাধন— এই সব কিছুকেই সমাজবিরোধী কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তো বটেই, অপরাধের সম্ভাবনা বা পুনরাবৃত্তি রুখতেও পুলিশ এখন আগাম ব্যবস্থা নিতে পারবে। এছাড়া, কমিশন চাইলে অপরাধের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির দ্বিগুণ পরিমাণ ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।
নতুন এই আইনের অধীনে রাজ্যের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কমিশনার বা সরকার নির্ধারিত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা যে কোনও সমাজবিরোধীকে আটকের নির্দেশ দিতে পারবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সতর্কতা হিসেবে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটকে রাখা সম্ভব। তবে আটক ব্যক্তি চাইলে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য নির্ধারিত সরকারি কমিটি বা কমিশনের কাছে আবেদন জানাতে পারবেন।
এই আইনে জামিন-অযোগ্য ধারা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও রাখা হয়েছে। ফলে পুলিশ কোনও পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং আদালত থেকে সহজে জামিন পাওয়া অপরাধীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা যদি নিশ্চিত হন যে, কোনও দাগী অপরাধী বা গুন্ডা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সেই অপরাধীকে এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সমগ্র জেলা থেকে বাইরে করে দেওয়ার মত নির্দেশ দিতে পারবেন।
এক নজরে দেখা যাক এই আইনে কী রয়েছে ?
প্রতিরোধমূলক গ্রেফতার (Preventive Arrest): কোনো ব্যক্তি সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে গুন্ডাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থান রাখা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী আটক: অশান্তি ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় অভিযুক্তকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত আটক রাখা যেতে পারে।
জামিন অযোগ্য: এই আইনের আওতাধীন সমস্ত অপরাধ জামিন অযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে।
পালিয়ে গেলে বিশেষ ব্যবস্থা: কেউ গ্রেফতারি এড়াতে পলাতক হলে তার সম্পত্তির ওপর আইনি পদক্ষেপ করা হতে পারে।
দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার সংশোধনী আইন অনুযায়ী বিক্ষোভ, দাঙ্গা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের জেরে সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নষ্ট করলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে সরকার। এর জন্য অভিযুক্তের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। ‘ক্লেমস কমিশনে’র কাছে আবেদন করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এক্ষেত্রে ‘ক্লেমস কমিশন’কে দেওয়ানি আদালত হিসেবে গণ্য করা হবে। কমিশনের রায়কেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বিলে। অপরাধীর পাশাপাশি উস্কানি দিলে বা অর্থ জোগান দিলে এবং সংগঠক ও অভিযুক্তের আশ্রয়দাতাকেও অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে এই আইনের সবচেয়ে বড় সমালোচক হল সিপিএম । তারা এটিকে “কালা কানুন” আখ্যা দিয়েছে । তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন,”১৫ বছরের তৃণমূলের গুন্ডা আর ৩৪ বছরের সিপিএমের হার্মাদদের জব্দ করার জন্যই এই আইন আনা হয়েছে ।’।
