এইদিন ওয়েবডেস্ক,বেলফাস্ট,১০ জুন : আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্টে এক আইরিশ ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদের চেষ্টার ঘটনার পর মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে গনরোষ আছড়ে পড়েছে । এই ঘটনার পর বেলফাস্টে রাতারাতি অভিবাসী-বিরোধী হিংসার ঢেউ ওঠে, যেখানে মুখোশধারী ব্যক্তিরা মুসলিম পরিবারগুলোকে তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং যানবাহন পুড়িয়ে দেয় । ব্রিটিশ বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদরা জাতিগত সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে চালানো “মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের” হিংসার নিন্দা করেছেন।
সোমবার রাত প্রায় সাড়ে দশটায় একটি আবাসিক রাস্তায় বড় একটি শব্জি কাটার ছুরি দিয়ে নৃশংসভাবে আক্রমণের শিকার হয়ে ৪০-এর কোঠায় থাকা স্টিফেন ওগিলভি তার বাম চোখ হারানোর পর হামলাকারী সুদানি অভিবাসী হাদি আলোদিদকে (ছবিতে) গ্রেপ্তার করা হয়। ৩০ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও ছুরি রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে, পাশাপাশি এনএইচএস-এর একজন রেডিওগ্রাফারকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পৃথক অভিযোগও রয়েছে।
ওগিলভি আক্রান্ত হওয়ার পর হাতে আঘাতের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থাকাকালীন আলোদিদ বলেছে, ‘আমি একজনকে মেরে ফেলেছি, আমি জানি না সে মারা গেছে কি না’। এরপর সে একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে বলেছে: ‘আমি তোমাকে মেরে ফেলব’, একজন গোয়েন্দা বেলফাস্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে এ কথা জানান।
হামলাকারী ব্যক্তি,যেভভুক্তভোগীর একই ফ্ল্যাট ব্লকে থাকত, ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে আদালতে হাজির হয় এবং তাকে চার সপ্তাহের জন্য রিমান্ডে পাঠানো হয়।সে আইনজীবী নিতে অস্বীকার করে এবং আরবি দোভাষীর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো শোনে,কিন্তু কোনো জবাব দেয়নি।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা আদালতকে জানান যে, পুলিশ অভিযুক্তকে একটি ছুরি হাতে এবং ওগিলভির ওপর বসে থাকা অবস্থায় খুঁজে পায়। ওগিলভি তার বাম চোখ হারিয়েছেন এবং তার মাথা, মুখ ও পিঠে গভীর ক্ষত হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তা আদালতকে জানান যে, আলোদিদের স্বভাব ‘অনিশ্চিত’ এবং এই ঘটনা নিয়ে ‘প্রবল জনরোষের’ কারণে তার মুক্তি হলে ‘ব্যাপক জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত’ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করায় তার জামিন নামঞ্জুর করা হয়।
গনরোষ দেখে জেলা জজ স্টিফেন কিওন বলেন, তাকে জামিন দেওয়ার ঝুঁকি ‘অনেক বেশি’ এবং ‘কোনো জামিনের শর্ত দ্বারাই তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না’। চার সপ্তাহ পর তাকে আবার আদালতে হাজির হতে হবে।
ছুরিকাঘাতের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের কিছু অংশে অভিবাসী-বিরোধী দাঙ্গা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। হাজার হাজার লয়্যালিস্ট সারা শহর জুড়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অভিবাসীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। শহরের প্রোটেস্ট্যান্ট এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে পালিয়ে আসা বিদেশি পরিবারগুলোকে সাহায্য করার জন্য পুলিশকে দাঙ্গাকারীদের সাথে রীতিমতো লড়াই করতে হয়েছে।
এদিকে,আক্রান্ত ওগিলভির পরিবার জানিয়েছে যে, এই ঘটনায় তারা ‘সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত’ এবং সাধারণ মানুষদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। আহত স্টিফেন ওগিলভির পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা এটা পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, রাতারাতি কোনো ধরনের অশান্তি কাম্য নয় এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। আমাদের দেশে অনেক অভিবাসী আছেন যারা অত্যন্ত মূল্যবান অবদান রাখেন… আমরা চাই না এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিকে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে বা শত্রুতা উস্কে দিতে ব্যবহার করা হোক ।”
আক্রান্তের পরিবারের তরফে আরও বলা হয়েছে,’এই ঘটনার পর সৃষ্ট উত্তেজনা এবং বিক্ষোভের আলোচনা সম্পর্কে আমরা অবগত। আমরা এটা পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, রাতভর অশান্তি কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।আমাদের দেশে অনেক অভিবাসী আছেন যারা অত্যন্ত মূল্যবান অবদান রাখেন, যার মধ্যে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং আতিথেয়তা খাতও অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশকে সচল রাখতে আমরা তাদের ওপর নির্ভরশীল।’
এদিকে লন্ডনের সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন,’এই হামলা গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু “মানুষকে তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া… এর সঠিক প্রতিক্রিয়া নয় ।’ তিনি আরও বলেন, এই হিংসায় জড়িত সকলকে “আইনের পূর্ণ শক্তির” মুখোমুখি হতে হবে।’
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের পুলিশ সার্ভিস (পিএসএনআই) এর আগে হামলাকারী ব্যক্তির অভিবাসন অবস্থা এবং সে কীভাবে যুক্তরাজ্যে এসেছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল। প্যারিস থেকে ডাবলিনে বিমানযোগে এসে আলোদিদ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইরিশ সীমান্ত পেরিয়ে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে প্রবেশ করেন। সে পৌঁছানোর পর রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
সোমবারের এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় পিএসএনআই (PSNI) একটি ‘গুরুতর ঘটনা’ নথিভুক্ত করেছে। হামলাটি ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে এবং এতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি মাটিতে পড়ে থাকা ভুক্তভোগীর বুকে বসে মাথা ও ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের রেকর্ড করা এবং সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা মর্মান্তিক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একজন ছুরিধারী ব্যক্তি আরেকজনকে মাটিতে চেপে ধরে তার মুখ ও ঘাড়ে বারবার ছুরিকাঘাত করছে।
পুলিশ পৌঁছানোর আগেই, ম্যাট ম্যাককিয়ারনানসহ পথচারীরা হামলাকারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে । ম্যাককিয়ারনান তার ছেলের হার্লিং স্টিক ব্যবহার করে হামলাটি থামানোর চেষ্টা করেন এবং হামলাকারীকে বেশ কয়েকবার আঘাত করেন।গত রাতে তিনি বলেন: ‘আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম রাস্তায় দুজন লোক মারামারি করছে, একজন আরেকজনের ওপর । আমরা ভাবলাম, গিয়ে ব্যাপারটা থামানো উচিত। আমার বন্ধু আন্দ্রে সামনের যাত্রীর আসনে ছিল এবং সে-ই প্রথম লাফিয়ে নামে। কিন্তু কাছে যেতেই সে ছুরিটা দেখতে পায়। সে আমার দিকে চিৎকার করে বলল… সাহায্যের জন্য কিছু আনতে।’।
