রাহুল রায়,কাটোয়া(পূর্ব বর্ধমান),০৮ নভেম্বর : আজ রাজ্য জুড়ে ধুমধাম সহকারে কালীপূজা পালিত হচ্ছে । বিভিন্ন জেলার থিমের পূজোর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পূজোগুলিকে ঘিরেও ব্যাপক উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী পূজো হল পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া-২ ব্লকের কুরচিগ্ৰামে মা ন’ঠাকরুনের পুজো ৷ শতাব্দী প্রাচীন এই দেবী আজও পুরাতন বটবৃক্ষের নিচে পূজিতা হন । দেবী ন’ঠাকরুনের পুজোর আরও একটা বিশেষত্ব হল, সকালে প্রতিমা গড়ে পুজো হয়ে আবার ভোর রাতে সূর্যোদয়ের আগেই দেবীকে নিরঞ্জন করতে হয়।
পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার একটি বিশেষ প্রাচীন ঐতিহ্য হলো কালী মাতাকে ‘ঠাকরুণ’ (যেমন: বড়ো, মেজ, সেজ, ন’ ও ছোটো ঠাকরুণ) নামে সম্বোধন করা । এর মধ্যে কাটোয়া-২ ব্লকের কুরচি গ্রামের মা ন’ঠাকরুণের পুজো অত্যন্ত প্রাচীন । দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত জাগ্রত বলে মনে করা হয় । ন’ঠাকরুণের পূজোয় রয়েছে বেশ কিছু অনন্য রীতিনীতি ।
ইতিহাস গবেষকদের মতে, এই পুজোটি প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। কথিত আছে, নবদ্বীপের বিখ্যাত তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সমসাময়িক কালে কুরচি গ্রামের এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলটি ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছিল এবং মা কালীর সাধনার একটি অন্যতম পীঠস্থান ছিল। শোনা যায়, গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ মুরারি মোহন চট্টোপাধ্যায় প্রথম মা ন’ঠাকরুণের স্বপ্নাদেশ পান। দেবীর নির্দেশে তিনি গ্রামের একটি বিশাল বটগাছের নীচে পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করে মায়ের কঠোর সাধনা শুরু করেন। সেই ঐতিহাসিক পঞ্চমুণ্ডির আসনটি আজও অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেখানেই বংশানুক্রমে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পরিচালনায় ও তন্ত্রমতে মায়ের পুজো হয়ে আসছে ।
বর্তমানে কুরচিগ্ৰামে মা ন’ঠাকরুনের পুজো সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। এই কালীপূজার বিশেষত্ব হল, অমাবস্যা শুরুর পর প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু করতে হয় । পুজোর দিনেই চক্ষুদান কাজও সম্পন্ন করা হয় এবং পুজোর শেষে সূর্যোদয়ের আগেই সেই প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয়। এক রাতের বেশি মৃন্ময়ী প্রতিমা রাখার নিয়ম এখানে নেই। পাঁচ শতাধিক বছর ধরেই আজও এই প্রথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা হয় । কুরচিগ্ৰামে ন’ঠাকরুনের পুজো ঘিরে উন্মাদনায় মেতে ওঠে আশপাশের গ্ৰামগুলি । দূর-দূরান্ত, এমনকি কলকাতা থেকেও বহু মানুষ গভীর বিশ্বাস নিয়ে এই জাগ্রত দেবীর চরণে পুজোর ডালি দিতে কুরচি গ্রামে আসেন। প্রতি বছরের মত এবারেও এই পুজো ঘিরে গ্ৰামে বসছে মেলা বসেছে । পূণ্যার্থীদের সুবিধার্থে গ্রামের শহীদ সুনীল পাঠাগার ক্লাবের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন । তবে পূজো সম্পন্ন হওয়ার পর সূর্যোদয়ের আগেই ভোর রাতে দেবী প্রতিমার নিরঞ্জনের প্রচলন থাকলেও সপ্তাহ জুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ ।।
