এইদিন ওয়েবডেস্ক,ভাতার(পূর্ব বর্ধমান),১৯ অক্টোবর : শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায় রাজবিদ্যা- রাজগুহ্যযোগের ২৬ নম্বর শ্লোকে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন : “পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি/ তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ“৷ অর্থাৎ, পাতা, ফুল, ফল এবং জল দিয়ে আমাকে যে ভক্তির সাথে অর্পণ করে, শুদ্ধচিত্ত ব্যক্তির সেই ভক্তিপূর্বক উৎসর্গীকৃত উপহার আমি প্রীতি সহকারে গ্রহণ করি । একই স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলে পূর্ব বর্ধমান জেলার ভাতারের বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতা । মহান যোগী ঠাকুর ওঙ্কারনাথ দ্বারা স্থাপিত হওয়া বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতার নির্দেশ ১৫৩ বছর ধরে আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসা হচ্ছে । আজ সোমবার মহাষ্টমীর দিন অনাড়ম্বর ভাবেই কুলদেবীর পূজো সম্পন্ন করলেন ভাতারের বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতা মন্দিরের সেবাইত গোবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।
ভাতার বাজারের অদূরে সোৎকালি এলাকায় ভাতার- মালডাঙ্গা সড়কপথের বাম পাশে রয়েছে বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতা মন্দিরটি । দেবীর পূজার সূচনা হয় ১২৮০ বঙ্গাব্দে(ইংরেজি ১৮৭৩ – ১৮৭৪) । গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাবা ঈশ্বর জগন্নাথ মুখোপাধ্যায় ঠাকুর ওঙ্কারনাথের শিষ্য ছিলেন । প্রায় ১৪ কাঠা জায়গায় আশ্রম গড়ে স্ত্রী অন্নপূর্ণাদেবী, চার ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন জগন্নাথ মুখোপাধ্যায় । ভিটের একপ্রান্তে ছিল তাঁর পঞ্চমুন্ডির আসন । সেখানে বসেই তিনি সাধনা করতেন । অত্যন্ত হতদরিদ্র সংসার ছিল তাঁর ।

কথিত আছে, ১২৮০ বঙ্গাব্দে দুর্গাপূজার আগে শিষ্যের বাড়িতে এসেছিলেন ঠাকুর ওঙ্কারনাথ । বাড়িতে গুরুর উপস্থিতিতেই একদিন রাতে দেবীদুর্গার স্বপ্নাদেশ পান জগন্নাথ মুখোপাধ্যায়। গোবিন্দবাবু বলেন,’পঞ্চমুন্ডি আসনের পাশে মুর্তি প্রতিষ্ঠা করে প্রতিবছর আশ্বীন ও চৈত্র মাসে পূজো করার জন্য বাবাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দেবী । পরের দিন সকালে গুরুকে একথা জানান বাবা । তারপরেই গুরুদেবের কথামত পঞ্চমুন্ডী আসনের পাশে তালপাতার ছাউনি দিয়ে ঘিরে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন ঠাকুর ওঙ্কারনাথ ।’
গোবিন্দবাবু জানান, মহাষষ্ঠীর দিন পঞ্চমুন্ডির আসনে দেবীর অধিবাস হয় । তারপর মন্দিরে এসে মূলপূজা শুরু হয়। তিনি বলেছেন, ‘দেবী এও নির্দেশ দেন যে, আমায় বনের ফুল-ফল, থোর আর চোখের জল ভক্তিভরে নিবেদন করলেই আমি খুশি হব । সেই প্রথা আজও চলে আসছে ।’
জানা গেছে,কয়েক বছর তালপাতার ছাউনিতেই দেবীর পূজা পরিচালনা করেন জগন্নাথ মুখোপাধ্যায়। পরে ওই স্থানেই মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাউনি দেওয়া মন্দির নির্মান করায় । পরে তিনি প্রয়াত হলে ছেলেরা সেই মাটির ঘর ভেঙে রাধাকৃষ্ণের একটা পাকা মন্দির নির্মান করেন । দেবীর মন্দিরটি সরিয়ে আনা হয় সড়পথের ধারে । করগেটের ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে বর্তমানে বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতার পূজা হচ্ছে । ভাতারের বাসন্তী দুর্গাদেবী মাতার বৈষ্ণবমতে পূজা হয় । আশ্বীন মাসে দুর্গাপূজা ও চৈত্র মাসে বাসন্তী পূজো চারদিন ধরে চলে । মূলত ভক্তদের দানের অর্থেই দেবীর বাৎসরিক পূজোর খরচ চলে বলে জানিয়েছেন সেবাইত গোবিন্দ মুখোপাধ্যায় ।

জানা গেছে,গোবিন্দবাবুদের বাবা-মা প্রয়াত । তিন বোন চন্ডীরানী, লক্ষ্মীরানী ও পূর্ণিমার বিয়ে হয়ে গেছে । সেজ ভাই শ্রীচরণ অনেক বছর আগেই প্রয়াত হয়েছেন । ছোট ভাই মধুসুদন মুখোপাধ্যায় গাংপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন । দাদা গোপাল চন্দ্র একই ভিটেতে পৃথক সংসারে থাকেন। ছোট ভাই মধুসুদন ও গোবিন্দ একই সংসারে থাকেন । গোবিন্দবাবুর উপরেই মূলত দেবীর নিত্যসেবা ও বাৎসরিক পূজো পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে । প্রতিদিন বাজারের দোকান ঘুরে ঘুরে প্রণামী সংগ্রহ করে তিনি সংসার চালান৷ মূলত সেই উপার্জনেই কুলদেবীর নিত্যসেবা ও বছরে দু’বার বাৎসরিক পূজোর খরচ চালান তিনি । গোবিন্দবাবু বলেন,’দুর্গাপূজায় আমি কোনো সরকারি অনুদান পাইনা । ব্যবসায়ীদের দানের অর্থেই দেবীর বাৎসরিক পূজোর খরচ চলে ।’ তবে তার অবর্তমানে কি হবে,এনিয়ে কিছুটা হলেও চিন্তিত দেখা গেল গেল তাঁকে । কারন, বংশধর ছাড়া কুলদেবীর পূজোর অধিকারী নয় কেউ ।।

