প্রেম চির অমলিন…অবিনশ্বর । প্রেম মানে না আর্থিক বৈষম্য,জাতপাত ও ধর্মীয় ভেদাভেদ । চরম ধর্মীয় ভেদাভেদ আর হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড বহুল বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের হিন্দু কিশোর ও মুসলিম কিশোরীর “অমর প্রেম কাহিনী” তোলপাড় ফেলে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় । ঘিরে ধরা ভিড়ের মাঝে ফোনে বাবার সঙ্গে ওই অকুতোভয় কিশোরীর একটা কথায় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে অনেক প্রেমিক হৃদয় : “শুভ’র কাছ থেকে আমায় কেড়ে নিও না আব্বু,তোমার দু’পায়ে পড়ি” । ঘিরে ধরা জনতার উদ্দেশ্যে দৃপ্ত কন্ঠে মেয়েটিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি জানি শুভ চায়ের দোকান চালায় । গরীব । মন্দিরে ভাড়া বাসায় থাকে । ও হিন্দু, তাতে কি ? আমি সব জাইনা আসছি ! আমরা মন্দিরে বিয়ে করব ।’ এবং মেয়েটি আরও বলে, ‘আমি শুভকে ছাড়া আর কিছুই চাই না,কাউকে চিনি না জানিনা ৷’
যেটা জানতে পারা যাচ্ছে যে,মেয়েটির নাম তাবাসসুম ৷ বাড়ি বরিশালের গাজীপুর । বাবা সিনেমাহলের মালিক । অবস্থাপন্ন পরিবার । এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে তাবাসসুম ৷ ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল । অন্যদিকে, শুভ নামে ওই হিন্দু কিশোরের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটায় । একটি চায়ের দোকান চালায় সে । তাদের নিজের কোনো বাড়িঘর নেই এবং একটি মন্দিরে পরিবারের সঙ্গে থাকে । অত্যন্ত হতদরিদ্র পরিবার ।
তাবাসসুম-শুভ’র পরিচয় ফেসবুকে । তারপর মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে নিয়মিত কথোপকথন । তা থেকে দু’জনের মধ্যে শুরু হয় মন দেওয়া-নেওয়া । ক্রমে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে দু’জনের । প্রায় দু’বছরের সম্পর্ক । সম্প্রতি তাবাসসুমের পরিবার তার বিয়ের জন্য যোগাযোগ করছিল । কিন্তু প্রেমিককে হারানোর ভয়ে ব্যাকুল করে তুলেছিল তাকে । এরপর গতকাল কলেজে যাওয়ার নাম করে কাঁধে স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সে সোজা চলে আসে বরগুনার পাথরঘাটায় প্রেমিকের কাছে । কিন্তু ভিড় তাদের ঘিরে ধরে । শুরু হয় জেরা । উৎসাহী লোকজন নিজের নিজের মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করে । সেই সমস্ত ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ।
একের পর ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের অকপট জবাব দেয় তাবাসসুম । “আমি শুভকে পছন্দ করি”৷
প্রশ্ন : ও তো হিন্দু, তাহলে ?
উত্তর : ” হিন্দু থাক ।”
প্রশ্ন : আপনি কি মুসলমান ?
উত্তর : হ্যাঁ, আমি মুসলমান ।
প্রশ্ন : কি চাইছেন এখন ?
উত্তর : আমি ওকে বিয়ে করব ।
প্রশ্ন : আপনাদের তো বয়স হয়নি । আইনগত কিভাবে বিয়ে করবেন ?
উত্তর : আইনগত ভাবে না পারি, মন্দিরে বিয়ে করব।
এরপর মেয়েটির সামনে ধর্ম পরিচয়, পারিবারিক অসম্মতির প্রশঙ্গ উত্থাপন করা হয় । মেয়েটি দীপ্ত কন্ঠে বলে : “আমি অতসব কিছু জানিনা । আমি ওকে পছন্দ করি এবং বিয়ে করব, ব্যাস ।”
প্রশ্ন : আপনি মুসলিম থেকে হিন্দু হতে চাইছেন, পরিবার আত্মীয়স্বজন বাধা দেবে না ?
উত্তর : আমি পরিবার আত্মীয়স্বজন কিছু জানি না। আমি শুধু শুভকে জানি । আমার শুধু শুভকেই লাগবে, আর কিছু চাই না ।
মেয়েটি তার প্রেমিকের হাত তুলে ধরে দৃঢ়ভাবে বলে : “আমি ওর সব জানে এসেছি । ওর একটা চায়ের দোকান । ও গরীব পরিবারের । ওর থাকার মত কোনো জায়গা নেই । ও মন্দিরে ভাড়া থাকে । আমি সব জেনে এসেছি । আপনারা আর কি জানতে চান বলুন তো ?’ পরে সেখান থেকেই মেয়েটি তার বাবাকে ফোন করে বলে, ‘শুভ’র কাছ থেকে আমায় কেড়ে নিও না আব্বু,তোমার দু’পায়ে পড়ি । আব্বু তুমি বিশ্বাস করো আমার শুভকেই লাগবে৷শুভ ছাড়া আমি বাছবোনা আব্বু ।’
শুভ হয়তো ভয় পেয়েছিল, তার সাময়িক নীরবতা সম্ভাব্য পরিণতির আশঙ্কায় যেন সম্পর্ককে অস্বীকার করতে চেয়েছিল । এদিকে সমাজের চোখ রাঙানিকে তুচ্ছ করে মেয়েটি আকুল হয়ে চেয়ে থাকে প্রেমিকের দিকে । মৃদু কণ্ঠে প্রেমিককে তার বারবার প্রশ্ন : “শুভ, কিছু তো বলো । চুপ করে আছ কেন ?” নীরবতা ভাঙে শুভ । দৃঢ় কন্ঠে সে ভিড়ের উদ্দেশে বলে,”আমি ওকে পছন্দ করি । অবশ্যই বিয়ে করতে চাই ।” জনতা তখন তাদের বয়স আর ধর্ম পরিচয়ের কথা জানিয়ে তাদের এই সম্পর্কের সম্ভাব্য শেষ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ।
যদিও ছেলেটির মা সবকিছু মেয়েটি ইচ্ছা ও সমাজের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছেন । তিনি মেয়েটিকে গ্রহণ করতে রাজি হলেও মৌলবাদীদের রোষ থেকে ছেলেকে বাঁচাতে তিনি নিজের ইচ্ছার কথা ক্যামেরার সামনে প্রকাশ করতে চাননি । এখন ওই কিশোর যুগল নিয়ে সমাজ কি সিদ্ধান্ত নিল তা অজানা রয়েছে ।
Author : Eidin Desk
