এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৭ অক্টোবর : আদালতের নির্দেশে চালানো এক পরিদর্শনে কলকাতা হাইকোর্টের ছাদের একটি ছোট ঘরে ইসলামিক ধর্মীয় গ্রন্থ, পাঠ্য সামগ্রী, তোশক, চেয়ার এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। তালাবদ্ধ ঘরটির চাবি আইনজীবী এজাজ হোসেনের কাছে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে যে, চাবিগুলো হাইকোর্ট প্রশাসনের হেফাজতে কেন নেই । আদালত এখন এজাজ হোসেনকে নির্দেশ দিয়েছে যে, কীভাবে ঘরটির চাবি তার হাতে এলো তার ব্যাখ্যা দিতে। আদালত তার নিরাপত্তা কমিটিকে হাইকোর্ট ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ঘর ও অন্যান্য অংশের চাবি রাখার পদ্ধতি পর্যালোচনা করতেও বলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি জনস্বার্থ মামলাকে কেন্দ্র করে—সঞ্জয় ঘোষ বনাম কলকাতা হাইকোর্ট এবং অন্যান্য [মামলা নম্বর WPA(P)/473/2026 সাথে CAN/1/2026]। পিটিশনে একটি বিস্ফোরক দাবি তোলা হয়: দেশের অন্যতম প্রাচীন ও উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কলকাতা হাইকোর্টের ছাদে নাকি বেআইনিভাবে নামাজ পড়া হচ্ছে এবং একটি মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ছবিতে কলকাতা হাইকোর্টের ছাদে টুপি পরা মুসলমানদের নামাজ পড়তেও দেখা গেছে ।হিন্দু আইনজীবীদের পক্ষ থেকে হরিনাম সংকীর্তন করার জন্য নির্দিষ্ট ঘর নির্ধারিত করার দাবি ওঠে ।
সঞ্জয় ঘোষের দায়ের করা ওই জনস্বার্থ মামলার (পিআইএল) শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি. ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রায়ের ডিভিশন বেঞ্চের সামনে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। পিটিশনে কলকাতা হাইকোর্ট ভবনের ছাদ ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
গত ৩০শে সেপ্টেম্বরের একটি আদেশে বেঞ্চ হাইকোর্ট রেজিস্ট্রিকে ছাদটি পরিদর্শন করে খুঁজে বের করতে বলেছিল যে, মুসলমান ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা সেখানে নামাজ পাঠ করছে কি না এবং যদি করে থাকেন, তবে দিনের বেলায় কত ঘন ঘন নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
আদালতের নির্দেশ অনুসরণ করে রেজিস্ট্রি একটি পরিদর্শন চালায় এবং রঙিন ছবিসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সেখানে একটি ছোট ঘর আছে যেখানে ইসলামিক ধর্মীয় বই ও সাহিত্য রাখা ছিল।পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুসারে, ঘরটিতে দুটি কাঠের গেট ছিল, যার দুটিই তালাবদ্ধ ছিল। রেজিস্ট্রি চাবি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারে যে, চাবিগুলো বার অ্যাসোসিয়েশন কক্ষ নং ১২-এর আইনজীবী এজাজ হোসেনের কাছে রয়েছে।পরে হোসেন আরও তিনজন আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিদর্শনের জন্য তালাবদ্ধ ঘরটি খোলা হয়।
ভেতরে কর্মকর্তারা ইসলাম সম্পর্কিত ধর্মীয় সাহিত্যের পাশাপাশি তোশক, প্লাস্টিকের চেয়ার, স্ট্যান্ড ফ্যান, একটি আলমারি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র খুঁজে পান। ঘরটিতে বালতি, টব,জলের জগ এবং চপ্পল ভর্তি একটি ঝুড়িও পাওয়া যায়।ধর্মীয় বই এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের উপস্থিতি ঘরটির ব্যবহার সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করে। তবে, রেজিস্ট্রির প্রতিবেদনে ছাদে কোনো মসজিদ ছিল কিনা বা সেখানে নিয়মিত নামাজ অনুষ্ঠিত হতো কিনা, তা নিশ্চিত করা হয়নি।
তালাবদ্ধ ঘরটির চাবি হাইকোর্ট প্রশাসনের পরিবর্তে একজন কর্মরত আইনজীবীর কাছে রাখা হয়েছে দেখে বেঞ্চ বিস্ময় প্রকাশ করেছে । আদালত উল্লেখ করেছে যে, আদালত চত্বরের ঘর, দরজা, কোর্ট হল, সিঁড়ি এবং অন্যান্য অংশের চাবি হাইকোর্ট প্রশাসনের জিম্মায় থাকা উচিত।এছাড়াও আদালত চত্বর, ভবন এবং টাওয়ারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশাসনের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। এই ধরনের বিষয়গুলো দেখার জন্য হাইকোর্টের কর্মরত বিচারপতিদের নিয়ে একটি নিরাপত্তা কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
হাইকোর্ট আবেদনকারীকে আইনজীবী এজাজ হোসেনকে এই মামলায় পক্ষভুক্ত করার অনুমতি দেয় এবং উক্ত আইনজীবীকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে কীভাবে বা কার কাছ থেকে তিনি এই চাবি পেলেন, তার লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ও চাবির হেফাজত খতিয়ে দেখতে বিষয়টি হাইকোর্টের ‘সিকিউরিটি কমিটি’র (বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত) কাছে পাঠানো হয়েছে, যা তাদের মতামত একটি সিল করা খামে আদালতে জমা দেবে।মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৬। সেদিনই ওই আইনজীবীর ব্যাখ্যা এবং সিকিউরিটি কমিটির গোপনীয় রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হবে।
কমিটিকে আদালত চত্বরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার মধ্যে ছাদের ঘরের এবং ভবনের অন্যান্য অংশের চাবির জিম্মা অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে নির্দেশনা প্রদানের জন্য বলা হয়েছে।আদালতের এই তদন্তে ছাদের ঘরের ব্যবহার, এর ভেতর থেকে পাওয়া ধর্মীয় পুস্তক ও অন্যান্য জিনিসপত্র এবং হাইকোর্ট প্রশাসনের পরিবর্তে কেন চাবিগুলো একজন আইনজীবীর কাছে ছিল, সেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।।
