বাংলা ভাগ কোনো একক নেতার সিদ্ধান্ত বা কংগ্রেস-লিগের ষড়যন্ত্রের ফল নয়। এটি ছিল দল-নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের সম্মিলিত চাপ ও ভয়ের ফলাফল। আর আজকের দিনে সেই ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষা না নেওয়াটা ইতিহাসচর্চার একটা বড় স্ববিরোধ।
১৯৪৭-এর মার্চে কী ঘটেছিল? ১৯৪৭ সালের ১৯ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভোটাভুটি হয়। ভোটাভুটির কারণ ছিল: “অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্গত থাকবে কিনা”। হিন্দু সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে রায় দিল তারা বাংলাভাগ চায়। এই ভোটের ফলাফলে যে যৌথ মননের প্রতিফলন ছিল তা ছিল “দল-নির্বিশেষে হিন্দু মধ্যবিত্তের রায়”। কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, ফরওয়ার্ড ব্লক– সব দলের হিন্দু বিধায়ক একমত ছিলেন।
বাংলা ভাগের পেছনে আসল শক্তি ছড়িয়ে ছিল তিনটি স্তরে:
প্রথমত, সামাজিক ভিত্তি– হিন্দু মধ্যবিত্ত:
১৯৪৬-এর “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” ও নোয়াখালি -কলকাতা দাঙ্গার পর পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্ত– শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, ছাত্র– আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের ধারণা হয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিভক্ত বাংলায় হিন্দুদের চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি সবই বিপন্ন হবে। তাই তারা “নিরাপদ পশ্চিমবঙ্গ” চায়। এই চাপটাই ছিল আসল।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক মুখপাত্র– শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়:
শ্যামাপ্রসাদ এই সামাজিক দাবিকে ভাষা দেন ও আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেন। শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু সেই ভূমিকা আন্দোলনের একমাত্র নির্ধারক ছিল না, ছিল এক বড় মুখপাত্রের ভূমিকা। তিনি দাবি তৈরি করেননি, দাবিকে সংগঠিত করেছেন।
তৃতীয়ত, জাতীয় নেতৃত্ব– কংগ্রেস:
কংগ্রেসের মধ্যেও মতভেদ ছিল। গান্ধী, নেহেরু অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু বাংলার কংগ্রেস নেতারা এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কংগ্রেসও হিন্দু মধ্যবিত্তের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে।
আমরা ইতিহাসকে শুধু “কে ভিলেন, কে নায়ক” দিয়ে দেখি। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো: কোন সামাজিক শক্তি কোন অগ্রাধিকার ঠিক করল?
১৯৪৭-এ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্তের অগ্রাধিকার ছিল “নিরাপত্তা ও আধিপত্য”। সেই অগ্রাধিকার থেকেই বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত এসেছে। শ্যামাপ্রসাদ বা জিন্নাহ শুধু সেই অগ্রাধিকারের প্রতিনিধি ছিলেন।
স্মর্তব্য যে, এখানে ইতিহাস শিক্ষার দুটো বিড়ম্বনা
আছে–
প্রথমত, ইতিহাসের সরলীকরণ: আমরা বলি “শ্যামাপ্রসাদ বাংলা ভাগ করেছে” বা “কংগ্রেস ভাগ করেছে”। কিন্তু আসলে এর পেছনে ছিল একটি গোটা সমাজের ভয় ও আকাঙ্ক্ষা। সেই জটিলতাকে আমরা বুঝতে চাই না।
দ্বিতীয়, বর্তমানের জন্য শিক্ষা না নেওয়া: ১৯৪৭-এ ধর্ম ও পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ঠিক হয়েছিল। আজও রাজনীতিতে “স্মৃতি ও পরিচয়ের রাজনীতি” প্রবল। কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে “সামর্থ্য ও প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি” -র দিকে যাচ্ছি না। তাই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বাংলা ভাগ হয়েছিল কারণ ১৯৪৭-এ পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজ মনে করেছিল অবিভক্ত বাংলায় তাদের ভবিষ্যৎ নেই। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন সেই অনুভূতির সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠ। কিন্তু আসল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সমাজ।
ইতিহাসের কাজ শুধু দোষারোপ করা নয়। ইতিহাসের কাজ হলো বোঝা – “কোন পরিস্থিতিতে সমাজ কোন অগ্রাধিকার বেছে নেয়”। সেই বোধ না থাকলে ইতিহাস পড়া বৃথা।।
★ লেখক : শঙ্খ বারিক, পাঁচলা মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক
