প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১৪ আগস্ট : বাংলায় সরকার বদল ঘটলেও ঘটেনি “মাদ্রাসা“ নিয়ে সন্দেহের বদল। এবার নতুন বিজেপি সরকারও মাদ্রাসা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। শুরু হয়েছে রাজ্যের মাদ্রাসাগুলি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ খবর নেওয়া। এত সব সত্ত্বেও হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে আছে পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা। ’সরস্বতী’ পুজো বা ’নবি’ দিবস পালন থেকে দূরে থাকা এখানকার শিক্ষকরা অর্ধ শতাব্দী কাল ধরে পড়ুয়াদের দিয়ে চলেছেন “উদারবাদী“ আধুনিক শিক্ষার পাঠ। এমনকি প্রতিদিন প্রার্থনা লাইনে দাঁড়িয়ে এই মাদ্রাসার পড়ুয়া ও শিক্ষকরা ’জনগনমন’ ও রাষ্ট্রগীত ’বন্দেমাতরম’ গানও গান। আগামী কাল ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবস পালনে ব্রতি হবে এই মাদ্রাসার পড়ুয়া ও শিক্ষকরা ।
অনেকেই মনে করেন ’মাদ্রাসা’ হল খুবই রক্ষণশীল উগ্র ধর্মীয় অনুশাসনের ঘেরাটোপে বন্দি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসবের ছোঁয়াই যেন লাগেনি ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসায়।বরং পঠন পাঠনে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলে এই মাদ্রাসা অ-মুসলিম পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মন জয় করে নিয়েছে।
কি করে এমন ’স্বতন্ত্র পরিচয়’ গড়ে তোলা সম্ভব হল? তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শেখ আব্দুল হালিম।তিনি বলেন,আমাদের মাদ্রাসাতে ধর্ম,বর্ণ,জাতি বা রাজনীতির কোনও প্রবেশাধিকার নেই। এমনকি ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কার কিংবা প্রাচীন মনস্কতারও কোন জায়গা নেই। এখানে ’উদারবাদী আধুনিক শিক্ষাই আসল শক্তি,নিয়মানুবর্তিতাই আসল অনুশাসন।এই সবের দৌলতেই ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা হিন্দু ও মুসলিম পড়ুয়াদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বলে আব্দুল হালিম জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের কথায় জানা গিয়েছে,১৯৭৫ সালে ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এই মাদ্রাসার মাধ্যমিক স্তর ’মাদ্রাসা বোর্ডের’ অধীন।আর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরটি পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অধীনে বর্তমানে এই মাদ্রাসার পড়ুয়া সংখ্যা ১১০০-এর কাছাকাছি। শিক্ষক ও শিক্ষিকা মিলিয়ে ৪২ জন ওই পড়ুয়াদের পাঠ দান করেন।প্রধান শিক্ষক শেখ আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ হচ্ছে মুসলিম। আর তপশিলি জাতি, উপজাতি এবং সাধারণ জাতি মিলিয়ে হিন্দু ছাত্র -ছাত্রী রয়েছে ৫৫ শতাংশ।একই ভাবে হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষক এবং শিক্ষিকার অনুপাতও প্রায় সমান সমান।
রেজাল্ট থেকে শুরু করে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চা সবেতেই তাক লাগানো সাফল্য রয়েছে ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসার।এখানে উন্নত ল্যাব ছাড়াও রয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম এবং অত্যাধুনিক জিম।এছাড়াও ছাত্র ছাত্রীদের জন্য আলাদা হোস্টেলও রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মানুবর্তিতা রক্ষাতেও এই মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ বদ্ধপরিকর।এই প্রসঙ্গে ওড়গ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসার শিক্ষক সুপ্রভাত দে বলেন,’আমাদের মাদ্রাসায় আরবি ও সংস্কৃতর পাশাপাশি গণিত,ইংরেজি এবং বিজ্ঞানের পাঠ দানও চলে স্বাভাবিক নিয়মে।আমরা মাদ্রাসার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকারা চাই ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা যেন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে,যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে।সেটা আমরা যে করতে পেরেছি তার বড় প্রমাণ হল আমাদের মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল।এসবের জন্যই হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অভিভাবকরা ভরসা করে তাঁদের বাড়ির ছেলে মেয়েদের আমাদের মাদ্রাসায় পড়তে পাঠান।
ওরগ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা নিয়ে গর্বের শেষ নেই এখানকার দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র প্রিয়ব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং মীর মেহেবুব হোসেনের।তাঁরা জানান,ওরগ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসা থেকে পাওয়া শিক্ষায় তাঁরা বড় মনের মানুষ হতে শিখেছে । অন্যদিকে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী সোহানা পারভিন এবং নবম শ্রেণীর ছাত্রী সুনিতা টুডু গর্বের সঙ্গে বলেন,ধর্মীয় গোঁড়ামি হিন্দু- মুসলিম,এইসব ছেড়ে ওরগ্রাম চতুষ্পল্লি হাই মাদ্রাসা আমাদের শুধুই শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছে।সেই কারণেই ’অনন্য’ আমাদের মাদ্রাসা।
ভাতারের বিজেপি বিধায়ক সৌমেন কার্ফা সব শুনে বলেন,’যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃত পড়ানো হবে,প্রার্থনায় রাষ্ট্রগীত ’বন্দেমাতরম’ গাওয়া হবে এবং দেশের সংবিধানকে মান্যতা দেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হবে,সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার এবং আমাদের সরকারের সহযোগীতা থাকবে ।’।
