সত্তরের দশকে (বিশেষ করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়) বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে আসা মোট শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি । যার মধ্যে প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ভারত সরকারের “বাংলাদেশ ডকুমেন্টস” অনুযায়ী ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ভারতে নিবন্ধিত মোট ৭৫.৫৬ লাখ শরণার্থীর মধ্যে ৬৯.৭১ লাখই ছিলেন হিন্দু (যা মোট শরণার্থীর প্রায় ৯২%)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির রিপোর্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল হিন্দু সম্প্রদায়। ফলে মোট ১ কোটি শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ হিন্দু শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন । (সূত্র : উইকিপিডিয়া)
রাতারাতি বাড়িঘর-ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসা প্রতিটি পরিবারের নেপথ্যে ছিল এক একটা করে করুণ কাহিনী । যেকাহিনী অধিকাংশ মানুষের অজানা৷ কেবল সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির ভুক্তভোগী জীবিত সদস্যরা সেই সমস্ত মর্মস্পর্শী স্মৃতি নিজের নিজের হৃদয়ে আজও বহন করে চলেছেন । এমনই এক পরিবারের করুণ কাহিনীর চিত্র ফুটে উঠেছে মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশি জাহিদ হোসেনের লেখনীতে ৷ তিনি তার হিন্দু বাল্যবন্ধুর পরিবারের হঠাৎ দেশান্তরী হওয়ার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় (লিঙ্ক : https://www. facebook.com/share/p/1CEtEikTb1/) ৷ জাহিদ হোসেনের সেই বর্ণনাটি নিচে তুলে ধরা হল :
পূজা এলে আমার অনেক কথা, অনেকের কথা, মনে পড়ে। আজ উত্তমের কথা মনে পড়ছে। ক্লাস ফোরে পড়ি, উত্তম পড়ে আমার সাথেই। থাকি এক পাড়াতে। আমাদের স্কুলে তখন সরস্বতী পূজা হতো। আমার দৃঢ় ধারণা ছিলো – উত্তমের মা’ই সরস্বতী। কারণ স্কুলের প্রতিমার সাথে তার চেহারার মিল ছিলো। তিনি ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী।
স্কুলে যাওয়ার পথেই ওঁদের বাড়ি। প্রতিদিন আমার জন্যে উত্তম সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আমরা দুই বন্ধু শিবু কাকার হোটেলে পাশের গলি দিয়ে বের হয়ে চারতলার মোড় ঘুরে সোজা স্কুলে চলে যাই।
এক সকালে উত্তমকে ডাকতে গিয়ে দেখি ওদের বাড়িতে কেউ নেই। সদর দরজা খোলা। উঠোনে কয়েকটা মুরগি চরে বেড়াচ্ছে। কলতলায় কয়েকটা বাসনপত্র পড়ে আছে, একটা উল্টো বালতির উপর বসে আছে একটা একাকী শালিক। সেই আমার জীবনের প্রথম শুন্যতার অনুভূতি। সেই আমার প্রথম মন খারাপ। পরের দিনেও উত্তমকে আর পাই না। তারপরেও আর পাই না। সময়টা মনে আছে, ১৯৭৬ সালের শেষভাগ। এরপর উত্তমের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বছর চল্লিশেক পর কার কাছে যেন শুনলাম, উত্তম রানাঘাটে থাকে। সেবার কোলকাতায় গিয়ে, এক ভোরে, শিয়ালদা স্টেশন থেকে চেপে বসলাম ট্রেনে। রানাঘাটে নেমে রেলগেটের ধারে এক হোটেলে কাঁঠাল পাতার ঠোঙ্গায় পেট পুরে লুচি তরকারি খেয়ে নিলাম। কতক্ষণ হাঁটতে হয়, গিয়ে কী অবস্থা হয়, তা তো আর জানি নে। এরপর লোকের কাছে শুনতে শুনতে হাঁটতে শুরু করলাম উত্তমদের বাড়ি। পেয়েও গেলাম।
দেখলাম, আমার সেই ‘সরস্বতী’ কাকিমা আজ বৃদ্ধা। কাকার চোখের জলে ‘দেশের’ জন্য এখনো আহাজারি। বললেন, “নিরাপত্তার জন্যে চলে এলাম বাবা, নিরাপত্তা তো পেলাম, শান্তি তো পেলাম না। গাছে একটা পাখি দেখলেও মনে হয় আমার বাংলাদেশের গ্রামের বাড়ির পাখি!”
উত্তমের চেহারায় বয়স। উত্তমের ছেলে বুঝতেই পারছে না আমি কে। আমার নামে কোনো আত্মীয়ের নাম শোনেনি; তবু আমাকে নিয়ে কেনো বাড়িময় এতো হৈচৈ ?
আর আমার ফেলে আসা শৈশব, আমার লালিত স্মৃতি, দুই দেশের রাজনীতি …আমাকে প্রায় পুরোটা সময় সেদিন স্তব্ধ করে রেখেছিল। সবকিছু ছাপিয়ে কেবল ভেবেছি, কত কষ্টে, অপমানে আর অসহায়ত্বে মানুষ নিজের বানানো ঘর, নিকোনো উঠোন, লাগানো গাছ ছেড়ে চলে যায়, আমরা কখনও তা বুঝতে পারব না। আমরা অপরাধী হয়ে থাকবো উত্তমদের কাছে; নিরীহ সুবল কাকাদের কাছে আর সেই সব প্রতিমার মতো সুন্দর সরস্বতী-লক্ষ্মী কাকিমাদের কাছে। তিনি তার বন্ধুর বাংলাদেশের বাড়ির ঠিকানা না দিলেও সপরিবারে বন্ধুর সদ্য তোলা ছবি শেয়ার করেছেন ।
প্রসঙ্গত,বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাঙালি হিন্দু গনহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং রাজাকার মিলিশিয়ারা । এটি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ শুরু হয়েছিল, যখন পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমানে পাকিস্তান ) পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমানে বাংলাদেশ ) বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীকে সামরিকভাবে দমন করার জন্য ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালু করে । পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান একটি বড় আকারের সামরিক মোতায়েনের অনুমোদন দেন এবং পাকিস্তানি সৈন্য এবং স্থানীয় পাকিস্তানপন্থী মিলিশিয়ারা ৩,০০,০০০ থেকে ৩০,০০,০০০ বাঙালি কে হত্যা করে এবং ২,০০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করে । যার সিংহভাগই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের । এটি ছিল গণহত্যা এবং গণহত্যামূলক যৌন হিংসার একটি পরিকল্পিত অভিযান । গণহত্যার তদন্তে, জেনেভা -ভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইনবিদ কমিশন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে পাকিস্তানের এই অভিযানে দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে নির্মূল বা জোরপূর্বক অপসারণের চেষ্টা অন্তর্ভুক্ত ছিল । (সূত্র : উইকিপিডিয়া) ।।

