নারায়ণীয়ং (Narayaneeyam) এর ৩২তম দশকে পরম ভক্ত রাজা অম্বরীষের চরিত্র এবং তাঁর ভক্তি মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে। এই দশকে দেখানো হয়েছে কীভাবে ভগবান তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তকে রক্ষা করার জন্য নিজের সুদর্শন চক্রকে নিযুক্ত করেন এবং স্বয়ং দুর্বাসা মুনির ক্রোধ থেকেও ভক্তকে রক্ষা করেন।
নারায়ণীয়ং দশক ৩২ – অম্বরীষ চরিতম্
বৈবস্বতাখ্যমনুপুত্রনভাগজাত-
নাভাগনামকনরেংদ্রসুতোঽংবরীষঃ ।
সপ্তার্ণবাবৃতমহীদয়িতোঽপি রেমে
ত্বত্সংগিষু ত্বয়ি চ মগ্নমনাস্ সদৈব ॥১॥
ত্বত্প্রীতয়ে সকলমেব বিতন্বতোঽস্য
ভক্ত্য়ৈব দেব নচিরাদভৃথাঃ প্রসাদম্ ।
যেনাস্য যাচনমৃতেঽপ্যভিরক্ষণার্থং
চক্রং ভবান্ প্রবিততার সহস্রধারম্ ॥২॥
স দ্বাদশীব্রতমথো ভবদর্চনার্থং
বর্ষং দধৌ মধুবনে যমুনোপকংঠে ।
পত্ন্যা সমং সুমনসা মহতীং বিতন্বন্
পূজাং দ্বিজেষু বিসৃজন্ পশুষষ্টিকোটিম্ ॥৩॥
তত্রাথ পারণদিনে ভবদর্চনাংতে
দুর্বাসসাঽস্য মুনিনা ভবনং প্রপেদে ।
ভোক্তুং বৃতশ্চস নৃপেণ পরার্তিশীলো
মংদং জগাম যমুনাং নিযমান্বিধাস্যন্ ॥৪॥
রাজ্ঞাঽথ পারণমুহূর্তসমাপ্তিখেদা-
দ্বারৈব পারণমকারি ভবত্পরেণ ।
প্রাপ্তো মুনিস্তদথ দিব্যদৃশা বিজানন্
ক্ষিপ্যন্ ক্রুধোদ্ধৃতজটো বিততান কৃত্য়াম্ ॥৫॥
কৃত্যাং চ তামসিধরাং ভুবনং দহংতী-
মগ্রেঽভিবীক্ষ্যনৃপতির্ন পদাচ্চকংপে ।
ত্বদ্ভক্তবাধমভিবীক্ষ্য় সুদর্শনং তে
কৃত্যানলং শলভযন্ মুনিমন্বধাবীত্ ॥৬॥
ধাবন্নশেষভুবনেষু ভিয়া স পশ্যন্
বিশ্বত্র চক্রমপি তে গতবান্ বিরিংচম্ ।
কঃ কালচক্রমতিলংঘযতীত্যপাস্তঃ
শর্বং যয়ৌ স চ ভবংতমবংদতৈব ॥৭॥
ভূয়ো ভবন্নিলযমেত্য মুনিং নমংতং
প্রোচে ভবানহমৃষে ননু ভক্তদাসঃ ।
জ্ঞানং তপশ্চ বিনয়ান্বিতমেব মান্যং
যাহ্য়ংবরীষপদমেব ভজেতি ভূমন্ ॥৮॥
তাবত্সমেত্য মুনিনা স গৃহীতপাদো
রাজাঽপসৃত্য ভবদস্ত্রমসাবনৌষীত্ ।
চক্রে গতে মুনিরদাদখিলাশিষোঽস্মৈ
ত্বদ্ভক্তিমাগসি কৃতেঽপি কৃপাং চ শংসন্ ॥৯॥
রাজা প্রতীক্ষ্য মুনিমেকসমামনাশ্বান্
সংভোজ্য সাধু তমৃষিং বিসৃজন্ প্রসন্নম্ ।
ভুক্ত্বা স্বয়ং ত্বয়ি ততোঽপি দৃঢং রতোঽভূ-
ত্সায়ুজ্যমাপ চ স মাং পবনেশ পায়াঃ ॥১০॥
এই দশকের মূল শ্লোকগুলির সরল বাংলা ভাবার্থ
রাজা অম্বরীষের অনন্য ভক্তি (শ্লোক ১ – ৩)
রাজা অম্বরীষ ছিলেন এক মহান চক্রবর্তী সম্রাট, কিন্তু তাঁর মন সর্বদা শ্রীহরির পাদপদ্মে অর্পিত ছিল। তিনি তাঁর সমস্ত রাজকীয় ঐশ্বর্যকে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর বাণী ছিল ভগবানের গুণগানে মগ্ন, কান ছিল ভগবৎ কথা শ্রবণে ব্যাকুল, এবং হাত ছিল মন্দিরের মার্জনা ও সেবায় ব্যস্ত। তিনি রাজ্য পরিচালনা করলেও তাতে সম্পূর্ণ অনাসক্ত ছিলেন।
দ্বাদশী ব্রত পালন ও দুর্বাসা মুনির আগমন (শ্লোক ৪ – ৫)
একদা রাজা অম্বরীষ তাঁর রাণীসহ এক বছরব্যাপী ‘দ্বাদশী ব্রত’ (একাদশী উপবাসের পর দ্বাদশীতে পারণ) অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করছিলেন। ব্রতের শেষ দিনে, যখন তিনি পারণ (উপবাস ভঙ্গ) করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন পরম তেজস্বী কিন্তু অত্যন্ত ক্রোধপ্রবণ মহর্ষি দুর্বাসা তাঁর অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। রাজা তাঁকে সসম্মানে অভ্যর্থনা জানান এবং ভোজনের আমন্ত্রণ করেন। মহর্ষি দুর্বাসা যমুনা নদীতে স্নান ও আহ্নিক কৃত্য করার জন্য যাত্রা করেন।
পারণের সময় সংকট (শ্লোক ৬)
নদীতে স্নান ও ধ্যান করতে করতে দুর্বাসা মুনির অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। এদিকে দ্বাদশী তিথির সময়কাল সমাপ্ত হওয়ার আর মাত্র অল্প কিছুক্ষণ বাকি ছিল। দ্বাদশী তিথি পার হয়ে গেলে ব্রত নিষ্ফল হয়ে যায়, আবার অতিথিকে না খাইয়ে ভোজন করলে অতিথি -অপমান তথা শাস্ত্র লঙ্ঘন হয়। এই উভয়সংকটে পড়ে ব্রাহ্মণদের পরামর্শে রাজা অম্বরীষ কেবল সামান্য পবিত্র তুলসী জল পান করে ব্রতের পারণ সম্পন্ন করেন।
দুর্বাসা মুনির ক্রোধ ও কৃত্য উৎপাদন (শ্লোক ৭ – ৮)
স্নান শেষ করে ফিরে এসে যোগবলে দুর্বাসা মুনি জানতে পারেন যে রাজা তাঁর আগেই জল গ্রহণ করেছেন। একে নিজের ঘোর অপমান মনে করে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে তিনি তাঁর জটা থেকে একটি চুল ছিঁড়ে ভূমিতে আঘাত করেন, যা থেকে রাজাকে ভস্ম করার জন্য ‘কৃত্যা’ নামক এক ভয়ংকর অগ্নিরূপী রাক্ষসী উৎপন্ন হয়। কিন্তু পরম শান্ত ভক্ত অম্বরীষ ভয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে কেবল ভগবান শ্রীহরির শরণাপন্ন হয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
সুদর্শন চক্রের আবির্ভাব ও দুর্বাসার পলায়ন (শ্লোক ৯ – ১০)
ভক্তের বিপদে ভগবান শ্রীহরি স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ভক্ত রক্ষার্থে তাঁর পরম জ্যোতির্ময় সুদর্শন চক্র প্রেরণ করলেন। সুদর্শন চক্র মুহূর্তের মধ্যে সেই রাক্ষসীকে ভস্মীভূত করে দেয় এবং তারপর ক্রোধোন্মত্ত হয়ে দুর্বাসা মুনিকে তাড়া করে। চক্রের তীব্র তেজে দগ্ধ হতে হতে প্রাণভয়ে দুর্বাসা মুনি ত্রিলোক (স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল) এবং ব্রহ্মা ও শিবের কাছে ছুটে যান। কিন্তু সকলেই বিষ্ণুর চক্রের সামনে তাঁকে রক্ষা করতে অসমর্থতা প্রকাশ করেন।
রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় ও মিলন (শ্লোক ১১)
অবশেষে দুর্বাসা মুনি বৈকুণ্ঠে শ্রীহরির চরণে পতিত হন। ভগবান বিষ্ণু তাঁকে বলেন, “আমি ভক্তের অধীন (অহং ভক্তপরাধীনো)। আমার ভক্তের কাছে অপরাধ করে কেউ পার পায় না। যদি আপনি রক্ষা পেতে চান, তবে অবিলম্বে রাজা অম্বরীষের কাছেই ফিরে যান এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।”
মুনীশ্বর দুর্বাসা পুনরায় অম্বরীষের কাছে ফিরে এসে তাঁর পায়ে পড়েন। পরম দয়ালু ভক্ত অম্বরীষ তৎক্ষণাৎ সুদর্শন চক্রের স্তুতি করে চক্রকে শান্ত করেন এবং দুর্বাসা মুনিকে রক্ষা করেন। এরপর দুর্বাসা মুনি সানন্দে রাজার আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং ভক্তের মহিমা কীর্তন করতে করতে বিদায় নেন।।

