“দম মারো দম,মিট যায়ে হম”…..গানটি ১৯৭১ সালের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ (Hare Rama Hare Krishna)-এর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আইকনিক গান । সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন,পথভ্রষ্ট কিছু তরুন তরুনী গাঁজায় সুখটান দিতে দিতে গানটি পরিবেশন করছে ৷ মেয়েদের আলুথালু পোশাক আর লম্বা লম্বা চুল ওয়ালা ছেলেরা নেশায় বুঁদ । চারিদিকে উড়ছে গাঁজার ধোঁয়া । তারই মাঝে গিটার বাজাচ্ছে আর গান গাইছে তরুন প্রজন্ম । মূলত আমেরিকার হিপি সংস্কৃতির একটা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই গানের মধ্য দিয়ে ।
কি এই হিপি সংস্কৃতি ?
হিপি সংস্কৃতি হলো ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া একটি প্রতিবাদী যুব আন্দোলন ও প্রতি-সংস্কৃতি, যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত এই আন্দোলন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর হাইট-অ্যাশবেরি জেলা এর প্রধান কেন্দ্র ছিল।
এরা ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরোধিতা, এবং সমাজের প্রচলিত বস্তুবাদ ও ভোগবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এর পরিবর্তে শান্তি, অবাধ ভালোবাসা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একসঙ্গে (সমবায়ে) বসবাসকে বেছে নিয়েছিল। পুরুষ ও নারী উভয়েই লম্বা চুল রাখত। পুরুষরা দাড়ি রাখত এবং সবাই মিলে স্যান্ডেল, পুঁতির গয়না এবং উজ্জ্বল সাইকেডেলিক (মনোচেতনা উদ্দীপক) রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরত। বেপরোয়া যুব সমাজের রক ও ফোক সংগীত ও মাদকের নেশাই ছিল তাদের প্রাণের খোরাক । ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক উডস্টক সংগীত উৎসব হিপি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অতিরিক্ত মাদকাসক্তি ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সংকটের কারণে ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে এই আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ ও হিপি সংস্কৃতির ছায়া
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত কথিত ছাত্র আন্দোলনের সময় এই হিপি সংস্কৃতির কিছুটা ছায়া লক্ষ্য করা যায় । কথিত প্রতিবাদী ছেলেমেয়েদের মুখের অশ্রাব্য ভাষা এবং বিশেষ করে মেয়েদের পোশাককে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে । স্বল্প বসনা তরুনী -কিশোরীদের বেপরোয়া আচরণ,এমনকি মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও করেছে অনেকে । যেকারণে সমাজ ও পারিবারিক অবক্ষয়ের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে ।
অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিবিদ এবং বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাউত, ‘জেন জি’ বিক্ষোভকারীদের ‘জেনারেশন গাটার’ বা ‘প্রজন্মের নর্দমা’ বলে অবিহিত করেছেন । তিনি বলেছেন,’আমাদের ৭৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর প্রয়াত মা শ্রদ্ধার যোগ্য। তথাকথিত ছাত্রদের কাছ থেকে আসা অশালীন ভাষা লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্য। বিক্ষোভকারীরা যদি ন্যূনতম শালীনতাটুকুও বজায় রাখতে না পারে, তবে তারা কী মূল্যবোধ শিখছে?ভবিষ্যতে যদি এই ব্যক্তিদের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বা আইনি পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তবে তাদের বাবা-মা কি তার খরচ বহন করতে পারবেন? তাদের নিজেদেরই সেই সামর্থ্য নেই। আমরা ষোল বছর বয়স থেকেই নিজেদের কর্মজীবন গড়ে তুলেছি। আমরা কখনোই আমাদের বাবা-মায়ের উপর বোঝা ছিলাম না। সমাজ হিসেবে, এটি আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’
সেখানেই থামেননি কঙ্গনা। সোশ্যাল মিডিয়াতেও আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বেনজির ভাবে আক্রমণ করেন তিনি। লেখেন, ‘জীবনে এক জায়গায় এত কদর্যদা দেখিনি কখনও। Gen Z আন্দোলনের যে রিল দেখছি, তাতে বমি পাচ্ছে। যেভাবে কথা বলে ওরা, যে ভাষা ব্যবহার করে…জীবনে এক ফ্রেমে এত দৃষ্টিকটু কিছু দেখিনি, এত অমার্জিত মনে হয়নি কোনও কিছুকে’।
আন্দোলনকারীদেরই নয় শুধু, তাঁদের অভিভাবকদেরও নিশানা করেন কঙ্গনা। তাঁর বক্তব্য, ‘কী বিশ্রী…এদের কারা জন্ম দিচ্ছেন? কারা বড় করছেন? ভারত বৈচিত্রে ভরা সুন্দর মানুজনের দেশ, যাঁরা মার্জিত এবং রুচিশীল। সাংস্কৃতিক পরিশীলতা ভারতের শিকড়ে প্রোথিত। তোমরা নিজেদের ককরোচ বলতে পারো, তেমন আচরণও করতে পারো। কিন্তু নিজেদের নোরামি, কদর্যতা, কুৎসিৎ আচরণের সাক্ষী করতে পারো না সকলকে। আমার তো রিলস দেখেই ভয় হচ্ছে। সেরে উঠতে হবে। ডিজিটাল ডিটক্স জরুরি’।
বিশেষ করে আন্দোলনে যোগ দেওয়া মেয়েদের নিশানা করেন কঙ্গনা। তাঁর কথায়, ‘অল্পবয়সি হিন্দু তরুণীদের আচরণ সবচেয়ে হতাশাজনক। ওরা স্বাধীনচেতা, কর্মজীবী মহিলাদের অনুকরণ করতে চায়, কিন্তু সেই স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষমতা নেই। স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী মেয়েরা সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়, মতপ্রকাশ করে। নিজেদের মতো কেরিয়ার বেছে নেয়, নিজেদের জীবনের দায়িত্ব নিজেই নেয়। মা-বাবা অথবা পরিবারের উপর নির্ভরশীল নয়। আমি এদের নর্দমা-প্রজন্ম বলি। সমাজকে কিছু দেওয়ার ক্ষমতা নেই এদের। পড়াশোনাতেও ভাল নয়। এত কুৎসিত এবং কলুষিত যে গৃহবধূও হতে পারবে না’।
শুধু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিই নয়,দিল্লি পুলিশ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পর্কেও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে দেখা গেছে ওই কথিত আন্দোলনে । এই তালিকায় ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি তথাকথিত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারও রয়েছে । ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার শ্রদ্ধা সিং, যার ইনস্টাগ্রামে ৩ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ফলোয়ার রয়েছে,’আরশোলা’দের প্রতিবাদের সময় আরপিএফ অফিসারদের নিয়ে ঠাট্টা করতে দেখা যায় তাকে৷ তবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এখন তিনি নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেছেন।
এছাড়া,যন্তর মন্তরে অংশ নিয়ে কুকথা বলা অনেক মেয়েকেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে কান্নাকাটি করতে দেখা গেছে । এমনকি,একজন তরুনীকে তার পরিবার বাড়িতে ঢুকতে পর্যন্ত দেয়নি বলে সোশ্যাল মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে । ক্ষিপ্ত তরুনী নিজের পরিবারকে “বিজেপির দালাল” পর্যন্ত আখ্যা দেয় ।
হিপি ও আরশোলাদের আন্দোলনের পটভূমি
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হিপি আর ভারতের ‘আরশোলা’দের আন্দোলনের পটভূমি পৃথক । হিপিদের আন্দোলনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু থাকলেও এটা ছিল মার্কিন যুব সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ । এখানে কোনো বিদেশী শক্তির হাত ছিল না । কিন্তু ভারতের ‘আরশোলা’দের ছাত্র আন্দোলন শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও নেপথ্যে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ! সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্যে এই ষড়যন্ত্র চালানো হয় বলে দাবি কোনো কোনো মহলের । এমনকি এই ‘আন্দোলন’কে ব্যাপক রূপ দিতে বিশাল পরিমান অর্থায়নও করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে । কোথা থেকে এই অর্থায়ন হয়েছে তা পুলিশ তদন্ত করে দেখছে৷
তবে আস্তে আস্তে প্রকাশ পাচ্ছে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সার, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বলিউড জগতেও বিপুল টাকার টোপ দিয়ে আন্দোলনের অংশ হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল । সমাজের বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করতেই বলিউডকে টানার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে । নাসিরউদ্দিন শাহ,শাবানা আজমি, হুমা কুরেশি, সাকিব সেলিম,স্বরা ভাস্কর, সোনাক্ষী সিনহা প্রভৃতি অভিনেতা অভিনেত্রীরা পাশে দাঁড়ায় । এমনকি ধর্মেন্দ্র প্রধান কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলে সোনাক্ষী সিনহাকে নাচতে পর্যন্ত দেখা যায় । এই সমস্ত শিল্পিরা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডায় চলেন বলে অভিযোগ । তবে তারা প্রত্যেকেই নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি বিরোধী বলে পরিচিত৷
তবে ভারতের ‘আরশোলা’দের আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যাই হোন না কেন,এটা ভারতীয় সমাজের অবক্ষয়কে তুলে ধরেছে৷ ৭৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি, তাঁর কুরুচিপূর্ণ ছবি প্রদর্শন,কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশকে উপহাস এবং কলকাতায় প্রকাশ্য রাজপথে দেশের জাতীয় পতাকায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে অপমানজনক আচরণ, এটা কোনো সুস্থ সংস্কৃতি বা প্রতিবাদের মাধ্যম হতে পারে না । এই চিত্র সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতার ক্রম উত্থানকে তুলে ধরে । যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক প্রমানিত হতে পারে ।।

