আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিকে আষাঢ় পূর্ণিমা বা গুরু পূর্ণিমা বলা হয়, যা শিক্ষক ও আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানোর একটি পবিত্র দিন। এই পুণ্য তিথিতে মহাভারত ও পুরাণ রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাস জন্মগ্রহণ করেন। তাই একে ব্যাস পূর্ণিমাও বলা হয়।
সনাতন ধর্মে যিনি অজ্ঞানতা দূর করে জ্ঞান আলোেকন আনেন, সেই গুরুকে ঈশ্বরের সমতুল্য মর্যাদা দিয়ে পুজো করা হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথিতেই দেবাদিদেব মহাদেব সপ্তর্ষিকে মহাজ্ঞান প্রদান করেছিলেন, যা থেকে আদিগুরু-শিষ্য পরম্পরার সূচনা হয়।
বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, বোধিজ্ঞান লাভের পর ভগবান বুদ্ধ এই দিনে তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে প্রথম উপদেশ দিয়েছিলেন। জৈন ধর্মেও মহাবীর এই দিনে তাঁর প্রধান শিষ্যকে দীক্ষা দেন।
শ্রী শ্রী গুরু প্রনাম মন্ত্র
(দ্বি-প্রহর ও সন্ধ্যাবেলায়)
ওঁ অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন-শলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।। ১।।
যিনি অজ্ঞান-অন্ধকারাচ্ছন্ন শিষ্যের চক্ষু জ্ঞানাঞ্জন-শলাকা দিয়া খুলিয়া দেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে ভক্তিভরে প্রণাম করি।১।।
মন্ত্রঃ সত্যং পূজা সত্যং সত্যং দেবো নিরঞ্জনঃ।
গুরোর্বাক্যং সদা সত্যং সত্যমেব পরং পদম্।।২।।
মন্ত্র সত্য, পূজা সত্য, দেব নিরঞ্জনও সত্য; শ্রীগুরুদেবের বাক্যও সর্ব্বদা সত্য বলিয়া জানিবে এবং সেই পরমপদও সত্য ।। ২।।
অখন্ড-মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্।
তত্পদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।৩।।
যাঁহার দ্বারা অখন্ড-মন্ডলাকার এই চরাচর বিশ্ব পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে, তাঁহার শ্রীপাদপদ্ম যিনি দর্শন করাইয়া দেন, সেই শ্রীগুরুদেবকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করি।৷ ৩।।
পিতৃমাতৃ-সুহৃদ্বন্ধু-বিদ্যা-তীর্থানি দেবতা।
ন তুল্যং গুরুণা শীঘ্রং স্পর্শয়েৎ পরমং পদম্।।৪।।
এই জগতে পিতামাতা, সুহৃৎ-বন্ধু, বিদ্যাবুদ্ধি, তীর্থসমূহ এবং দেবদেবী কেহই শ্রীগুরুদেবের সমতুল্য হইতে পারে না; যেহেতু শ্রীগুরুদেবই একমাত্র সেই পরম ব্রহ্মপদ শীঘ্র লাভ করাইয়া দিতে পারেন।৪।
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুঃ গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।৫।।
শ্রীগুরুদেবই ব্রহ্মা, গুরুই বিষ্ণু, গুরুই দেব মহেশ্বর, শ্রীগুরুই পরব্রহ্ম স্বরূপ; সেই শ্রীগুরুদেবকে পুনঃ পুনঃ ভক্তিভরে প্রণাম করি।৫।
ধ্যানমূলং গুরোমূর্ত্তিঃ পূজামূলং গুরোঃ পদম্।
মন্ত্রমূলং গুরোর্বাক্যং মোক্ষমূলং গুরোঃ কৃপা।।৬।।
শ্রীগুরুমূর্ত্তিই সর্ব্বদা ধ্যান করা কর্ত্তব্য, শ্রীগুরুদেবের শ্রীপাদপদ্মই সর্ব্বদা পূজা করা উচিত, শ্রীগুরুদেবের বাক্যই মন্ত্র-স্বরূপ এবং শ্রীগুরুকৃপাই মুক্তি বা মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায়।৬।
ব্রহ্মানন্দং পরম-সুখদং কেবলং জ্ঞানমূর্ত্তিম্।
দ্বন্দ্বাতীতং গগন-সদৃশং তত্ত্বমস্যাদি-লক্ষ্যম্।।
একং নিত্যং বিমলমচলং সর্ব্বদা সাক্ষিভূতম্।
ভাবাতীতং ত্রিগুণ-রহিতং সদ্গুরুং তং নমামি।।৭।।
যিনি ব্রহ্মানন্দ-স্বরূপ, পরম সুখদানকারী, নিলির্প্ত, জ্ঞান-মূর্ত্তি-স্বরূপ, যিনি সুখদুঃখাদি দ্বন্দ্বের অতীত, গগনসদৃশ উদার, ‘তত্ত্বমসি’ প্রভৃতি মহাবাক্যের লক্ষ্য-স্বরূপ, যিনি এক, নিত্য, বিমল, অচল, সর্ব্বদা সমস্ত কিছুর সাক্ষীস্বরূপ, ভাবাতীত ও ত্রিগুণাতীত, সেই পরব্রহ্মরূপী শ্রীশ্রীসদ্গুরুকে ঐকান্তিক ভক্তিভরে প্রণাম করি।৭।
ত্বমেব মাতা চ পিতা ত্বমেব।
ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।
ত্বমেব বিদ্যা দ্রবিণং ত্বমেব।
ত্বমেব সর্ব্বং মম দেবদেব।।৮।।
অর্থঃ হে গুরুদেব, তুমিই আমার মাতা, তুমিই আমার পিতা, তুমিই বন্ধু, তুমিই সখা। তুমিই আমার বিদ্যাবুদ্ধি, তুমিই আমার ধনৈশ্বর্য্য সবই; শুধু তাহাই নয়, হে আমার প্রাণদেবতা, তুমিই আমার জীবনের যথাসর্বস্ব।৮।।
(এইভাবে শ্রীশ্রীসদ্গুরুর শ্রীচরণে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণই প্রণাম মন্ত্রের যথার্থ অর্থ)
আষাঢ়ী পূর্ণিমা বা গুরু পূর্ণিমার বিশেষ কিছু গুরুত্ব:
★ গুরু পূর্ণিমার দিন গুরুকে প্রণাম করলে আসে কাঙ্ক্ষিত ফল, এর ফলে দেবতা ও গুরুকে নিজের আরাধ্য বলে মনে করা হয় এবং তাকে আলাদা করে পূজা করলে মেলে শুভ ফলাফল।
★ গুরু পূর্ণিমার দিন স্নান করে বিশেষ কিছু দান করলে তা খুবই শুভ ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। এর পাশাপাশি পূণ্য অর্জন করা যায় বলে জানা যায়।
★ গুরু পূর্ণিমার দিন যদি গুরুকে প্রণাম করা হয় তাহলে কেটে যেতে পারে গুরুদোষ। এর পাশাপাশি পিতৃ দোষ কাটিয়ে তোলার জন্য এই দিনটি খুবই শুভ বলে মনে করা হয়।
★চাকরি ও ক্যারিয়ারের উন্নতি সাধন করতে গুরু পূর্ণিমার দিনটি খুবই শুভ, তাই এই দিনে বিশেষ কিছু দান ধ্যান করলে আপনার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হতে পারে।
পূর্ণিমা তিথির মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে আপনার পূণ্য স্নান।
★ ব্যবসায় উন্নতি লাভের ক্ষেত্রে গুরু পূর্ণিমায় দান করা খুবই শুভ।
★ বিশ্বাস অনুসারে যে পূর্ণিমার দিনে গঙ্গাস্নান করলে অজান্তে করা সমস্ত পাপ ধুয়ে চলে যায়। তাই পূর্ণিমার দিনের বিপুল সংখ্যক ভক্তগণ গঙ্গা নদীতে পবিত্র স্নান করতে চলে যান।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রক্ষক ভগবান বিষ্ণু ও দেবী লক্ষ্মীর যথাযথভাবে পূজা করা হয় এই দিন। আষাঢ় মাসে এই পবিত্র ও শুভদিনে ভগবান সত্যনারায়ণের আরাধনা করলে ঘরে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি বজায় থাকে। পূর্ণিমা তিথিতে ও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গুরু পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণের ব্রত কথা পাঠ:
গুরু পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ব্রতকথা পাঠের রীতি প্রচলিত রয়েছে। এই ব্রত কথা পাঠ করলে অথবা শ্রবণ করলে মনের সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায় এর ফলে পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
পৌরাণিক ধারণা অনুযায়ী বেদব্যাসকে বিষ্ণুর অংশ বলে মনে করা হয় তাই গুরু পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ পূজো ও ব্রতকথা পাঠ করা খুবই পবিত্র। বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী পূর্ণিমা তিথিতে বিষ্ণুর পুজো করা সর্বশ্রেষ্ঠ।
এর পাশাপাশি যদি কোন ভক্ত পরিবারের অর্থের অভাব মেটাতে চান বা ব্যবসায় সাফল্য লাভ করতে চান, তাহলে পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ ব্রতকথা শ্রবণ করুন।
অন্যান্য উপাচার:
★কোন কারণে যদি সত্যনারায়ণ ব্রতকথা পাঠ করতে না পারেন তাহলে নিয়ম মেনে বিষ্ণুর পূজা করুন।
★ বিষ্ণুর পূজায় তুলসী, ধূপ, প্রদীপ, গন্ধ পুষ্প ও হলুদ ফল নিবেদন করতে হয়।
★ এরপর শ্রী হরি কে স্মরণ করে প্রার্থনা করুন বিভিন্ন ধরনের ভোগ নিবেদন করার মাধ্যমে।
★ এরপর সেই নৈবেদ্য সকলের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করুন।
ব্যাস পূর্ণিমা ও সহাবস্থানের বার্তা
আষাঢ় পূর্ণিমা বা গুরু পূর্ণিমা মহর্ষি বেদ ব্যাসের পবিত্র স্মৃতিকে স্মরণ করে। তিনি সমগ্র মানবজাতিকে চিন্তা ও আচরণের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পথ দেখিয়েছিলেন। সহাবস্থানই সংস্কৃতি: সৃষ্টিকে জয় করা একটি বিকৃতি; বরং, প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য ও সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করাই মানুষের প্রকৃত কর্তব্য।
ত্যাগ ও উৎসর্গ: দানই সংস্কৃতি, এবং সবকিছু সমর্পণ করাই ভারতীয় সংস্কৃতির মূল।এই গুরু পূর্ণিমায়, আসুন আমরা প্রকৃতি সংরক্ষণের এবং আমাদের জীবনে সকলের কল্যাণে কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করি।।
