শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের মূল ও সারমর্ম হলো চতুঃশ্লোকী ভাগবত, যা দ্বিতীয় স্কন্ধের নবম অধ্যায়ের ৩২ থেকে ৩৫ নম্বর শ্লোকে (মতান্তরে ৩৩ থেকে ৩৬) বর্ণিত হয়েছে। সৃষ্টির পূর্বে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এই চারটি শ্লোকে সমগ্র ভাগবতের জ্ঞান প্রদান করেছিলেন।এই চারটি শ্লোক সমগ্র ভাগবত ও হিন্দু দর্শনের মূল ভিত্তিস্বরূপ ।
শ্লোক ১ :
অহমেবাসমেবাগ্রে নান্যদ্যৎ সদসৎ পরম্।
পশ্চাদহং যদেতচ্চ যোঽবশিষ্যতে সোঽস্ম্যহম্।। (২.৯.৩৩)
অর্থ: সৃষ্টির পূর্বে কেবল একমাত্র আমিই ছিলাম, স্থূল, সূক্ষ্ম বা কারণ—এমন কোনো বস্তু ছিল না। সৃষ্টির পরেও আমিই আছি এবং প্রলয়ের পর যখন সব ধ্বংস হয়ে যায়, তখনও আমিই অবশিষ্ট থাকি।
শ্লোক ২ (ঋতেঽৰ্থং যৎ প্রতীয়েত…)
শ্লোক ২ :
ঋতেঽৰ্থং যৎ প্রতীয়েত ন প্রতীয়েত চাত্মনি।
তদ্বিদ্যদাৎস্নো মায়াং যথাভাবো যথা তমঃ।। (২.৯.৩৪)
অর্থ: যে সত্য বা সত্তা ছাড়া অন্য কোনো বস্তু সত্য বলে মনে হয়, কিন্তু আত্মজ্ঞানে যার কোনো অস্তিত্ব নেই—তাকেই আমার মায়া বলে জানবে। যেমন আলো ছাড়া অন্ধকার বা কোনো কিছুর ছায়া নিজে থেকে সত্য নয়, মায়াও তাই।
শ্লোক ৩ :
যথা মহান্তি ভূতানি ভূতেষুচ্চাবচেস্বনু।
প্রবিষ্টান্যপ্রবিষ্টানি তথা তেযু ন তেষ্বহম্।। (২.৯.৩৫)
অর্থ: যেমন পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) সব ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বস্তুর মধ্যে প্রবেশ করে থাকে এবং আলাদাভাবেও অবস্থান করে; তেমনি আমিও সবকিছুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে আছি এবং সবকিছুর বাইরেও অবস্থান করছি।
শ্লোক ৪ :
এতাবদেব জিজ্ঞাস্যং তত্ত্বজিজ্ঞাসুন্নাত্মনঃ।
অন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং যৎ স্যাৎ সর্ব্বত্র সর্ব্বদা।। (২.৯.৩৬)
অর্থ: আত্মা বা পরমাত্মার তত্ত্ব জানতে ইচ্ছুক ব্যক্তির সর্বদা কেবল এটুকুই অনুসন্ধান করা উচিত—যা প্রত্যক্ষ (অন্বয়) এবং পরোক্ষ (ব্যতিরেক)—সর্বত্র এবং সর্বদা অপরিবর্তিত ও সত্যরূপে বিরাজমান।
এই শ্লোকগুলোর মূল ভাব ও সারমর্ম নিচে দেওয়া হলো:
১. সৃষ্টির আদি ও অন্তে ঈশ্বর (প্রথম শ্লোক):
ভগবান বলেছেন, সৃষ্টির পূর্বে কেবল আমিই ছিলাম, তখন স্থূল, সূক্ষ্ম বা কারণস্বরূপ কিছুই ছিল না। সৃষ্টির পরেও আমিই আছি এবং প্রলয়কালে যা কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাও একমাত্র আমিই।
২. মায়ার স্বরূপ (দ্বিতীয় শ্লোক):
যা সত্য নয়, কিন্তু সত্যের মতো প্রতীয়মান হয়— যেমন শূন্যে বা জলে চন্দ্রের প্রতিবিম্ব, এবং যা সত্যের অভাবে অস্পষ্ট থাকে, সেটাই আমার মায়া।
৩. ঈশ্বরের সৰ্বব্যাপী উপস্থিতি (তৃতীয় শ্লোক):
পঞ্চভূত যেমন সমস্ত প্রাণীতে প্রবিষ্ট হয়েও আলাদা থাকে, ঠিক তেমনি আমি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি বস্তুতে প্রবেশ করে থেকেও তাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।
৪. পরম সত্যের সন্ধান (চতুর্থ শ্লোক):
আত্মতত্ত্ব বা পরম সত্যের সন্ধানকারী ব্যক্তির জন্য সর্বদা এবং সর্বত্র একটিই বিষয় জানার যোগ্য, আর তা হলো আমিই একমাত্র নিত্য সত্য।
চতুশ্লোকী ভাগবতম্
শ্রীভগবানুবাচ ।
জ্ঞানং পরমগুহ্যং মে যদ্বিজ্ঞানসমন্বিতম্ ।
সরহস্যং তদংগং চ গৃহাণ গদিতং ময়া ॥১॥
যাবানহং যথাভাবো যদ্রূপগুণকর্মকঃ ।
তথৈব তত্ত্ববিজ্ঞানমস্তু তে মদনুগ্রহাত্ ॥২॥
অহমেবাসমেবাগ্রে নান্যদ্যত্সদসত্পরম্ ।
পশ্চাদহং যদেতচ্চ যোঽবশিষ্যেত সোঽস্ম্যহম্ ॥৩॥
ঋতেঽর্থং যত্প্রতীয়েত ন প্রতীয়েত চাত্মনি ।
তদ্বিদ্যাদাত্মনো মায়াং যথাঽভাসো যথা তমঃ ॥৪॥
যথা মহাংতি ভূতানি ভূতেষূচ্চাবচেষ্বনু ।
প্রবিষ্টান্যপ্রবিষ্টানি তথা তেষু ন তেষ্বহম্ ॥৫॥
এতাবদেব জিজ্ঞাস্যং তত্ত্বজিজ্ঞাসুনাঽত্মনঃ ।
অন্বয়ব্যতিরেকাভ্যাং যত্স্যাত্সর্বত্র সর্বদা ॥৬॥
এতন্মতং সমাতিষ্ঠ পরমেণ সমাধিনা ।
ভবান্ কল্পবিকল্পেষু ন বিমুহ্যতি কর্হিচিত্ ॥৭॥
।। ইতি শ্রীমদ্ভাগবতে মহাপুরাণেঽষ্টাদশসাহস্র্য়াং
সংহিতায়াং বৈযসিক্যং দ্বিতীয়স্কন্ধে ভগবদ্ব্রহ্মসংবাদে নবমাধ্যায়াংতর্গতং চতুঃশ্লোকীভাগবতং সমাপ্তম্ ।।
ভাগবতপুরাণ . অধ্যায় ২/৯/৩০-৩৬ ।
