অন্যান্য ধর্ম অপেক্ষা হিন্দুধর্মেই শক্তিবাদ সমধিক সমৃদ্ধ। হিন্দু-তন্ত্রশাস্ত্রেই শাক্ত-দর্শন বিশদভাবে ব্যাখ্যাত এবং চণ্ডীতে ইহার পূর্ণ পরিণতি দৃষ্ট হয়।সমগ্র তন্ত্রশাস্ত্রের সার চণ্ডীর মধ্যে নিহিত। সেইহেতু শাক্ত-গ্রন্থসমূহের মধ্যে চণ্ডী এত সারবতী ও সমাদৃতা। গীতার ন্যায় ইহা হিন্দুর নিত্যপাঠ্য। চণ্ডীপাঠ দেবীপূজার প্রধান অঙ্গ। মহাভারতের একান্নটি দেবীপীঠস্থানে বা শক্তিসাধনার কেন্দ্রে চণ্ডী নিয়মিতভাবে পঠিত হয়। কুলার্ণবতন্ত্রমতে তান্ত্রিক সাধনাই প্রশস্ত। মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুকভট্ট তন্ত্রশাস্ত্রকে শ্রুতি বা বেদ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন, “বৈদেকী তান্ত্রিকী চৈব দ্বিবিধা কীর্তিতা শ্রুতিঃ।” অর্থাৎ শ্রুতি দুই প্রকার-বৈদিকী ও তান্ত্রিকী। একদা সমগ্র ভারত তান্ত্রিক সাধনায় প্লাবিত হইয়াছিল। সকল তীর্থস্থানে দেবীপূজা হইয়া থাকে।
কিন্তু শ্রীশ্রী চণ্ডীর আরাধনার উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছিল ?
এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে । কারো কারোর মতে শ্রীচণ্ডী নর্মদা অঞ্চলে বা উজ্জয়িনীতে উৎপন্ন । কিন্তু অধ্যাপক দক্ষিণারঞ্জন শাস্ত্রী ঐতিহাসিক যুক্তি দ্বারা উক্ত মত খন্ডন করে প্রমান করেছেন যে,সম্ভবতঃ বাংলাদেশেই চণ্ডীর জন্মস্থান। ভারতবর্ষে প্রচলিত গৌড়ীয়, কেরলীয়, কাশ্মীরি ও বিলাসী- -এই চারি প্রকার তন্ত্রসম্প্রদায়ের মধ্যে গৌড়ীয় মতের প্রাচীনতা ও প্রাধান্য সর্বাপেক্ষা অধিক। পাল রাজাদের সময় বাংলায় তন্ত্রের বিপুল প্রভাব ছিল। একটি তন্ত্রে আছে-‘গৌড়ে প্রকাশিতা বিদ্যা’ অর্থাৎ গৌড়ে (বঙ্গদেশে) তন্ত্রবিদ্যার উদ্ভব হয়। বরদাতন্ত্রের ১০ম পটলে বাংলা অক্ষরের বর্ণনা আছে। আবার অধিকসংখ্যক প্রাচীন পীঠস্থানগুলি বঙ্গভূমিতেই অবস্থিত।
বাংলার অধিকাংশ ভূভাগ দীর্ঘকালের জন্য জঙ্গলপূর্ণ ছিল। এই সকল জঙ্গলের আদিম অধিবাসিগণকে ‘কিরাত’ বা ‘শবর’ বলিত। ‘কাদম্বরী’, ‘হরিবংশ’, ‘দশকুমার-চরিত’, ‘ভবিষ্যোত্তরপুরাণ’, ‘কালিকাপুরাণ’ প্রভৃতি গ্রন্থের অভিমত এই যে, চণ্ডী-বর্ণিত দেবতা কিরাত ও শবরগণেরই উপাস্যা দেবী ছিলেন। সুতরাং কিরাত-দেশেই অর্থাৎ বাংলাদেশেই চণ্ডীর আবির্ভাব বলিয়া মনে হয়। পুরাণের অংশ হইলেও চণ্ডী তন্ত্রশাস্ত্ররূপে গৃহীত।
যখন প্রধান প্রধান সকল তন্ত্রই বাংলায় উৎপন্ন, তখন চণ্ডীও সম্ভবতঃ বাংলায়ই উদ্ভূত। বাংলার পূর্ব সীমান্তে চট্টল শহর হইতে দশ বারো মাইল দূরে করালডাঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত মেধসাশ্রম কী চণ্ডীতে উক্ত মেধা মুনির আশ্রম? উপরিউক্ত মতের অনুকূল আর একটি বলবতী যুক্তি দেওয়া যাইতে পারে। চণ্ডীর ত্রয়োদশ অধ্যায়ে দশম শ্লোকে আছে-সুরথ ও সমাধি মহামায়ার ‘মহীময়ী’ মূর্তি নির্মাণ করিয়া পূজা করিয়াছিলেন। মৎস্যপুরাণে দুর্গামূর্তি-নির্মাণের ব্যবস্থা আছে। মহীময়ী মূর্তি বাংলাদেশে প্রচলিত মৃন্ময়ী প্রতিমা ব্যতীত অন্য কিছু নহে। বাংলাদেশ ব্যতীত ভারতের অন্য কোনো প্রদেশে মৃন্ময়ী প্রতিমায় দুর্গাপূজার প্রচলন নাই। অন্যান্য প্রদেশে ধাতু, কাষ্ঠ বা প্রস্তর দ্বারা নির্মিত মূর্তিপূজাই সমধিক প্রচলিত।
অধ্যাপক অশোকনাথ শাস্ত্রীর মতে বাংলাদেশে প্রতিমায় দুর্গাপূজা অন্ততঃ এক সহস্র বৎসরের অধিক প্রাচীন। জনসাধারণের বিশ্বাস, প্রতিমায় দুর্গাপূজা নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দ্বারাই আরম্ভ হয়। কিন্তু এই প্রবাদ ভিত্তিহীন।
আলীবর্দী খাঁ এবং তদ্দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলার সমসাময়িক ছিলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। অথচ বাংলার উক্ত নবাবদ্বয়ে শাসনকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ বলিয়া ঐতিহাসিকগণ কর্তৃক নির্দিষ্ট। শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক বিখ্যাত বাঙ্গালি স্মৃতিনিবন্ধকার রঘুনন্দন পঞ্চদশ শতকে আবির্ভূত হন। রঘুনন্দনের (১৫০০-১৫৭৫ খ্রিঃ) ‘তিথিতত্ত্ব’ গ্রন্থে ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’ নামক একটি প্রকরণ আছে এবং তাঁহার ‘দুর্গাপূজাতত্ত্ব’ নামক মৌলিক গ্রন্থে দুর্গাপূজার সম্পূর্ণ বিধি প্রদত্ত। রঘুনন্দন নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, তিনি পূর্বতন পণ্ডিত ও প্রবাদসমূহ হইতে তাঁহার গ্রন্থদ্বয়ের অনেক উপাদান সংগ্রহ করিয়াছিলেন। তিনি কালিকাপুরাণ, বৃহন্নন্দিকেশ্বরপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণ হইতেও বহু বাক্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। তৎপরবর্তী নিবন্ধকার রামকৃষ্ণ-রচিত নিবন্ধের নাম ‘দুর্গার্চনকৌমুদী’।
মিথিলার প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত বাচস্পতি মিশ্র (১৪২৫-১৪৮০ খ্রিঃ) তাঁহার ‘ক্রিয়া-চিন্তামণি’ এবং ‘বাসন্তী-পূজাপ্রকরণ’ গ্রন্থদ্বয়ে দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমায় পূজাপদ্ধতি বিবৃত করিয়াছেন। বাচস্পতি, রঘুনন্দনের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। বিখ্যাত বৈষ্ণবকবি বিদ্যাপতি (১৩৭৫-১৪৫০ খ্রিঃ) তাঁহার ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী’ গ্রন্থে ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে মৃন্ময়ী দেবীর পূজাপদ্ধতি বর্ণনা করিয়াছেন। যদিও উক্ত গ্রন্থ এখন পাওয়া যায় না, তথাপি তৎপ্রদত্ত পূজাপদ্ধতি বর্তমানে বহু শাক্ত-পরিবারে চলিয়া আসিতেছে। রঘুনন্দনের গুরু শ্রীনাথের ‘দুর্গোৎসব-বিবেক’ গ্রন্থে উক্ত পদ্ধতির আলোচনা পাওয়া যায়। শূলপাণির (১৩৭৫-১৪৬০ খ্রিঃ) “দুর্গোৎসব-বিবেক’ ও ‘বাসন্তীবিবেক’ এবং ‘দুর্গোৎসব-প্রয়োগ’ নামক তিনখানি নিবন্ধ পাওয়া যায়।
জীমূতবাহন তাঁহার ‘দুর্গোৎসবনির্ণয়’ গ্রন্থে মৃন্ময়ী দেবীপূজার কথা উল্লেখ করিয়াছেন। বাংলার এই ব্রাহ্মণপণ্ডিতদ্বয় পরস্পরের সমসাময়িক ছিলেন এবং দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে আবির্ভূত হন। শূলপাণি তাঁহার পূর্ববর্তী স্মৃতিনিবন্ধকারদ্বয় জীকন ও বালকের বাক্যাবলি উদ্ধৃত করিয়াছেন। বাংলার প্রাচীনতম স্মৃতিনিবন্ধকার ভবদেব ভট্ট তাঁহার গ্রন্থে জীকন, বালক ও শ্রীকরের বহু বাক্য উদ্ধৃত করিয়াছেন। জীকন ও বালক বাংলার সেন রাজাদেরও পূর্ববর্তী ছিলেন এবং ভবদেব ভট্ট ছিলেন একাদশ শতকের রাজা হরিবর্মদেবের প্রধানমন্ত্রী। বিরারের রাজা মহারাষ্ট্রদেশীয় বর্গীসর্দার রঘুজী ভোঁসলে বাংলায় চৌথ আদায় করিতে আসিয়া কাটোয়া শহরে বঙ্গীয় প্রথামতে দুর্গাপূজা করিয়াছিলেন। উপর্যুক্ত প্রমাণসমূহ হইতে নিঃসন্দেহে প্রতীত হয় যে, প্রতিমায় দুর্গাপূজা বাংলাদেশে দশম বা একাদশ শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল।
বাংলায় শাক্ত সাধনস্রোত একদা প্রবলবেগে প্রবাহিত হইয়াছিল। বর্ধমান জেলার চান্না গ্রামে চব্বিশ-প্রহর কালীকীর্তন হইত। উক্ত গ্রামের পুরাতন শ্মশানে বিশালাক্ষীদেবী-মন্দিরের পার্শ্বে কমলাকান্তের পঞ্চমুণ্ডি আসন ছিল। বাংলার শাক্ত সাধকগণের মধ্যে হালিশহরের রামপ্রসাদ, বর্ধমানের কমলাকান্ত, নাটোরের রাজা রামকৃষ্ণ, তারাপীঠের বামাক্ষেপা, দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ, মেহারের সর্বানন্দ ঠাকুর প্রমুখের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তাদির শাক্তসঙ্গীত বাংলাভাষার অমর সম্পদ। এমন সঙ্গীত কোনো ভারতীয় ভাষায় নাই। দক্ষিণেশ্বর ও হালিশহরের পঞ্চবটীদ্বয় এবং তারাপীঠাদি সাধনস্থল বাংলাকে তীর্থে পরিণত করিয়াছে। পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণের তন্ত্রসাধন অভূতপূর্ব ও সুদূরপ্রসারী। ভৈরবী ব্রাহ্মণীর উপদেশে তিনি বিষ্ণুক্রান্তায় প্রচলিত চৌষট্টিখানা তন্ত্রের সকল সাধনায় সিদ্ধ হইয়াছিলেন ।
★ স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনুদিত ও সম্পাদিত “শ্রীশ্রী চণ্ডী” পুস্তক থেকে নেওয়া ।
