প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০৮ জুলাই : দিগন্ত বিস্তৃত শবুজ ধান খেত, মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া সঙ্কীর্ন নদী আর গাছগাছালিতে ভরা নদীর পাড়ের শান্ত ও নির্মল পরিবেশে এসে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলত এক কিশোর । প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা দেখে গুনগুনিয়ে উঠত : “নদী ভরা ঢেউ বোঝ নাতো কেউ/কেন মায়ার তরী বাও গো/ভরসা করি এ কাণ্ডারী/অবেলার বেলা পানে চাও চাও রে ।” সময়ের সাথে সাথে বয়স বাড়ে । সেই সাথে বাড়ে কিশোরের বাউল সঙ্গীতের প্রতি প্রেম । প্রকৃতি আর বাউল কখন যে হৃদয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে সেটা বুঝতেই পারেনি পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামনন্দনপুরের অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় । তার এখন একটাই লক্ষ্য পড়াশোনা করে সাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত বাউল শিল্পি হওয়া ৷
রেডিওতে গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখা
রেডিয়োয় আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত বিভিন্ন শিল্পির দেহতত্ত্ব বাউল গান বুঁদ হয়ে শুনত অভিনন্দন । শুনে শুনে রপ্ত করত গান । ক্রমে রেডিওতে গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু অভিনন্দনের । সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে সংগীতের শিক্ষক পিতা বিজন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করে অভিনন্দন। স্কুলের পঠনপাঠন চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সে তাঁর পিতার কাছে নেওয়া তালিম অনুযায়ী নিষ্ঠার সঙ্গে রেওয়াজও চালিয়ে যায়। অবশেষে তার সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে । সদ্য উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুনো অভিনন্দন আজ আকাশবাণীর লোকশিল্পী ৷ অভিনন্দনের কথা অনুযায়ী,’লোকসংগীতের সঙ্গে গ্রাম্য প্রকৃতি,গ্রামীণ এলাকার মানুষজন এবং প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে । লোকগানের সুরে ও ছন্দে প্রবাহমান কাল মাটির গন্ধ আর প্রকৃতির ছন্দ। দামোদরের নিকটে থাকা তাঁদের নন্দনপুর গ্রামটিও অনেকটা এমন ধাঁচেই গড়া ।’
জামালপুর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম গ্রামনন্দনপুরের ঠিক পাশ দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে দামোদর নদ । গাছগাছালি, নদী, অসংখ্য পুকুর মিলিয়ে আজও গ্রামটি মধ্যযুগীয় গ্রামের স্মৃতি বহন করে চলেছে । সময়ের সাথে সাথে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের কিছু পরিবর্তন হলেও এখনো নগরায়নের কুদৃষ্টি পড়েনি গ্রামটিতে ৷ এমনই একটি গ্রামের নিত্যান্ত আটপৌরে পরিবারের সন্তান অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় । বাবা বিজন বন্দ্যোপাধ্যায় গানের শিক্ষক । দিদি দেবারতী বর্ধমান মেডিকেল কলেজের বিএসসি নার্সিং ট্রেনিংয়ে অন্তিম বর্ষের ছাত্রী। জামালপুরের অমরপুর বিমলা কৃষি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল অভিনন্দন । সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে । ’পদার্থ বিদ্যায়’ অনার্স নিয়ে সে ভর্তি হয়েছে হুগলীর শ্রীরামপুর কলেজে।
গ্রাম্য নৈসর্গিক পরিবেশই অভিনন্দনকে বাউল গানে অনুপ্রাণিত করেছে
অভিনন্দনের কথায় উঠে এসেছে কিভাবে গ্রাম্য প্রকৃতি তাকে লোকসংগীতে অনুপ্রাণিত করেছিল।সে জানিয়েছে,সবুজে মোড়া তাঁদের গ্রামের পরিবেশ ও স্নিগ্ধ শীতল প্রকৃতি ছোট বয়সেই তাঁকে বাউল ও লোকগানের অনুরাগী করে তোলে। সেই অনুরাগই তাঁকে লোকসংগীত শেখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে। মা টুম্পাদেবীর কাছে পাওয়া প্রেরণা এবং সংগীতের শিক্ষাগুরু বাবা বিজন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাওয়া লোকসংগীতের তালিম তাঁকে আকাশবাণীতে গান গাওয়ার যোগ্য করে তুলেছে। লালন ফকির এবং সাধন বৈরাগীকে তাঁকে অনুপ্রাণিত করে বলে অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছে ।
দীর্ঘ দিন ধরে সংগীত চর্চার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অভিন্দনের বাবা বিজন বন্দ্যোপাধ্যায়।তিনি বলেন, ‘আমি সংগীতে মাস্টার ডিগ্রী অর্জন করার পর বাউল গান শেখার জন্য সাধন বৈরাগ্যর আখড়ায় যাই।সেখানে যাওয়ার পর আমিও লোকসংগীতের অনুরাগী হয়ে যাই। আমার ছেলে অভিনন্দনও গ্রাম বাংলার প্রতি তাঁর টান ও মাটির টানে ছোট বয়স থেকেই লোকসংগীতের অনুরাগী হয়ে ওঠে।আমি আমার সংগীত শিক্ষার সবকিছু উজার করে দিয়ে অভিনন্দনকে লোকসংগীতের তালিম দিয়ে ওকে যোগ্য করে তুলেছি।ছেলে স্নাতক স্তরের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসংগীতের শিল্পী হিসাবে এখন আকাশবাণীর শিল্পী হিসাবে গানও গাইছে ।’ ছেলের এই কৃতিত্বে গর্বিত বোধ করেন বলে বিজন বাবু জানিয়েছেন।
অভিন্দনের দিদি দেবারতি বলেন,’আমার বাবা সংগীতের শিক্ষা গুরু। বাবার কাছে সংগীতের শিক্ষা নিয়ে আমার ভাই এগিয়ে যাচ্ছে, এরজন্য আমিও খুবই গর্বিত।’ ভাই ভাল মানের একজন শিল্পী হোক এবং গানের জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক,এমনটাই চান দিদি দেবারতি।’
অমরপুর বিমলা কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ের টিচার ইন-চার্জ প্রিয়ব্রত মণ্ডল বলেন,’অভিনন্দন আমাদের স্কুলের গর্ব। এবছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় আমাদের স্কুলের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অভিনন্দন সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।সে পড়াশুনার পাশাপাশি সংগীতেও নিজেকে পারদর্শী করে তুলেছে। ওকে দেখে স্কুলের বর্তমান পড়ুয়ারা যাতে প্রেরণা পায় তাই রেডিয়োয় আকাশবাণীতে অভিন্দনের গাওয়া গান সম্প্রচারিত হলেই আমরা তা পড়ুয়াদের শোনাই ।’।
