এইদিন ওয়েবডেস্ক,গুয়াহাটি,০৪ জুলাই : গুয়াহাটি হাইকোর্ট আসামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে বিদেশী ঘোষণা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশ বহাল রেখেছে এবং রায় দিয়েছে যে, তিনি যে ভারতীয় নাগরিক, তা প্রমাণ করার জন্য তার দাখিল করা নথি যথেষ্ট নয়। আমিনুল হক তার বিরুদ্ধে তদন্তকে অন্যায্য বলে দাবি করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির একটি আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি যুক্তি দেন যে তিনি জন্মসূত্রে একজন ভারতীয় নাগরিক এবং তার দাবির সমর্থনে বেশ কিছু নথি জমা দেন
কিন্তু বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা ও শামীমা জাহানের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ দিনমজুর আমিনুল হকের দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছে। বেঞ্চ বলেছে, তিনি ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ৯ ধারার অধীনে আইনি শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন, যা মামলার সম্মুখীন ব্যক্তির উপর নাগরিকত্ব প্রমাণের ভার অর্পণ করে। আদালত বলেছে, “যদিও আবেদনকারী ১৫টি নথি প্রমাণ হিসেবে দাখিল করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো তাকে এটা প্রমাণ করতে সাহায্য করে বলে মনে হয় না যে, তিনি বিদেশী নন বরং একজন ভারতীয় নাগরিক—এই দায়ভার তিনি পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।”
গুয়াহাটির কাছে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাসকারী ওই ব্যক্তি আদালতে যেসমস্ত নথি জমা দিয়েছেন এর মধ্যে ছিল ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি), ১৯৬৬ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ভোটার তালিকা, ১৯৭৩ সালের জমির দলিল, একটি প্যান কার্ড এবং একটি ভোটার আইডি (ইপিআইসি)।
তবে, আদালতের মতে, আবেদনকারী ১৯৪৬ সালের বিদেশী আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং শামীমা জাহানের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই সমস্ত নথি খারিজ করে দেয়। আদালত জানায় যে, ১৯৫১ সালের এনআরসি-র নথিগুলো কম্পিউটারে তৈরি এবং আইনগতভাবে সত্যায়িত নয়। ভারতীয় সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্রের অনুপস্থিতির কারণে এগুলোর কোনো আইনি মূল্য নেই। এছাড়াও, ২০১৭ সালের স্কুল সার্টিফিকেটটি বাতিল করা হয়েছিল কারণ আবেদনকারী এটি প্রদানকারী প্রধান শিক্ষককে সাক্ষী হিসেবে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আদালত আরও বলেছে যে প্যান কার্ড এবং ভোটার আইডি কার্ড নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়।
ভোটার তালিকায় গুরুতর ত্রুটি
আদালত আবেদনকারীর দাখিল করা ভোটার তালিকায় বেশ কয়েকটি বড় ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি ছিল বয়সের রেকর্ডে। ভোটার তালিকায় পরিবারের একজন সদস্যকে ১৯৭৯ সালে ২৫ বছর বয়সী দেখানো হলেও, ১৯৮৯ সালের তালিকায় তাকে মাত্র ২৯ বছর বয়সী দেখানো হয়েছে।
এছাড়াও, আবেদনকারীর পরিবার বিভিন্ন সময়ে তিনটি ভিন্ন গ্রামে বাস করত: ধোবাকুরা, ঘুগুডোবা এবং হাশডোবা। তবে, আদালত দেখেছে যে এই তিনটি স্থানে বসবাসকারী পরিবারগুলো ভিন্ন বলে মনে হয়েছে, যার ফলে তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো সংযোগ স্থাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বাবার সাক্ষ্যও অকার্যকর
আবেদনকারীর বাবা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, কিন্তু আদালত এটিকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করেছে। হাইকোর্ট বলেছে যে, নাগরিকত্বের মতো গুরুতর বিষয় শুধুমাত্র মৌখিক বিবৃতির ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা যায় না। এর জন্য জোরালো দস্তাবেজ প্রমাণ অপরিহার্য। শুনানির সময় বাবার বক্তব্য এবং ভোটার তালিকার রেকর্ডের মধ্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
সব দিক বিবেচনা করে গুয়াহাটি হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে কোনো আইনি ত্রুটি ছিল না। আবেদনটি খারিজ করে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ১৫টি নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও ওই ব্যক্তি তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি।।
