প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০২ জুলাই : মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে খুনের হুমকি দিয়ে তপশিলী জাতি পরিবারের এক ব্যক্তির কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা আদায় করার অভাযোগ উঠেছে তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে । অভিযোগ পেতেই একাধিক গুরুতর ধারায় এফ আই আর দায়ের করে পুলিশ । আর এফ আই আর দায়ের হতেই চম্পট দিয়েছে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বিধানসভার আঝাপুর অঞ্চলের ডাক্তার’ খ্যাত তৃণমূল নেতা প্রতাপ রক্ষিত। তবে তাকে পাকড়াও করতে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেছে জামালপুর থানার পুলিশ ।
আঝাপুর এলাকার বাসিন্দা প্রতাপ রক্ষিত নিজেকে ‘ডাক্তার’ বলে প্রচার করলেও সে আদপেই ডাক্তারি পাশ কিনা এনিয়ে ধন্দ্ব আছে ৷ তবে তার দাপট শুরু হয় রাজ্যে সিপিএমের শাসনকাল থেকেই । স্বঘোষিত ডাক্তার প্রতাপ রক্ষিত জামালপুরের কালাড়াঘাট বাজারে রীতিমত একটা নার্সিংহোম ফেঁদে বসে । যেহেতু তাবড় সিপিএমের নেতার সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল, তাই প্রতাপের যোগ্যতা নিয়ে কেউ ভয়ে মুখ খোলার সাহস করত না । এদিকে নার্সিংহোমের পাশাপাশি পঞ্চায়েতে বসে ডাক্তারির কারবার বহাল তবিয়তে চালিয়ে যায় প্রতাপ । মন্তেশ্বর বিধানসভার অধীন মেমারি ২ নম্বর ব্লকের বিজুর ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মিঠু সাঁতরার কথায়,শুধু ’অ্যালোপ্যাথি’ নয়,প্রতাপ রক্ষিত ’আয়ুর্বেদিক’ চিকিৎসা পর্যন্ত করত । রাজ্যে ২০১১ সালে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও প্রতাপের দাপট অব্যাহত ছিল।
জানা যায়,’ধুর্ত’ প্রতাপ রক্ষিত তৃণমূলের স্থানীয় নেতা মেহেমুদ খাঁন কে পটিয়ে ফেলে । তারপর ধীরে ধীরে সে তৃণমূলের নেতা বনে যায় । ছোটো খাটো সভায় জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের নজর কেড়ে নেয় । এই যোগ্যতার জন্য জামালপুরের আঝাপুর অঞ্চলের তৃণমূলের সভাপতি বানিয়ে দেওয়া হয় প্রতাপকে । তারপর থেকেই এলাকায় ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করে প্রতাপ । তখন তৃণমূল ক্ষমতায় থাকায় তার সব অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয় সাধারণত মানুষ । কিন্তু ২০২৬ বিধানসভা ভোটে বাংলায় তৃণমূলের শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই প্রতাপ রক্ষিতের বিরুদ্ধে তারা একে একে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেন । বেগতিক বুঝে নিজেকে গুটিয়ে নেয় প্রতাপ ।
এরই মাঝে প্রতাপ রক্ষিতের তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে বন্দুকের মুখে খুনের হুমকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলাবাজির অভিযোগ তোলেন আঝাপুর অঞ্চলের নবগ্রামের তপশিলী সম্প্রদায়ের সমর মালিক । গত ৩ জুন তিই জামালপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন । সমরবাবুর অভিযোগ,প্রতাপ রক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘ ৬ মাস ধরে তাঁর কাছে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করার সাথে সাথে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়ে গেছে। পুলিশ কে সমর মালিক আরো জানিয়েছেন, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল রাতে তিনি মশাগ্রাম রেল গেটের দিক থেকে হয়ে নিজের বাড়ি ফিরছিলেন।পথে ’কেরিলি কবরস্থানের’ কাছে দলবল নিয়ে প্রতাপ রক্ষিত তাঁর পথ আটকিয়ে হুমকি দেয় : “যদি এলাকায় থাকতে চাস তো আমায় টাকা দে, না হলে মেরে ফেলব” । তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করলে প্রতাপ রক্ষিত তাঁর পকেট থেকে ’বন্দুক’ বের করে তার পেটে ঠেকিয়ে বলে,’টাকা না দিলে তোকে আর তোর পরিবারকে খুন করব” । এরপর তারা তাকে রাস্তায় ফেলে এলোপাথাড়ি কিল, চড়, ঘুষি মারে এবং বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে । যাওয়ার সময় প্রতাপ রক্ষিত ও তাঁর দলবল বলে যায়,“পুলিশের কাছে খবর গেলে কালকেই তোর দিন শেষ হয়ে যাবে।” দায়ের হওয়া সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জামিন অযোগ্য একাধিক ধারার মামলা রুজু করে । এদিকে এফ আই আর দায়ের হতেই ওই গুনধর তৃণমূল নেতা এলাকা থেকে বেপাত্তা হয়ে যায় ।
যদিও দলীয় নেতার এহেন কুকীর্তি নিয়ে মুখ খুলতে চাননি তৃণমূলের নেতারা । তবে বিজেপি এনিয়ে পূর্বতন শাসকদলকে তুলোধুনো করেছে । মন্তেশ্বরের বিজেপি বিধায়ক সৈকত পাঁজা বলেন,’এতো দেখছি তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যেপাধ্যায় আয়োজিত ’সেবাশ্রয়ে’ হওয়া ডাক্তার ঘোটালারর মতন আর এক ঘোটালা।এমন কুখ্যাত একজন ব্যক্তি আমার বিধানসভা এলাকার বিজুর ২ নম্বর পঞ্চায়েতে বসে ডাক্তারি করেন সেটা আমার জানাই ছিল না।এই রকম একজন ব্যক্তি কি করে গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাক্তার হিসাবে নিযুক্ত হলেন সেটাই আশ্চর্য্যের। প্রতাপ রক্ষিত বৈধ চিকিৎসা ডিগ্রি প্রাপ্ত ডাক্তার কিনা তার তদন্ত হওয়া জরুরি।’ সেটা যাতে হয় সেই আর্জি রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে রাখবেন বলে সৈকত পাঁজা জানিয়েছেন ।
অন্যদিকে কালাড়াঘাট এলাকার বাসিন্দা জেলা বিজেপি নেতা জীতেন্দ্রনাথ ডকাল বলেন,’বাম আমলে আমরা তো প্রতাপ রক্ষিত কেই কালাড়ার নার্সিংহোমে আসা সব রোগীদের চিকিৎসা করতে দেখেছি। তখন তো নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ বলতো প্রতাপ রক্ষিত তাঁদের আর,এম,ও(RMO)।আবার এখন জানা যাচ্ছে প্রতাপ রক্ষিত ’অ্যালোপ্যাথিক’ ডাক্তারই নন,তিনি নাকি ’আয়ুর্বেদিক“ ডাক্তার।’ জীতেন্দ্রনাথ বাবু বলেন ,আমার মনে হচ্ছে কুখ্যাত তৃণমূল নেতা প্রতাপ রক্ষিত আদতে ডাক্তারই নন।তিনি ভুয়া ডাক্তর সার্টিফিকেট দেখিয়ে পঞ্চায়েতে ডাক্তারি করছেন।।
