প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,০৫ জুন : বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে চুড়ান্তভাবে হারিয়ে বাংলায় সরকার গঠন করেছে বিজেপি। তারপর থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে তৃণমূল রাজত্বে হওয়া যাবতীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু হয়েছে। তারই মধ্যে তোলপাড় ফেলেছে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর বাসস্ট্যান্ডে থাকা ’কমিউনিটি হল’ নিয়ে হওয়া বেনজীর দুর্নীতি কাণ্ড। অবৈধ ভাবে ’টেণ্ডার’ ডেকে সরকারী অর্থে তৈরি ’কমিউনিটি হল’ একক ব্যক্তিকে লিজে দিয়ে তাঁকে সেখানে হোটেল -রেস্টুরেন্ট করতে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে এখন সরগরম জামালপুর। এই দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
তৃণমূল রাজত্বে জামালপুর বাসস্ট্যাণ্ডের জায়গায় গড়ে তোলা হয় বৃহৎ আয়তনের বিলাশবহুল দ্বিতল একটি কমিউনিটি হল। যদিও সরকারী নথিতে এই কমিউনিটি হলটি জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতি অধীন জামালপুর বাজার এলাকায় নির্মিত হয়েছে বলে উল্লিখিত রয়েছে। কমিউনিটি হলটি নির্মাণের জন্য ’মাইনরিটি অ্যাফেয়ার্স এ্যাণ্ড মাদ্রাসা এডুকেশন’ (MAME)’ দফতর ২০১৯-২০ অর্থ বর্ষে ৬৮ লক্ষ ২৮ হাজার ৮১৪ টাকা বরাদ্দ করে। হলটি সম্পূর্ণ নির্মিত হয়ে যাওয়ার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গের তদানিন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটির উদ্বোধন করেন।তখন এলাকার নাগরিকদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অন্যান বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের স্বার্থে কমিউনিটি হলটি নির্মানের কথা ঘোষণা করা হয়।
কমিউনিটি হলটি গড়ে ওঠার পর তার সুফল পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে ছিলেন জামালপুরের মানুষজন। কিন্তু এলাকাবাসীর সেই আশায় কার্যত জল ঢেলে দেয় জামালপুর ব্লক প্রশাসন ও তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতির দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। ২০২৫ সালে নতুন অর্থ বর্ষ শুরুর পরেই তাঁরা কমিউনিটি হলটি ’লিজ’ দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। তারপর ওই বছরেরই জুলাই মাসে জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাহী আধিকারিক (Executive Officer) তথা বিডিও (BDO) পার্থসারথী দে একটি টেণ্ডার বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। যে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে বিডিও পার্থসারথী দের স্বাক্ষর থাকলেও,ছিল না তারিখ সহ ’মেমো’ নাম্বার (Memo Number)।এমনকি এম.এ.এম.ই (MAME) দফতরের ছাড়পত্র নিয়ে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে,এমন কোনও তথ্য ওই ’টেণ্ডার বিজ্ঞপ্তির’ কোথাও উল্লিখিত ছিল না।
তবুও বিডিও’র জারি করা ওই টেণ্ডারে অংশ নেন সৌমিত্র অধিকারী নামে জামালপুরের শুঁড়েকালনা নিবাসী তৃণমূল ঘনিষ্ট ব্যবসায়ী।তিনি জানান, ’কমিউনিটি হলটি নিয়ে জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতির ডাকা ’টেণ্ডার’ নিয়ম মেনে ডাকা হয়েছিল ,কি হয় নি, সেটা তিনি জানেন না।তবে প্রতি বছর ১লক্ষ ১০ হাজার ১০০ টাকা জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতিকে পরিষোধের শর্তে ৩ বছরের জন্য কমিউনিটি হলটি তিনি যে লিজে পেয়েছেন তা তিনি স্বীকার করেছেন।একই সঙ্গে তিনি এও জানান,নির্দিষ্ট ওই টাকা পরিষোধ করে ২০২৫ সালের ৪ আগষ্ট তিনি জামালপুর বাস স্ট্যাণ্ডে থাকা কমিউনিটি হলে হোটেল-রেসটুরেন্ট চালু করেন।বেশ কয়েক মাস হোটেল-রেস্টুরেন্ট তিনি চালান।কিন্তু লাভের মুখ দেখতে পান না।তাই কমিউনিটি হলে হোটেল- রেস্টুরেন্ট ব্যবসা এখন বন্ধ রেখেছেন বলে সৌমিত্র অধিকারী জানিয়েছেন ।
বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন,’তারিখ ও মেমো (Memo Number) নম্বার বিহীন টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি অবৈধ। জামালপুরের বিডিও মাইনরিটি দফতরের (MAME) ছাড়পত্র না নিয়েই অবৈধ ভাবে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি জারি করে কমিউনিটি হলটি একক ব্যক্তিকে লিজে দিয়ে চুড়ান্ত বেআইনি কাজ করেছেন ।’এনিয়ে বিডিও (জামালপুর) পার্থসারথী দে কে ফোন করা হলে তিনি যুক্তিগ্রাহ্য কোনও উত্তর দিতে পারেন না। ঘটনা নিয়ে তদন্ত হলে বিপদ বাড়তে পারে বুঝে তিনি এখন দায় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। একই ভাবে কোনও সদুত্তর দিতে না পেরে জামালপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি তথা তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে এবাবের বিধানসভা ভোটে লড়া ভূতনাথ মালিকও দায় এড়ান’।
তবে গোটা ঘটনার সবিস্তার শুনে রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,
‘ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। তদন্তে বিডিও বা অন্য যাঁর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির প্রমাণ মিলুক না কেন কাউকে রেয়াত করা হবে না। দোষীদের আইনি শাস্তি ভোগ করতে হবে ।’।
