বুরুঙ্গা গণহত্যা হচ্ছে ২৬শে মে ১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা বাংলাদেশের সিলেট জেলার তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলার (বর্তমান ওসমানী নগর), বুরুঙ্গা এবং তার আশপাশের গ্রামের হিন্দু জনগণের উপর সংগঠিত একটি হত্যাকাণ্ড, যা বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে সংগঠিত হয় । শান্তি কমিটির মুসলিম সদস্যদের সহযোগিতায় অন্তত ৯৪ জন নিরীহ হিন্দু গ্রামবাসীকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে পাকিস্তানী নৃশংস বর্বর সেনা । গতকাল ২৬ মে বুরুঙ্গা গণহত্যা দিবস ছিল । নিঃশব্দে সেই ৯৪ জন হতভাগাকে স্মরণ করে ভুক্তভোগীদের উত্তরসূরীরা । তবে পাকিস্তানি সেনার নৃশংসতা ও বর্বরতা আর বাংলাদেশি মুসলিমদের বিশ্বাসঘাতকতার সেই হিন্দু নরসংহারের ইতিহাস থেকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছে সংবাদ মাধ্যম । আসুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশে বুরুঙ্গা হিন্দু গণহত্যার ইতিহাস বরাত জোরে বেঁচে ফেরা কিছু মানুষের বর্ণিত ঘটনার বিবরণ ।
সিলেটের বালাগঞ্জ থানার বুরুঙ্গা ইউনিয়নের শান্ত ও নিভৃত একটি গ্রাম বুরুঙ্গা। বুরুঙ্গা ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িবরাক নদী। মুক্তিযুদ্ধের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। হঠাৎ পুরো গ্রামে আতংক ছড়িয়ে পড়লো। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে যেকোন মুহূর্তে আক্রমণ চালাতে পারে। আতংকিত বুরুঙ্গা ইউনিয়নের গ্রামবাসীরা দেখা করেন বুরুঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর সঙ্গে।
.এরপর চেয়ারম্যান ইনজাদ আলী ও ইউনিয়ন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছয়েফ উদ্দিন মাস্টারের নির্দেশেই ২৫ মে বিকেলে বুরুঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে ঘোষণা করা হয় পরের দিন অর্থাৎ ২৬ মে বুরুঙ্গা হাইস্কুলে শান্তি কমিটি গঠন করা হবে এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে শান্তি কমিটির পরিচয় পত্র বিতরণ করা হবে। সবাইকে আশ্বস্ত করে বলা হয় শান্তি কমিটির পরিচয় পত্র থাকলে পাকিস্তানি বাহিনী কোন প্রকার নিপীড়ন বা নির্যাতন চালাবে না।
নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারবেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। কিন্তু গ্রামের চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর আশ্বাসের পরও গ্রামবাসীর মধ্যে চাপা আতঙ্ক এবং ভয় কাজ করছিলো। রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের দৃঢ় আশ্বাসের উপর বিশ্বাস করে ২৬ মে সকালে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের শান্তি কমিটির সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে গ্রামের সাধারণ মানুষ। ২৬ মে সকাল ৮টার আগেই হাজারের বেশী মানুষের জমায়েত হয়েছিলো বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সকাল ৮টার দিকে শান্তি কমিটিতে যোগদানের জন্য গ্রামবাসীর কথিত নামের তালিকা করা শুরু হয়।
সকাল ৯টার দিকে করনসী গ্রামের রাজাকার কমান্ডার আব্দুল আহাদ চৌধুরী, পল্লী চিকিৎসক আব্দুল খালেককে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বড় একটি দল জীপে করে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এসে উপস্থিত হয়। এরপরই স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের থেকে উপস্থিতির তালিকা বুঝে নেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এসময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল গ্রামের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে শান্তি কমিটির সভায় না আসা অবশিষ্ট পুরুষদের বিদ্যালয়ের সামনের মাঠে উপস্থিত হতে বাধ্য করে।
সকাল ৯টা। উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখে মুখে তখন তীব্র আতংকের ছাপ। কারো মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত নেই। ইতিমধ্যেই তালিকা ধরে ধরে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের আলাদা করে স্থানীয় রাজাকার, পাকিস্তানি সেনা ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয় বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে, আর মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে যাওয়া হয় স্কুলের একটি শ্রেণীকক্ষে। এরপর হিন্দু ও মুসলিম উভয়কে দিয়েই কালেমা পাঠ করানো হয় এবং পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বলা হয়।
.সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আব্দুল আহাদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে এক হানাদার সেনা কারো কাছে সোনাদানা-টাকাকড়ি থাকলে সেগুলি জমা করার নির্দেশ দেয়। মুসলমান ও হিন্দুদের থেকে টাকা লুট করে নেওয়ার পর মুসলমানদের মধ্যে বেশীরভাগকে ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকা জমা নেয়ার পর বাইরে ‘নারায়ে তাকবীর – আল্লাহ আকবার’ , ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে স্লোগান দিতে দিতে ভীতসন্ত্রস্ত মুসলমান জনগোষ্ঠী বাড়ির দিকে পালাতে শুরু করে। বাকি আটক মুসলমানদের মধ্যে ১০/১২ জনকে স্থানীয় বাজার থেকে নাইলনের দড়ি নিয়ে আসতে বলে হানাদার সেনারা। তারা দড়ি নিয়ে এলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে পিছমোড়া করে শক্ত ভাবে বাধঁতে নির্দেশ দেয় হানাদার সেনারা। এসময় কক্ষে থাকা কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রাণের ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করেন।
বন্দী সেই অফিস কক্ষের একটি জানালা খানিকটা ভঙ্গুর থাকায় বুরুঙ্গা হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক প্রীতিরঞ্জন চৌধুরী প্রাণ বাঁচাতে টেনেহেঁচড়ে সেই জানালা খুলে ফেললে সহকারী শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী, রানু মালাকার ও একজন হিন্দু যুবক জানালা দিয়ে পালাতে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে।
বুরুঙ্গা গণহত্যায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বুরুঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, ‘২৬ তারিখ সকাল আটটার দিকে স্কুলের মাঠে যাওয়ার কথা থাকলেও আমার একটু দেরী হয়ে যায়। আমি গিয়ে যখন পৌঁছাই তখন হিন্দু জনগোষ্ঠীর সবাইকে সেই কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। আমাকে দেখেই ওরা আমাকে ধরে সেই ক্লাসরুমে নিয়ে যায়। যখন তারা বাঁধতে যাবে সবাই প্রাণের ভয়ে চিৎকার শুরু করেছে। ক্লাসরুমের একটা জানালা কিছুটা ভাঙ্গা ছিল, আর সঙ্গে কিছুটা ফাঁক ও ছিলো। দেখলাম প্রাণে বাঁচতে হলে আমার সামনে উপায় নেই। আমি জানালাটা টান দিতেই জানালা খুলে গেল। আমি লাফিয়ে জানালা টপকাতেই ওরা ব্রাশফায়ার শুরু করলো। আমার পর রানু মালাকার সহ আরো কয়েকজন পালাতে পেরেছিলেন।‘
উপস্থিত সবাইকে দড়ি দিয়ে বেঁধে স্কুলের মাঠে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড় করায় হানাদার সেনারা। এরপরই খুব নিকট থেকে ব্রাশফায়ার শুরু করে হানাদারেরা। পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম ব্রাশফায়ারে মুহূর্তের ব্যবধানেই রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত হয় বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। বুরুঙ্গা গণহত্যায় দুবার গুলিবিদ্ধ হয়েও ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন শ্রী নিবাস চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘মুহুর্তেই ব্রাশ ফায়ারে বৃষ্টির মতো মেশিনগানের গুলি এসে পড়তে লাগলো হাত বাঁধা অসহায় মানুষগুলোর উপর। কারো চোখ-মুখ উপড়ে গিয়েছিল, কারো বা বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো, আবার কারো মগজ বের হয়ে আমার উপর পড়েছিল। রক্তের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল লোকগুলো। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতর লোকগুলোর উপর কেরোসিন ঢেলে অগ্নি সংযোগ করে দিল পশুরা। আগুনের উত্তাপে মৃত কেউ একজন নড়াচড়া করলে তার উপর গুলি বর্ষণ ও বেয়নেট চার্জ করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।
তিনি বলেন,’আমার বাম হাতে মেশিন গানের গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই আমি মাটিতে মৃতের মতো শুয়ে রইলাম। ধ্বংসযজ্ঞ শেষে নরপশুরা যখন চলে যায় তখন কেউ আহত অবস্থায় যন্ত্রনা কাতর হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল । তা দেখে নরপশুরা আবার ফিরে এসে রাইফেল দিয়ে গুলি চালাতে লাগলো।
সন্দেহবশত আমার পিঠেও গুলি করেছিলো। ভাগ্যিস গুলিটি আমার মেরুদন্ডের উপর চামড়া ভেদ করে চলে গিয়েছিল। তাই আমি বেঁচে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর স্থানীয় লোকজনের গলার আওয়াজ শুনলাম। হয়তো কোনো আপনজন কিংবা কোন সাহসী লোক ছুটে এসেছিল। সেই সময় লক্ষ্য করলাম কিছু লোক জলের জন্য আর্তনাদ করছে। স্কুলের বারান্দায় থাকা একটি বালতির মধ্যে জল দেখে তা আমার বৃদ্ধ পিতা নিকুঞ্জ বিহারী চক্রবর্তী ও আর্তনাদগ্রস্ত কিছু লোককে জল পান করাই। এই গণহত্যায় আমার বৃদ্ধ পিতা ও আমার ভাই নিত্তরঞ্জন চক্রবর্তীকে আমি চিরতরে হারিয়েছিলাম।’
গণহত্যা শেষে চরম পৈশাচিক কায়দায় গণহত্যায় নিহত শহীদদের লাশ পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারেরা। এরপর সিলেট কোর্টের আইনজীবী রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকে চলে যেতে বললে অসুস্থ রাম রঞ্জন চেয়ার থেকে দাঁড়াতেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করে হানাদারেরা।.গণহত্যার পর আহাদ চৌধুরী ও পল্লী চিকিৎসক আবদুল খালেকের নেতৃত্বে রাজাকারেরা পুরো গ্রামে লুটপাট চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিলো।।
