ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ব্যক্তিগত লোভ, ক্ষমতা বা আদর্শের কারণে নিজের দেশ, নেতা বা দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার অসংখ্য ঘটনা পাওয়া যায়। যাদের জনকল্যাণমুখী কোনো কাজের জন্য নয়, বরঞ্চ তাদের সেই সমস্ত ঘৃণিত কর্মকাণ্ড আজও মানুষ ঘৃণার সঙ্গে স্মরণ করে । বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও কুখ্যাত ১০ জন বিশ্বাসঘাতকের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১)মীর জাফর (১৭৫৭) :
ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত বিশ্বাসঘাতক। আজও ভারতবাসী বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দ হিসাবে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা-র সেনাপতি মীর জাফরের নাম ব্যবহার করে । যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিরাজউদ্দৌলা-র বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরেছিল ।পলাশীর যুদ্ধে সেনা নিষ্ক্রিয় রাখার ফলে সিরাজ পরাজিত হন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পথ খুলে যায়।
২)মার্কাস জুনিয়াস ব্রুটাস (Marcus Junius Brutus):
রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি জুলিয়াস সিজারের (খ্রিস্টপূর্ব ৪৪) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সিজারকে হত্যার ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। “Et tu, Brute” নামে ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে আছে সে ।
৩)যিহূদা ইস্কারিয়ত (Judas Iscariot):
ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক। মাত্র ৩০ খণ্ড রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে তিনি যিশু খ্রিস্টকে (খ্রিস্টীয় ১ম শতক) রোমান সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ।
৪)জুলিয়াস এবং এথেল রোজেনবার্গ (Julius and Ethel Rosenberg):
স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই দম্পতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা তৈরির গোপন তথ্য ও নকশা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পাচার করেছিলেন। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে ১৯৫৩ সালে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
৫)বেনেডিক্ট আর্নল্ড (Benedict Arnold):
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি জেনারেল হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও অর্থের লোভে তিনি ব্রিটিশদের কাছে আমেরিকান বাহিনীর গোপন তথ্য ফাঁস করে দেন । আজও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর নাম “বিশ্বাসঘাতক”-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৬) ভিডকুন কুইজলিং (Vidkun Quisling) :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের এই রাজনীতিবিদ নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে নাৎসি জার্মানিকে ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর নামানুসারেই বিশ্বাসঘাতকতার আরেক নাম “কুইজলিং” হয়ে যায় ।
৭)অলড্রিচ এমস (Aldrich Ames):
সিআইএ (CIA) এর প্রাক্তন কর্মকর্তা। অর্থের লোভে স্নায়ুযুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য গুপ্তচর এবং গোয়েন্দা সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপন তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি-র (KGB) কাছে বিক্রি করে দেন ।
৮)রবার্ট হ্যানসেন (Robert Hanssen):
এফবিআই (FBI) এর এই ডাবল এজেন্ট দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক গোপন তথ্য সোভিয়েত ও রাশিয়ান গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
৯)ওয়াং জিংওয়েই (Wang Jingwei):
চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জাপানি সাম্রাজ্যের সাথে হাত মিলিয়ে চীনে তাদের পুতুল সরকার গঠনে সাহায্য করেছিলেন ।
১০)ম্যাটা হারি (Mata Hari):
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ডাচ বংশোদ্ভূত এই নর্তকী ও গুপ্তচর একই সাথে ফ্রান্স এবং জার্মানি—উভয় দেশের হয়েই গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন। নিজের দেশের সেনাদের মৃত্যুর কারণ হওয়ার কারণে তিনি ইতিহাসে বড় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হন।
এর বাইরেও আরও কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য । তারা হল :
মীর সাদিক (১৭৯৯) :
মহীশূরের শাসক টিপু সুলতান-এর মন্ত্রী Mir Sadiq চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে গোপনে ব্রিটিশদের সঙ্গে আঁতাত করেন।যুদ্ধের মাঝপথে সৈন্যদের বেতন দেওয়ার বাহানায়বতিনি সেনাদের সরিয়ে নেন। এতে ব্রিটিশ বাহিনী দুর্গে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং টিপু সুলতানের মৃত্যু ঘটে । অবশ্য টিপুর সঙ্গে বেইমানি করলেও তার এই কর্মকাণ্ডে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছিল ।
আলসিবিয়াডিস :
এথেন্সের নেতা Alcibiades পেলোপনেশীয় যুদ্ধ চলাকালীন একাধিকবার এথেন্স, স্পার্টা ও পারস্যের মধ্যে পক্ষ পরিবর্তন করেন। ইতিহাসে তাঁকে সবচেয়ে সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক চরিত্রদের একজন ধরা হয়।
আর্নেস্টো(১৯৬৭)
বিপ্লবী “চে” গুয়েভারা-র অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ফাঁস হওয়ার পর বলিভিয়ান বাহিনী তাঁকে আটক করে হত্যা করে। ঘটনাটি আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়।।
