নারীদের প্রতি চরম ভয়ের কারণে গত ৫৫ বছর ধরে সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন রুয়ান্ডার এক ব্যক্তি । নারীদের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য তিনি ১৬ বছর বয়সে তার বাড়ির চারপাশে ১৫ ফুট উঁচু বেড়া তৈরি করে রেখেছেন । তবে অবাক করার মত বিষয় হল যে তার প্রতিবেশীরা অধিকাংশই নারী এবং ওই মহিলারাই প্রতিদিন বেড়ার ওপর দিয়ে তাকে খাবার ও পানীয় জল সরবরাহ করেন ৷
রুয়ান্ডার(Rwanda) বাসিন্দা ওই ব্যক্তির নাম ক্যালিক্সটে নজামউইটা (Callixte Nzamwita) । তার বর্তমান বয়স ৭১ বছর । যখন তার বয়স প্রায় ১৬ বছর ছিল, তখন থেকেই কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের প্রতি তার মনে চরম ভীতির সঞ্চার হয় । তীব্র নারীভীতিতে (গানোফোবিয়া) ভোগার কারণে, তিনি ১৬ বছর বয়সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন এবং নারীদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ এড়িয়ে চলার জন্য তার বাড়িটিকে একটি উঁচু কাঠের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেন।
এই ছোট বাড়িতে, ক্যালিক্সটে তার সমস্ত দিন বাইরে না গিয়েই কাটান; একটি অত্যন্ত আবদ্ধ জায়গায় তিনি বসবাস, ঘুম এবং খাওয়া-দাওয়া করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, নারীদের সংস্পর্শ এড়াতেই তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন, কারণ নারীদের দেখলেই তার মধ্যে তীব্র ভয়ের সঞ্চার করে।তখন থেকে তিনি নিজের বাড়িতেই একাকী জীবনযাপন করছেন এবং খাবার তৈরি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সাধারণ কাজকর্ম পর্যন্ত নিজের সমস্ত প্রয়োজন কার্যত একাই মেটাচ্ছেন।কোনো নারী যাতে কাছে আসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে নজামউইটা তার বাড়ির চারপাশে পাঁচ মিটার উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখেন । আফ্রিম্যাক্স টিভি কর্তৃক প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নজামউইতা বলেছেন,’আমি নিজেকে বাড়িতে আটকে রেখেছি এবং আমার বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েছি, কারণ আমি নিশ্চিত করতে চাই যে মহিলারা যেন আমার কাছে না আসে।’
তবে ক্যালিক্সটে নজামউইটা নারীদের ভয়ে এড়িয়ে থাকলেও প্রতিবেশী নারীরা তাদের মমত্ববোধ ত্যাগ করতে পারেননি । গ্রামের নারীরাই বেড়ার উপর দিয়ে তাকে খাবার, জল এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে তার বেঁচে থাকা নিশ্চিত করেন। ক্যালিক্সটে কোনো সরাসরি সংস্পর্শ ছাড়াই দূর থেকে এই সমস্ত জিনিসপত্রগুলো সংগ্রহ করেন এবং গ্রামের বাসিন্দারা কঠোরভাবে এই ব্যবস্থা মেনে চলেন ।
এই চরম নিঃসঙ্গ জীবন সত্ত্বেও, ক্যালিক্সট শান্তিতে আছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন যে তিনি কখনোই বিয়ে করতে চাননি এবং এই জীবনযাত্রাই তাঁর জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত৷ তিনি বলেছেন,’আমি যেভাবে বেঁচে আছি, সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।’
ক্যালিক্সটে নজামউইটার এই প্রকার মানসিক অবস্থাকে ডাক্তারি পরিভাষায় গ্যামোফোবিয়া (Gamophobia) বলা হয় । নারীদের প্রতি তীব্র ভয় বা ফোবিয়া একটি বিরল ফোবিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বা সাংস্কৃতিক কারণের সাথে সম্পর্কিত। চরম পরিস্থিতিতে, এটি ভুক্তভোগীকে বিচ্ছিন্নতার মতো মারাত্মক আচরণের দিকে পরিচালিত করতে পারে । গ্যামোফোবিয়া হলো বিয়ে বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে জড়ানো নিয়ে এক ধরণের অস্বাভাবিক ও তীব্র ভয় ।
গ্রিক শব্দ ‘গ্যামোস’ (বিয়ে) এবং ‘ফোবিয়া’ (ভয়) থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি। গ্যামোফোবিয়ার ফলে বিয়ের কথা শুনলে বা বিয়ের পরিকল্পনা করতে গেলেই তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয় । মনে ভয় কাজ করে যে বিয়ে করলে ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা কমে যাবে বা একসাথে মানিয়ে চলা যাবে না । অতীতে কোনো খারাপ সম্পর্ক বা বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা থেকে এই ভয়ের জন্ম হতে পারে ৷ এই মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণ দেখা দেয় । যেমন : বিয়ের কথা উঠলে মাথা ঘোরা, কাঁপুনি বা হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে । এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন । তবে ক্যালিক্সটে নজামউইটার সঙ্গে তার কিশোর বয়সে ঠিক কি ঘটেছিল, সেটা তিনি খোলসা করেননি ।।
