এক সময় শত শতাংশ হিন্দু অধ্যুষিত ভূখন্ড পূর্ববঙ্গে আজ হিন্দুরা অস্তিত্ব সঙ্কটে । স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সময়েও সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশের অধিক ৷ কিন্তু ইসলামি আগ্রাসনে সেই সংখ্যা আজ ৭ শতাংশে নেমে এসেছে । বাদবাকি হিন্দুদের উৎখাত করে শত শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে জাল বিছিয়েছে বিভিন্ন চরমপন্থী ইসলামি সংগঠনগুলি । মাঝে মধ্যেই তারা হিন্দুদের ভারতে পালানোর হুমকি দেয় । জোর করে ঘরবাড়ি, জমিজমা দখলের খবর আকছার পাওয়া যায় বাংলাদেশে । দশকের পর দশক ধরে কিভাবে হিন্দুদের উদারতা ও ইসলামি আগ্রাসন আজ এক সময়ের এই হিন্দু অধ্যুষিত ভুখন্ডকে হিন্দু শুণ্য করে দিয়েছে তার বর্ণনা নিজের ব্লগে দিয়েছেন বাংলাদেশের ফেনি জেলা মহিলা শ্রমিক লীগ সভাপতি মোর্সেদা আখতার মিয়াজি । তার পোস্টটি নিচে তুলে ধরা হল :
হিন্দুদের দেশ ইন্ডিয়ায় ।ওদের ওখানে চলে যেতে হবে! মুসলমানরা বাংলাদেশে বসবাসের ২-৩ হাজার বছর আগে থেকেই হিন্দু ধর্মের মানুষ বাংলাদেশে বসবাস করতো।পালরা বাংলাদেশে ৪০০ বছর শাসন করেছে।আজ থেকে ৩,৫০০ বছর আগেও ইন্দো- আর্যরা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাস করতো। হিন্দু সেন রাজারা ১৫০ বছর বাংলা শাসন করেছেন।রাজা বিজয় সেন ৬৩ বছর ও শশাঙ্ক ৪৩ বছর বাংলার শাসক ছিলেন। বাংলাদেশের বগুড়ায় মহাস্থানগড়ে লক্ষীন্দরের মেধ ( গোকুল মেধ) নামে যে স্থাপনা পাওয়া যায় তা দুই হাজারের বেশি বছরের পুরোনো।পাল আমলের পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার এখনও বৌদ্ধ ধর্মের নিদর্শন বহন করছে। হিন্দুদের ভারতে,বৌদ্ধদের মায়ানমারে পাঠিয়ে যারা বাংলাদেশে শত শত বছর ধরে দখলদারির রাজনীতি করছে, তাদের কি মানুষ মনে হয় আপনার ?
বাংলাদেশে মুসলমানদের বসবাস মাত্র ৮০০ বছরের পুরোনো।অনেকেই ১১০০ থেকে ১২০০ বছর আগের চট্রগ্রাম বন্দরে আরবের বণিকদের আগমন সম্পর্কে বলেন।১৩৩৫ বছর আগের লালমনিরহাটের মসজিদের প্রসঙ্গ অনেকে তুলেন।এর থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আরবের বণিকদের আগমন ও মসজিদ প্রতিষ্ঠায় হিন্দু রাজারা কোন বাঁধা দেননি। বাংলাদেশের হিন্দু – মুসলমান সংঘাত শুরু হয় ১২০৫ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজির বাংলা আগমনের মধ্য দিয়ে।শুরু হয় প্রতিহিংসার যুদ্ধ। বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে এই প্রতিহিংসার বীজ বুনে দিয়েছিলেন বখতিয়ার খলজি।পাল ও সেন বংশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধের সুযোগ নিয়ে খলজি বাংলায় তরবারি দিয়ে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।এর ফলে সর্বপ্রথম বাংলার শাসন হিন্দু রাজাদের থেকে মুসলমানদের হাতে চলে যায়। বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে হিংসার বীজ বুনে দিয়েছিলেন ক্ষমতালোভী তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজি। এদের কারো দেশ বাংলাদেশ ছিলো না।এরা ছিল ভাড়াটিয়া।মুলত আফগান , ইরান ও তুরস্ক থেকে আসা ক্ষমতালোভী মুসলিম শাসকরাই ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছেন।
তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজি বাংলায় ব্যাপক হিন্দু ও বৌদ্ধ হত্যাযজ্ঞ চালান।এক এক করে তিনি বাংলাদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দিরগুলি ধ্বংস করেন। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিক্রমশীলার মতো একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরী ধ্বংস করেন। নির্বিচারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করেন।তার নির্যাতনে হাজার হাজার বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী বাংলা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
সেন রাজাদের আমলেও বৌদ্ধরা হিন্দু রাজাদের কর্তৃক ব্যাপকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়।অথচ পাল আমলেও বাংলাদেশের হিন্দু ও বৌদ্ধরা মিলেমিশে এই বাংলায় বসবাস করেছে।মূলত ক্ষমতালোভী শাসকরা বিভিন্ন সময় এই বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছেন। তবুও বাংলা ভূখণ্ড ছিল হিন্দু, মুসলমান , বৌদ্ধ বিভিন্ন ধর্মের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক সুন্দর উদাহরণ।৭০০ বছর পর হিন্দু ও মুসলমানের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেন ব্রিটিশের গুপ্তচর জিন্নাহ।
বাংলার প্রথম রাজা ছিলেন রাজা শশাঙ্ক। বঙ্গাব্দ তিনিই চালু করেন। বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে স্বর্ণযুগ ছিলো পাল রাজবংশের ৪০০ বছরের শাসন।এই ৪০০ বছরে বাংলা ছিল অন্যতম সমৃদ্ধ এক জনপদ।ধর্মপাল ও দেবপালের মতো শাসকরা কৃষি ও বাণিজ্যে বাংলাকে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছিলেন। বাংলাদেশ ভূখণ্ড পরিণত হয়েছিল হিন্দু – মুসলিম ও বৌদ্ধ সহ সকল ধর্মের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য জনপদে।উনিশ শতকে এসে রাজনীতিবীদরা যখনি ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেন তখনি ভারতীয় উপমহাদেশে শুরু হয় হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংঘাতের নতুন ইতিহাস।৭১২ সালে ভারত বিজয়ের মধ্য ইরান, তুরস্ক ও আফগান থেকে আসা মুসলমানরা এই হিংসার বীজ পুতে দিয়েছিল। ব্রিটিশরা হিন্দু ও মুসলমানের এই সাম্প্রদায়িক হিংসাকে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।এর ফলে ভারতে হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাত যেন চিরস্থায়ী সংঘাতের রূপ নিয়েছে। ভণ্ড রাজনীতিবীদরা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন।
১৯১৭ সালে কলকাতার হিন্দু – মুসলমান দাঙ্গা, ১৯১৮ সালে বিহারে দুর্গাপূজা ও কোরবানির নামে হিন্দু ও মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাত যেন চিরস্থায়ী রূপ নিতে শুরু করে।এর পেছনে যতটুকু না ধর্ম দায়ি , বরং তার চেয়েও বেশি দায়ি হচ্ছে রাজনৈতিক ভণ্ড নেতাদের ধর্ম ব্যবসা।ধর্ম ব্যবসাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো একটি জাতিকে কতটুকু পঙ্গু করে দেয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
ব্রিটিশরা খুব কৌশলে লন্ডন থেকে জিন্নাহকে উড়িয়ে এনে ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী বিভাজন তৈরি করে দিয়েছে ১৯৪৭ সালে ‘টু নেশন থিউরি ‘ নামক ভণ্ডামি করে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান দুটো রাষ্ট্র সৃষ্টি করে।একই কাজ “ডিভাইড অ্যান্ড রুল ” পলিসির মাধ্যমে তার মাত্র এক বছরের মাথায় জন্ম দিয়েছে ইসরায়েল – ফিলিস্তিন দুটো রাষ্ট্র। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ যে একটা অঞ্চলের মানুষের জন্য কত বড় অভিশাপ তার উদাহরণ হচ্ছে ভারত – পাকিস্তান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন। তবুও এসব অঞ্চলের ভোদাই মানুষ আজকের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সের যুগে এসেও অহেতুক ধর্মের লড়াই করছে।এটা মূলত কোন ধর্ম লড়াই নয়, এটা হচ্ছে ক্ষমতালোভী রাজনীতিবীদদের ক্ষমতা দখলের লড়াই। হিন্দু ও মুসলমানের এই সাম্প্রদায়িক সংঘাত চিরতরে বন্ধের জন্য বাংলায় জন্ম হয়েছিল বঙ্গবন্ধু নামক এক মহানায়কের।যিনি সকল জাতি ও ধর্মের মানুষের জন্য একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সকল নাগরিকের সমান অধিকারের একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিলেন।সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের স্বপ্ন থেকেই নিজেদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা ধরে রাখতেই ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু বাঙালির সুখে থাকলে ভূতে কিলায় জাতির এই সুখ বেশিদিন সহ্য হয়নি।
১৯৪৭ সালে মোট জনসংখ্যার ত্রিশ শতাংশের অধিক ছিল হিন্দু ধর্মের মানুষ। দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তানের নির্মম নির্যাতনে তারা তাদের জন্মভুমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পরও হিন্দু মুসলমানদের এই ধর্মীয় বিভাজনের সুযোগ নিতে থাকে ভণ্ড রাজনীতিবীদরা। হিন্দুদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।একটা জাতিকে ধ্বংস করা , হিন্দু ও বৌদ্ধদের বাংলা ভূখণ্ড থেকে এক এক করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া,এসব বাংলাদেশের রাজনীতিবীদ দের কুকর্মের নমুনা মাত্র। এজন্য ত্রিশ শতাংশ থেকে কমতে কমতে হিন্দু জনসংখ্যা এখন ৭.৯০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।একটি ধর্মের কোটি কোটি মানুষকে এইভাবে পরিকল্পিত হত্যা ও নির্যাতন কোন সভ্য দেশ ও জাতির অংশ হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী – কারা এই ভূখণ্ডের ভাড়াটিয়া , আর কারা ঐতিহাসিক বৈদ্বিক যুগ থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করছে।
ধর্ম মানুষের গায়ে লেখা থাকে না। মানুষের পরিচয় হোক শুধুই মানুষ।জাতি হিসেবে বাংলার , হিন্দু, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান ও মুসলমান আমরা সবাই বাঙালি জাতি।জাতি হিসেবে আমরা মুসলিম নই। বাঙালি জাতির ইতিহাস প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো।যুগে যুগে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ বেনিয়া , মোঘল, আফগান ও পাকিস্তানের বেনিয়ারা এই অঞ্চলের বাঙালি হিন্দু, মুসলমান , বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানকে শাসন ও শোষণ করে গেছে।ওরা ছিল ক্ষমতালোভী শাসক। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওরা সমৃদ্ধ বাংলা জনপদের সম্পদ লুট করতে এসেছিল। লুটেরাদের ধর্ম কোনদিনও মানুষের ধর্ম হতে পারে না। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল- ” বাংলার হিন্দু , বাংলার বৌদ্ধ , বাংলার খ্রিস্টান , বাংলার মুসলমান – আমরা সবাই বাঙালি।”
তিনি দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন,জাতি ও ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানুষ ও বাঙালি হোন।ধর্মের সাথে ধর্মের হিংসার রাজনীতি পরিহার করে সবাই মানুষ ও বাঙালি হতে শিখুন।মনে রাখবেন – একমাত্র অন্ড কোষের ভাইরাস প্রজন্ম ও ধর্ম ব্যাবসায়ী ছাড়া বাংলা ভূখণ্ডের সকল মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙালিরা এই অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান ভাই ভাই হয়ে বসবাস করছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যারাই নষ্ট করে , তারাই হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম পশু। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে আপনি/ আপনারা কোনদিনও পশু হওয়ার শিক্ষা নিতে পারেন না। আসুন সবাই বলি – ” সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”
