ইসলামি শাসক থেকে শুরু করে গান্ধী-নেহেরু পরিবার, এমন অনেক ইতিহাস আছে যেগুলি হয় বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে অথবা গোপন করে যাওয়া হয়েছে । একদিকে মুঘলদের হানাদার তকমা ঘোঁচাতে ও হিন্দু নরসংহারের ইতিহাস মুছে ফেলে তাদের মহিমান্বিত করার ভরপুর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী সৌদি আরবের মক্কায় জন্মগ্রহণকারী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ । তার এই কাজে ভরপুর সহযোগিতা করেছে এবং আজও করেন বামপন্থী ইতিহাসকাররা । পাশাপাশি অন্যদিকে কংগ্রেস, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও জহরলাল নেহেরু সম্পর্কীয় বহু তথ্য হয় বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে অথবা গোপন করে গেছে তাদের মহিমান্বিত করার জন্য । কংগ্রেসের জমানায় জাতীয় টেলিভিশনের মাধ্যমে সেই সমস্ত বিকৃত ইতিহাস গেলানো হত সাধারণ মানুষকে ।
এমনই এক বিকৃত ইতিহাস হল, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর তথাকথিত ব্রহ্মচর্য পরীক্ষার পদ্ধতি । গুজরাটের সবরমতি আশ্রমে গান্ধীর সেই বিতর্কিত পদ্ধতি নিয়ে খোদ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন খোদ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল । লন্ডনের স্বনামধন্য সংবাদপত্র ‘দ্য টাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ৮২ বছর বয়সী গান্ধীবাদী ইতিহাসবিদ কুসুম ভাদগামা, যিনি একসময় গান্ধীকে দেবতার মতো পূজা করতেন,তিনি বলেছিলেন যে গান্ধীর তীব্র যৌন আসক্তি (“যৌন মোহ”) ছিল এবং তিনি আশ্রমে অনেক নারীর সঙ্গে নগ্ন হয়ে এক বিছানায় ঘুমাতেন। তিনি এতটাই যৌনভাবে উত্তেজিত হতেন যে, ব্রহ্মচর্য পালন এবং আত্মসংযম পরীক্ষার অছিলায়, তিনি তাঁর কাকা অমৃতলাল তুলসীদাস গান্ধীর নাতনি এবং জয়সুখলাল গান্ধীর কন্যা মনুবেন গান্ধীর সঙ্গেও এক বিছানায় শুতে শুরু করেন।
গান্ধীর এই কথিত ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেড অ্যাডামসের ‘গান্ধী: নেকেড অ্যাম্বিশন’ (Gandhi: Naked Ambition) বইটিতে ৷ বইটিতে তিনি গান্ধীকে একজন “অর্ধ-দমিত যৌন-উন্মাদ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন । যদিও কংগ্রেসের সৌজন্যে এই বইটি তেমন প্রচার পায়নি ।
‘গান্ধী: নেকেড অ্যাম্বিশন’
বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেড অ্যাডামস পনেরো বছরের ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার পর ২০১০ সালে ‘গান্ধী: নেকেড অ্যাম্বিশন’ (Gandhi: Naked Ambition) বইটি লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।বইটি গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন সময় থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত আচরণের একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে ।
বইটিতে গান্ধীকে অস্বাভাবিক যৌন আচরণ সম্পন্ন একজন “অর্ধ-দমিত যৌন-উন্মাদ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি জাতির জনকের জীবনের নারীদের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উপর বিশেষ আলোকপাত করে।
উদাহরণস্বরূপ, গান্ধী তরুণী ও নারীদের সঙ্গে নগ্ন হয়ে এক বিছানায় শুতেন এবং এমনকি নগ্ন হয়ে স্নানও করতেন। দেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় গ্রন্থাগারিক গিরিজা কুমার গান্ধী সম্পর্কিত নথিপত্রের ব্যাপক অধ্যয়ন ও গবেষণার পর প্রায় দেড় ডজন নারীর বিবরণ তুলে ধরেছেন জেড অ্যাডামস ।
প্রায় দুই দশক ধরে “মহাত্মা” গান্ধীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে থাকা নির্মল কুমার বসু তাঁর বিখ্যাত বই ‘মাই ডেজ উইথ গান্ধী’-তে উল্লেখ করেছেন, কীভাবে “জাতির জনক” সবরমতী আশ্রমে নারীদের সঙ্গে নগ্ন হয়ে ঘুমাতেন এবং তাঁর আত্মসংযম পরীক্ষার জন্য তাদের মালিশ গ্রহণ করতেন। বাংলাদেশের নোয়াখালীর একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করে নির্মল বসু লিখেছেন, “একদিন সকালে গান্ধীর শয়নকক্ষে ঢুকে দেখি সুশীলা নায়ার কাঁদছেন এবং মহাত্মা দেয়ালে মাথা ঠুকছেন।” তখন থেকেই বসু গান্ধীর ব্রহ্মচর্য পালনের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন, কিন্তু গান্ধী যখন তাঁর কথা শুনতে রাজি হননি, তখন বসু তাঁর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন।
অ্যাডামসের মতে, গান্ধী নিজেই লিখেছিলেন, “সুশীলা যখন স্নান করার সময় আমার সামনে বস্ত্রহীন হয়, আমি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলি এবং কিছুই দেখতে পাই না। আমি কেবল সাবান মাখার শব্দ শুনতে পাই। আমি বলতে পারি না কখন সে সম্পূর্ণ নগ্ন আর কখন শুধু অন্তর্বাসে আছে।”
প্রকৃতপক্ষে, যখন পাঞ্চগনিতে নারীদের সঙ্গে গান্ধীর নগ্ন হয়ে ঘুমানোর খবর ছড়াতে শুরু করে, তখন নাথুরাম গডসের নেতৃত্বে প্রতিবাদ শুরু হয়, যা গান্ধীকে তাঁর এই অভ্যাস বন্ধ করতে এবং সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। অ্যাডামস দাবি করেন যে, সুশীলা, মনু, আভা এবং গান্ধীর সঙ্গে শয়নকারী অন্যান্য নারীরা তাঁর সঙ্গে তাদের শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে সর্বদা অস্পষ্ট ও এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে কথা বলতেন এবং যখনই প্রশ্ন করা হতো, তাঁরা কেবল বলতেন যে এটি গান্ধীর ব্রহ্মচর্য নীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর, তাঁর যৌন পরীক্ষা- নিরীক্ষাগুলোও দীর্ঘ সময়ের জন্য দমন করা হয়েছিল এবং তাঁকে মহিমান্বিত করতে ও “জাতির জনক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, সেই সমস্ত নথি, তথ্য এবং প্রমাণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল যা প্রমাণ করতে পারত যে এই কথিত “সাধক” আসলে একজন “যৌন উন্মাদ” ছিলেন।
কংগ্রেসও গান্ধীর যৌন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সত্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে গোপন করে আসছে, এবং গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর মনুকে কঠোরভাবে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং গুজরাটের এক অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।সুশীলাও এই বিষয়ে নীরব ছিলেন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, গান্ধীর ব্রহ্মচর্য পরীক্ষায় জড়িত প্রায় সকল নারীর দাম্পত্য জীবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। একজন ব্রিটিশ ঐতিহাসিকের মতে, জওহরলাল নেহেরু গান্ধীকে তাঁর ব্রহ্মচর্যের কারণে একজন “অস্বাভাবিক ও অপ্রাকৃত ব্যক্তি” হিসেবে বিবেচনা করতেন। সর্দার প্যাটেল এবং জে.বি. কৃপালানি তাঁর আচরণের কারণে তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন।
গিরিজা কুমারের মতে, প্যাটেল গান্ধীর ব্রহ্মচর্যকে একটি অন্যায় কাজ বলতে শুরু করেন। এমনকি তাঁর পুত্র দেবদাস গান্ধীসহ পরিবারের সদস্য এবং অন্যান্য রাজনৈতিক সহযোগীরাও তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গভীরভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন।
বি.আর. আম্বেদকর, বিনোবা ভাবে, ডি.বি. কেলকর, ছাগনলাল যোশী, কিশোরলাল মাশ্রুওয়ালা, মথুরাদাস ত্রিকুজি, বেদ মেহতা, আর. পি. পরশুরাম এবং জয়প্রকাশ নারায়ণও গান্ধীর এই ব্রহ্মচর্য পরীক্ষার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছিলেন।এখন পর্যন্ত আমাদের তথাকথিত মহান বাপুর যে ভাবমূর্তি, তা হলো গোল ফ্রেমের চশমা পরা এক বৃদ্ধের, যিনি দুজন যুবতীকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে চলাফেরা করেন এবং গান্ধী তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এমনই এক রাজকীয় পরিবেশে ছিলেন । কিন্তু ব্যক্তি জীবন যদি কলঙ্কিত হয়,তা জানার অধিকার সাধারণ মানুষের আছে….তা সে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীই হোন না কেন । মানুষের বিশ্বাস যে একদিন না একদিন গান্ধী ও নেহেরুর প্রকৃত মূল্যায়ন হবেই ।।
