অষ্টাবক্র গীতা হল সনাতন ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত বেদান্ত শাখার অন্তর্গত একটি সংস্কৃত গ্রন্থ, যা পাঠককে কিছু মূল ধারণা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয় যে এটি ঋষি অষ্টাবক্র রচনা করেছেন এবং এটি তাঁর ও মিথিলার রাজা জনকের মধ্যে একটি কথোপকথনের আকারে উপস্থাপিত হয়েছে।
অষ্টাবক্র গীতার প্রথম অধ্যায় (সাক্ষাৎকার/আত্মোপদেশ) ঋষি অষ্টাবক্র এবং রাজা জনকের মধ্যকার একটি অদ্বৈতবাদী সংলাপ। এখানে জনক জ্ঞান, মুক্তি ও বৈরাগ্যের উপায় জানতে চান, যার উত্তরে অষ্টাবক্র বিষয়সমূহকে বিষের মতো ত্যাগ করে ক্ষমা, সরলতা ও সত্যকে অমৃতের মতো গ্রহণ করতে বলেন । এটি আত্মোপলব্ধি ও অদ্বৈতবাদের মূল দর্শন।এই অধ্যায়টি মানুষের ভেতরের দেবত্ব উপলব্ধি করতে অহিংসা, সত্য, সরলতা, দয়া ও আত্ম-সচেতনতার ওপর জোর দেয়৷
॥ অথ শ্রীমদষ্টাবক্রগীতা প্রারভ্যতে ॥
জনক উবাচ ॥
কথং জ্ঞানমবাপ্নোতি কথং মুক্তির্ভবিষ্যতি ।
বৈরাগ্যং চ কথং প্রাপ্তমেতদ্ ব্রূহি মম প্রভো ॥ 1-1॥
জনক: জ্ঞান কীভাবে অর্জন করতে হয়? মুক্তি কীভাবে লাভ করতে হয়? আর বৈরাগ্য কীভাবে অর্জন করা যায়? আমাকে এ বিষয়ে বলুন, প্রভু।
অষ্টাবক্র উবাচ ॥
মুক্তিমিচ্ছসি চেত্তাত বিষয়ান্ বিষবত্ত্যজ ।
ক্ষমার্জবদয়াতোষসত্যং পীয়ূষবদ্ ভজ ॥ 1-2॥
ন পৃথ্বী ন জলং নাগ্নির্ন বায়ুর্দ্যৌর্ন বা ভবান্ ।
এষাং সাক্ষিণমাত্মানং চিদ্রূপং বিদ্ধি মুক্তয়ে ॥ 1-3॥
যদি দেহং পৃথক্ কৃত্য চিতি বিশ্রাম্য তিষ্ঠসি ।
অধুনৈব সুখী শান্তো বংধমুক্তো ভবিষ্যসি ॥ 1-4॥
ন ত্বং বিপ্রাদিকো বর্ণো নাশ্রমী নাক্ষগোচরঃ ।
অসংগোঽসি নিরাকারো বিশ্বসাক্ষী সুখী ভব ॥ 1-5॥
ধর্মাধর্মৌ সুখং দুঃখং মানসানি ন তে বিভো ।
ন কর্তাসি ন ভোক্তাসি মুক্ত এবাসি সর্বদা ॥ 1-6॥
একো দ্রষ্টাসি সর্বস্য মুক্তপ্রায়োঽসি সর্বদা ।
অয়মেব হি তে বংধো দ্রষ্টারং পশ্যসীতরম্ ॥ 1-7॥
অহং কর্তেত্যহংমানমহাকৃষ্ণাহিদংশিতঃ ।
নাহং কর্তেতি বিশ্বাসামৃতং পীত্বা সুখং চর ॥ 1-8॥
একো বিশুদ্ধবোধোঽহমিতি নিশ্চয়বহ্নিনা ।
প্রজ্বাল্যাজ্ঞানগহনং বীতশোকঃ সুখী ভব ॥ 1-9॥
যত্র বিশ্বমিদং ভাতি কল্পিতং রজ্জুসর্পবত্ ।
আনন্দপরমানন্দঃ স বোধস্ত্বং সুখং ভব ॥ 1-10॥
মুক্তাভিমানী মুক্তো হি বদ্ধো বদ্ধাভিমান্যপি ।
কিংবদন্তীহ সত্যেয়ং যা মতিঃ সা গতির্ভবেত্ ॥ 1-11॥
আত্মা সাক্ষী বিভুঃ পূর্ণ একো মুক্তশ্চিদক্রিয়ঃ ।
অসংগো নিঃস্পৃহঃ শান্তো ভ্রমাত্সংসারবানিব ॥ 1-12॥
কূটস্থং বোধমদ্বৈতমাত্মানং পরিভাবয় ।
আভাসোঽহং ভ্রমং মুক্ত্বা ভাবং বাহ্যমথাংতরম্ ॥ 1-13॥
দেহাভিমানপাশেন চিরং বদ্ধোঽসি পুত্রক ।
বোধোঽহং জ্ঞানখড়্গেন তন্নিকৃত্য সুখী ভব ॥ 1-14॥
নিঃসঙ্গো নিষ্ক্রিয়োঽসি ত্বং স্বপ্রকাশো নিরঞ্জনঃ ।
অয়মেব হি তে বন্ধঃ সমাধিমনুতিষ্ঠসি ॥ 1-15॥
ত্বয়া ব্যাপ্তমিদং বিশ্বং ত্বয়ি প্রোতং যথার্থতঃ ।
শুদ্ধবুদ্ধস্বরূপস্ত্বং মা গমঃ ক্ষুদ্রচিত্ততাম্ ॥ 1-16॥
নিরপেক্ষো নির্বিকারো নির্ভরঃ শীতলাশয়ঃ ।
অগাধবুদ্ধিরক্ষুব্ধো ভব চিন্মাত্রবাসনঃ ॥ 1-17॥
সাকারমনৃতং বিদ্ধি নিরাকারং তু নিশ্চলম্ ।
এতত্তত্ত্বোপদেশেন ন পুনর্ভবসংভবঃ ॥ 1-18॥
যথৈবাদর্শমধ্যস্থে রূপেঽংতঃ পরিতস্তু সঃ ।
তথৈবাঽস্মিন্ শরীরেঽংতঃ পরিতঃ পরমেশ্বরঃ ॥ 1-19॥
একং সর্বগতং ব্যোম বহিরংতর্যথা ঘটে ।
নিত্যং নিরন্তরং ব্রহ্ম সর্বভূতগণে তথা ॥ 1-20॥
।। প্রথম অধ্যায় ।।
জনক জিজ্ঞাসেন …..
কেমনে জ্ঞান মিলবে বলো ওগো মোর গুরু,
বলো কেমন করে কোথায় হবে মোর মুক্তি শুরু ??
কেমনে আসিবে ত্যাগ হবো বৈরাগী ,
বুঝিয়ে দাও সহজ করে এই ভিক্ষা মাগি !!
জনকরাজে কহেন তখন অষ্টবক্র মুনি ,
মুক্তি খুঁজে বেড়াও কেন মোহের জাল বুনি !
ত্যাগ করো এই ইন্দ্রিয়সুখ তাহে জেনো বিষ,
ধৈর্য, শ্রম,দয়া, তৃপ্তি – সত্যের আশীষ ।।
নহ তুমি ক্ষিতি/অপ/মরুৎ/তেজ/ব্যোম,
মুক্ত রবে হলে এ পঞ্চ-তত্ত্বের সাক্ষী পরম ।।
বিবেকচেতনা তোমার দেহ হতে ভিন্ন,
তাহাই মুক্তি, তাহাই সুখ মায়া হতে বিচ্ছিন্ন ।।
নহ তুমি ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় জাতেতে ,
নহ দৃশ্য বা কোনো স্তর এ মিথ্যা জগতে ।।
সাক্ষী তুমি হলেও সাক্ষীর নেইকো কোনো রূপ ,
সুখ এখনি এইখানে জেনো গো অরূপ !!
ঠিক কিম্বা বেঠিক সবই এই মনের-ই হাল,
সুখ দুঃখ কান্না হাঁসি সবই মায়ার জাল ।।
ঘটনাচক্রেতে তুমি দিওনাকো ধরা ,
কর্তাও নয়,ভোক্তাও নয়,মুক্ত জলের ধারা ।।
সাক্ষীভাবে মুক্ত থাকো সাক্ষীর নেই জোড়,
বন্ধনে না বেঁধো নিজেরে – নেইকো ইহার তোড় ।।
বিশ্লষণে ভাবো তুমি কর্ত্তা হলাম আমি ,
সাপের মতো এ ভাবনা বাঁধে হাসেন অন্তর্যামি ।।
এ অজ্ঞানতার ভাবনা তোমার কল্পনার-ই রূপ ,
সহজেই জেনে নাও এবার তোমার নিজ চৈতন্য-স্বরূপ
কর্ম করেও কর্তা যে নও এইটুকু কেবল জেনো ,
পূর্ণচৈতন্য বলিয়া তুমি আপনারে মেনো ।।
রজ্জুকে সর্প তূমি ভেবেছিলে কখনো,
এখন যাহা যেমন তারে তেমন করেই চেনো ।।
সেই চেতনা – আত্মজ্ঞান যেমনি তূমি পেলে ,
ছিলে দুঃখী এখন আনন্দস্বরূপ হলে ।।
মুক্ত আমি ভাবলে পরে মুক্তি তুমি পাবে ,
বদ্ধ – এ চিন্তা করলে পরে বাঁধাই পড়ে রবে ।।
মনেই মুক্তি মনই বন্ধন – খুব ই খাঁটি কথা ,
এ মনেই থাকে সুখ- দুঃখ সকল হাসি ব্যাথা ।।
সব বাসনাশূন্য তুমি- যেন এক নিখুঁত মুক্তো,
কভু কোনো কর্মকান্ডে ছিলেনা তুমি যুক্ত ।।
শান্তি তুমি – বুদ্ধ তুমি – শুদ্ধ তূমি ওম্ ,
আত্মা তূমি চৈতন্যে তূমিই পরম ।।
ধ্যানে ধরো অদ্বৈত নিশ্চল আর আদি ,
দ্বৈতবোধের নেই অস্তিত্ব তুমিই সেই অনাদি ।।
ভিতর বাহির সব মিথ্যা নয়তো ক্ষণজন্মা ,
ছিলে তুমি – থাকবে তুমি – তূমি যে অজন্মা ।।
বহুকাল ধরে ছিলে দেহের ভাবে বদ্ধ ,
এবার জানো নয়কো দেহ – তুমি অপাপবিদ্ধ ।।
দেহবোধকে কাটো নিয়ে ছুরির সমান জ্ঞান ,
আনন্দে নিবাস করো পরমানন্দ মহান ।।
সত্যই তুমি সদামুক্ত কর্মবোধ থেকে ,
নিরঞ্জন নিজের প্রদীপ নিজেরে আলো দিতে ।।
মন তোমারে যখন তখন এখান ওখান ঘুরায়,
বদ্ধ তুমি কেবল মনমধ্যে , সেই তোমারে ছোটায় ।।
তুমি যে চেতনা তবু ভ্রান্তিতে নিজেরে ভাব এ মন ,
সেই ছোট্ট মনের ধারনাতেই বদ্ধ আজীবন ।।
তুমি নিঃস্বার্থ , আদি ও অকৃত্রিম ,, নিশ্চল অরূপ তুমি , বাধাবন্ধহীন ।।
শুদ্ধ চৈতন্য তুমি তোমার নিজমধ্যে বাস ,
করোনা তো ভিতরে বা বাহিরে নিবাস ।।
যাহাকিছু দেখ তুমি সব-ই মিথ্যা বলে জেনো ,
এ জ্ঞানে আসিয়া সকল মায়া বলিয়াই মেনো ।।
পরমেশ্বর দর্পণসম প্রতিবিম্বে ভরা ,
তবু ওই প্রতিবিম্বে তো নয় সেই দর্পণ ধরা ।।
দর্পণেরই মধ্যে ছবি – সে তো নয় আলাদা অস্তিত্ব ,
তবু সে ছবি নয় দর্পণ ইহাই অতি সত্য ।।
পাত্রভিতর পাত্রবাহির শূণ্য দিয়ে ভরা ,
সেইরূপ সকলি ধরিয়া নিজে থাকো যে অধরা ।।
