বাংলাদেশের লোকসংগীতের একটি পরিচিত নাম ‘কাঙালিনী সুফিয়া’ । যাঁর কণ্ঠ একসময় মুগ্ধ করেছিল গ্রাম থেকে শহরের প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমীকে । যাঁর গান বাংলাদেশের ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল । এহেন এক গুণী শিল্পির ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পরবর্তী জীবন হয়ে ওঠে বিষময় । এক গভীর বেদনা,দারিদ্র্য, অবহেলা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের করুণ বাস্তবতাবতার মুখোমুখি হয়ে এই শিল্পী আজ হয়ে পড়েছেন সুরহীন । হ্যাঁ… ‘কাঙালিনী সুফিয়া’ জন্মসূত্রে ছিলেন হিন্দু পরিবারের কন্যা “অনিতা হালদার” । বৈষ্ণব আখড়ায় এসে হন “অনিতা ক্ষেপী” ৷ পরে ধর্মান্তরিত হয়ে “সুফিয়া খাতুন” থেকে ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে আজকে ‘কাঙালিনী সুফিয়া’য় উত্তরণ৷ এই শিল্পী আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থতা, অভাব এবং নিঃসঙ্গতার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন ।
আজকের ‘কাঙালিনী সুফিয়া’র জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামের এক হিন্দু পরিবারে । হতদরিদ্র কমলা হালদার ও খোকন হালদারের তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি । নাম ছিল অনিতা হালদার। তিনি টুনি হালদার নামেও পরিচিত ছিলেন, আর পরিবারে তাঁর ডাকনাম ছিল বুচি। জেলে পরিবারের চরম অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হওয়া অনিতার শৈশব থেকেই ছিল গানের প্রতি অদম্য আকর্ষণ । ছোটবেলা থেকেই পাশের সোনাপুরের বৈষ্ণব আখড়ায় যাতায়াত ছিল অনিতার। সেখানে ভক্তিমূলক পরিবেশ, পল্লিগান, বৈষ্ণব সঙ্গীত-সবকিছুই তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত। ক্রমে গান তাঁর কাছে শুধু বিনোদন নয়, হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা । একবার শুনেই গান মনে রাখার বিরল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন অনিতা । কিন্তু এই সঙ্গীতপ্রতিভার বিকাশের আগেই তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘন কালো অন্ধকার।
খুব অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয় সুধীর হালদারের সঙ্গে। সেই দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। স্বামীর শারীরিক নির্যাতন, অপমান এবং অশান্তি তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে । একসময় তিনি কন্যা পুষ্পকে নিয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে ফিরে আসেন। এই সময়ই তাঁর জীবনে আসে নতুন মোড় । তিনি আশ্রয় নেন বৈষ্ণব আখড়ায়। সেখানে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং প্রায় পাঁচ বছর সোনাপুর আশ্রমে কাটান। এই সময় তাঁর নাম বদলে হয় ‘অনিতা ক্ষেপী’। বৈষ্ণব সাধনা, গানের চর্চা এবং আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজের ভাঙা জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। দেবেন ক্ষ্যাপা ও গৌর মোহন্তের মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে তিনি বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের পাঠ নেন। একজন হিন্দু কন্যা হিসেবে, বৈষ্ণব আখড়ার আশ্রয়ে, সুর আর সাধনাতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের পুনর্জন্ম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অস্থিরতার সময়ে সেই আশ্রয়ও নিরাপদ থাকেনি। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় বৈষ্ণব আখড়া বিধ্বস্ত হলে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। তিনি সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলায়।
সেখানকার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তিনি গান গেয়ে যোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতেন । সেই সময় তাঁর পরিচয় হয় মুক্তিযোদ্ধা মান্দার ফকিরের সঙ্গে। স্বাধীনতার পর অনিতা ক্ষেপী মান্দার ফকিরের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যান। আর সেখানেই তাঁর জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত পরিবর্তন ঘটে-তিনি ধর্মান্তরিত হন।
একসময় বৈষ্ণব আখড়ার “অনিতা ক্ষেপী”, যিনি হিন্দু আধ্যাত্মিক পরিবেশে নতুন করে নিজের জীবন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন, সেই তিনিই মান্দার ফকিরকে বিয়ে করতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম বদলে হয় ‘সুফিয়া খাতুন’। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন তার এই সিদ্ধান্ত নতুন জীবনের দরজা খুলে দেবে, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত তাঁকে ঠেলে দেয় গভীর অন্ধকারে । তারপর জীবনে তিনি সুখ পাননি। এই বিয়েও বেশিদিন টেকেনি। সংসার ভেঙে যায়। জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান, স্থিতি-কিছুই স্থায়ী হয়নি। বরং ধর্মান্তরের পর তাঁর জীবন আরও অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা ও দুঃখে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
জন্মপরিচয় হারিয়ে, পুরোনো আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, নতুন পরিচয়ে স্থায়ী নিরাপত্তা না পেয়ে তিনি যেন দুই জগতের মাঝখানে এক অন্তহীন শূন্যতায় ভেসে বেড়াতে থাকেন । অনিতা হালদার হিসেবে তিনি ছিলেন এক হিন্দু পরিবারের মেয়ে। অনিতা ক্ষেপী হিসেবে ছিলেন বৈষ্ণব সাধনার অংশ। দারিদ্র ছিল ঠিকই,তবে শান্তি ছিল । কিন্তু সুফিয়া খাতুন হিসেবে তিনি নতুন পরিচয় নেওয়ার পর তাঁকে না দিয়েছে নিশ্চিন্ত সংসার, না দিয়েছে স্বস্তির জীবন। বরং আজীবন তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে অভাব, অবহেলা অসুস্থতা ও একাকীত্বের বিরুদ্ধে।
পরে সমসাময়িক শিল্পীদের পরামর্শে ১৯৭৬ সালের দিকে তিনি মেয়ে পুষ্পকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। রাজধানীর বাড্ডার শাহাজাদপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন।হাইকোর্টের মাজারের “মজমা”য় নিয়মিত গান গাইতেন। সেখানেই একদিন তাঁর অসাধারণ কণ্ঠে মুগ্ধ হন কবি আসাদ চৌধুরী। পরে বাংলা একাডেমিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়, এবং সেখান থেকেই এক অর্থে মূলধারার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি পান এই শিল্পী। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিদেশ সফরের তালিকায় নাম ওঠে তাঁর। তাঁর দুরবস্থার কথা শুনে এরশাদ তাঁকে ‘কাঙালিনী’ নাম দেন। সেই থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ‘কাঙালিনী সুফিয়া’।
কিন্তু নামের খ্যাতি জীবনের দুঃখ মুছে দেয়নি। ‘কাঙালিনী’ নামটি যেন তাঁর জীবনের বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করেছে। গান তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে, মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে, ইতিহাসে জায়গা দিয়েছে-কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, সম্মানজনক জীবনযাপন বা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা খুব কমই দিয়েছে। আজও তিনি কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপসহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এই প্রবীণ শিল্পী। তীব্র সমস্যায় ভুগছেন এই প্রবীণ শিল্পী। প্রতি মাসে তাঁর ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ প্রয়োজন। চিকিৎসক তাঁকে পুষ্টিকর খাবার, দুধ, ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- অনেক দিন তাঁর ঘরে চুলাও জ্বলে না।সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো যে যিনি একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে সাহস জুগিয়েছেন, যিনি লোকসংগীতকে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, যিনি পরিচয়ের পর পরিচয় বদলিয়েও বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন-আজ সেই মানুষটিই জীবনসায়াহ্নে চরম দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন । তাঁর পাশে আছে কেবল তাঁর গান আর তাঁর একমাত্র মেয়ে পুষ্প। পুষ্পও মায়ের মতোই সঙ্গীত শিল্পী, গান করেন। কিন্তু এই মা-মেয়ের জীবন এখনো কঠিন সংগ্রামের।
কাঙালিনী সুফিয়ার জীবন তাই শুধু একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি এক নারীর বহুবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর জ্বলন্ত ইতিহাস। এটি এক হিন্দু কন্যার বৈষ্ণব সাধনায় আশ্রয় নেওয়ার ইতিহাস, ধর্মান্তরিত হয়ে নতুন জীবনের সন্ধান করতে গিয়ে আরও দুঃখে জড়িয়ে পড়ার ইতিহাস, এবং শেষ পর্যন্ত খ্যাতির আড়ালে নিঃস্ব হয়ে পড়ে থাকার ইতিহাস। জন্মসূত্রের অনিতা হালদার হয়তো হারিয়ে গেছেন সময়ের স্রোতে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই বেদনা আজও বেঁচে আছে ‘কাঙালিনী সুফিয়া’ নামের মধ্যে ।।
