এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০৯ মার্চ : ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলায় প্রথম দিনেই মৃত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর পুত্র মোজতবা খামেনেইকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের তৃতীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, যদিও তার কণ্ঠস্বর এবং ভাবমূর্তি অনেক ইরানির কাছে অজানা । কেউ কেউ দাবি করছেন মৃত আলী খামেনীর থেকে আরও বেশি উগ্র ইসলামি মতাদর্শে বিশ্বাসী তার ছেলে । একজন এক্স ব্যবহারকারী ইরানি (@hadimehrane1) লিখেছেন, ‘আচ্ছা, আমি স্বস্তি বোধ করছি । আমার একমাত্র উদ্বেগ ছিল যে ইসলামী প্রজাতন্ত্র অন্য কাউকে তার নেতা হিসেবে বেছে নেবে, তাহলে হয়তো তারা পাতা উল্টে দিত, কিন্তু মোজতবার নেতৃত্ব ঘোষণার সাথে সাথে এবং যেমনটি আমি আগের টুইটে বলেছিলাম, ইসলামী প্রজাতন্ত্র নিজেকে নিজেকে গুলি করেছে, নিজের পতন ডেকে এনেছে । চোর, জারজ যে আলো নিভিয়ে বেশিরভাগ খুন এবং দমন-পীড়ন চালিয়েছে, সেই মোজতবা এখন নেতা হয়ে উঠেছে, তার বাবার চেয়েও নোংরা, আরও খুনি এবং আরও জারজ। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমাপ্তি আনুষ্ঠানিকভাবে এসে গেছে।’ এদিকে ইসরায়েল বলেছে,’ওকেও মারার জন্য আমরা তৈরি’ ।
যদিও সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরেই ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে “আলিয়ান ওলিয়্যাল্লাহ” নামে একটি অভিযান ঘোষণা করেছে মোজতবা খামেনেই । সেই অভিযানে তরল ও কঠিন জ্বালানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের নতুন ব্যারেজ নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । এই ঘোষণাটি শিয়া বিশ্বাসকে নির্দেশ করে যে ইসলামের নবী মহম্মদ গাদিরের ঘটনার পর তাঁর জামাতা আলীকে তাঁর বৈধ উত্তরসূরি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। এদিকে ইরানের তৈরি অত্যন্ত উন্নত ও বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খোররামশাহর, ফাত্তাহ এবং খেইবার ও ড্রোন সহ তরল ও কঠিন জ্বালানি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি নতুন ব্যারেজ চালু করার ঘোষণা করেছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) ।
৫৬ বছর বয়সী মোজতোবা খামেনিকে রবিবার যুদ্ধের পরবর্তী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দেশটির ধর্মীয় নেতারা তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছে।আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতোবাকে দীর্ঘদিন থেকেই তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ভাবা হচ্ছিল; যাকে মোটেই পছন্দ নয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের।যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে নতুন নেতা নির্বাচন করল সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেছে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’। এখন নতুন নেতা মোজতোবাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্যে যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে রবিবার তেহরান সময় মধ্যরাতের ঠিক পরেই ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) বিবৃতিতে নতুন নেতা নির্বাচনের ঘোষণা করে । এতে বলা হয়, বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্ধারণমূলক ভোটের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতোবা হোসাইনি খামেনিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তৃতীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হল ।এই পদমর্যাদা ও দায়িত্ব মোজতোবাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে।এ বিষয়ে রয়টার্স মন্ত্যবের জন্য যোগাযোগ করলেও হোয়াইট হাউজের তরফে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পায়নি।
তবে মনে করা হচ্ছে যে মোজতোবাকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রোধকে আরও উসকে দিতে পারে। কারণ রবিবারই ট্রাম্প বলেছিলেন ইরানের নেতা নির্বাচনে ওয়াশিংটনের মতামত নেওয়া উচিত।তিনি এবিসি নিউজকে বলেন, “তিনি (নতুন সর্বোচ্চ নেতা) যদি আমাদের থেকে অনুমোদন না পায়, তবে সে বেশিদিন টিকবে না।”
নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণার আগেই ইসরায়েল হুমকি দিয়েছে, যাকেই নির্বাচিত করা হোক না কেন তাকে মেরে ফেলবো ।
সপ্তাহ খানেক আগে শনিবার যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানে হামলা শুরুর প্রথমদিকেই মোজতবার বাবা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তিনি ৩৭ বছর ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। সেদিন হামলায় খামেনির স্ত্রী, মোজতোবার স্ত্রী ও এক বোন নিহত হন। ওই ঘটনাস্থলে মোজতবা ছিলেন না বলে প্রাণে বেঁচে যান। বাবার ছায়ায় থাকা মোজতোবাকে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পরবর্তী নেতা ধরে নিয়েছিল । তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে বলে মনে করে খামেনি অনুসারীদের।তার পেছনে সমর্থন রয়েছে দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীরও (আইআরজিসি) । ইরানে খুবই প্রভাবশালী এই বাহিনীতে মোজতোবার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তবে তার বিষয়ে সমালোচকরা বলছেন, বড় মাপের আলেম না হয়েও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে মোজতোবার আরোহনের পেছনে ভূমিকা রয়েছে আইআরজিসির।
মোজতোবা বেশির ভাগ সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকেছেন, সরকারি কোনো দায়িত্বেও ছিলেন না; তার বক্তৃতার সংখ্যাও বিরল, গণমাধ্যমে তাকে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকবার। কিন্তু ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোতে তার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত।
নতুন নেতা নির্বাচনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সদস্য হায়দারি আলে কাসির বলেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার আগে দেওয়া পরামর্শের ভিত্তিতেই এই প্রার্থীকে বেছে নেওয়া হয়েছে। খামেনির সেই পরামর্শ ছিল—ইরানের শীর্ষ নেতাকে শত্রুর দ্বারা প্রশংসিত হওয়ার বদলে তাদের কাছে ‘ঘৃণিত হতে হবে’।
এখন পর্যন্ত আলী খামেনীর দ্বিতীয় পুত্রের একটি ভিডিও ফাইল প্রকাশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে ; আইনশাস্ত্র ও নীতিমালার উপর তার ক্লাসের সাথে সম্পর্কিত একটি ভিডিও। এই ভিডিওটি মুজতবা খামেনীর আইনশাস্ত্র ও নীতিমালার উপর অনলাইন ক্লাস থেকে রেকর্ড করা হয়েছে।ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সাথে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রথম দিনে আলী খামেনির হত্যার পর, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় নেতা হিসেবে তার নির্বাচন ঘোষণার পর, একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলও তার নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বক্তব্য রাখার একটি অডিও ফাইল প্রকাশ করা হয়েছে । ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রথম নেতা রুহুল্লাহ মুসাভি খোমেনি, নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নেতা হওয়ার আগে, আলী খামেনি তেহরানে শুক্রবারের নামাজের ইমামতি করার পাশাপাশি, জনগণের ভোটে দুই মেয়াদের জন্য ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।তবে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় নেতা এতটাই অজানা যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত মিডিয়াতে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত প্রথম তথ্যচিত্রে তাঁর মাত্র কয়েকটি ছবি দেখানো হয়েছিল ।।
