সিপিএমের প্রয়াত নেতা সীতারাম ইয়েচুরি ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ৭২ বছর বয়সে প্রয়াত হন । ইয়েচুরির মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত জীবন বেশ চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় । দাবি করা হয় যে সীতারাম ইয়েচুরি জন্মসূত্রে একজন ক্রিপ্টো খ্রিস্টান (Crypto-Christian) ছিলেন । আসলে ক্রিপ্টো-খ্রিস্টান বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝায় যারা গোপনে খ্রিস্টান ধর্ম বা বিশ্বাস অনুসরণ করেন কিন্তু বাহ্যিকভাবে অন্য কোনো ধর্ম বা সংস্কৃতি মেনে চলেন । এটাও দাবি করা হয় যে তার দ্বিতীয় স্ত্রী সীমা চিস্তি একজন মুসলিম হওয়ায় সীতারাম ইয়েচুরি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন,কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে হিন্দু নাম ধারনই করতেন । সমগ্র বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাবে চর্চিত হয় । যদিও এযাবৎ কেউই ওই সমস্ত দাবির সপক্ষে প্রামাণ্য নথি পেশ করতে পারেননি ।
সীতারাম ইয়েচুরির মৃত্যুর পর ঋষি বাগরি নামে একজন ব্যক্তি টুইট করেছিলেন । যেখানে তিনি একটি ছবি পোস্ট করেন । ছবিটি হল,কফিনবন্দি সীতারাম ইয়েচুরির দেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা সিপিএমের নেতাকর্মীদের । তিনি ক্যাপশনে লিখেছিলেন,’তাহলে সীতারাম ইয়েচুরি একজন খ্রিস্টান ছিলেন, তাই তিনি হিন্দু ধর্মকে ঘৃণা করতেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যাইহোক, কেন তারা তাদের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে তাদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে ?’ আর একজন টুইট করেন, ‘না, তাকে কফিনে পেরেক দিয়ে আটকানো হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন ক্রিপ্টো খ্রিস্টান। সকল কমরেড এবং লাল সালাম কমিদের এটাই বাস্তবতা।’
জীতেন্দ্র প্রতাপ সিং নামে একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন,’সীতারাম ইয়েচুরি মুসলিম মহিলা সীমা চিস্তিকে বিয়ে করার পর নিজের নাম পরিবর্তন না করেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তার ছেলের নাম রাখেন দানিশ এবং মেয়ের নাম রাখেন আকিলা…তিনি চীন ও ইসলামের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি যদি তার নাম থেকে “সীতা রাম” বাদ দিয়ে “মোহাম্মদ কনফুসিয়াস ইয়েচুরি” নামটি গ্রহণ করতেন তবে ভালো হতো। তবে, বামপন্থীদের মধ্যে আখ্যান সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতএব, “সীতা রাম” শব্দটি অনিবার্যভাবে হিন্দু জনসাধারণকে প্রতারিত করার জন্য একটি আখ্যান তৈরি করবে…।’
তিনি আরও লিখেছিলেন,’এটা তার দুর্ভাগ্য যে, সারা জীবন রাম মন্দির আন্দোলনের বিরোধিতা করার পরেও, অযোধ্যায় রাম জন্মভূমি মন্দির নির্মাণ ও পবিত্রকরণ প্রত্যক্ষ করার পর তিনি শেষ পর্যন্ত মারা যান…বেচারা লোকটি বলতেন যে সমস্ত হিন্দু ধর্মগ্রন্থ নারীদের বিরুদ্ধে হিংসায় পরিপূর্ণ। তিনি হিন্দুদের হিংস্রতা প্রমাণ করার জন্য রামায়ণ এবং মহাভারতের উদাহরণ দিতেন। ২০১৭ সালে ডোকলাম বিরোধের সময়, তিনি এমনকি চীনের পক্ষ নিয়ে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধির অভিযোগও করেছিলেন। গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষের সময়ও, তার দল প্রকাশ্যে চীনের পক্ষে ছিল…চীন অসংখ্য পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, কিন্তু তারা বিশ্ব শান্তির জন্য কোনও হুমকি দেখেনি। তবে, যখন ভারত পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে, তখন তারা তীব্রভাবে এর বিরোধিতা করেছে। নেপালকে আবার হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণার দাবি দমনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন যে হিন্দু উৎসবগুলি সামন্তবাদী এবং বর্ণবাদী মানসিকতাকে উৎসাহিত করে। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, কিন্তু রাম মন্দির এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন তিনি সামলাতে পারেননি… ঈশ্বর তাকে স্বর্গ দান করুন!! অমিত স্বর্ণকার ।’
উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, সীতারাম ইয়েচুরির জন্ম ১৯৫২ সালের ১২ আগস্ট মাদ্রাজের একটি তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে । তাঁর বাবা সর্বেশ্বর সোমায়াজুলা ইয়েচুরি এবং মা কল্পকম ইয়েচুরি ছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাড়ার বাসিন্দা । তাঁর বাবা অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের একজন প্রকৌশলী ছিলেন । তাঁর মা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং ২০২১ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাকিনাড়ায় বসবাস করতেন।
ইয়েচুরি হায়দ্রাবাদে বেড়ে ওঠেন এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত হায়দ্রাবাদের অল সেন্টস হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৯ সালের তেলঙ্গানা আন্দোলন তাকে দিল্লিতে নিয়ে আসে। তিনি নয়াদিল্লির প্রেসিডেন্টস এস্টেট স্কুলে যোগদান করেন এবং সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বভারতীয় প্রথম স্থান অর্জন করেন । পরবর্তীকালে, তিনি দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং উভয় বিষয়েই প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন। তিনি অর্থনীতিতে পিএইচডি করার জন্য জেএনইউতে যোগদান করেন, যা জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তারের সাথে সাথে অপূর্ণ থেকে যায় ৷
ইয়েচুরি ১৯৭৪ সালে স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই)-এ যোগদান করেন। এক বছর পর, তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-এ যোগদান করেন । তিনি ছিলেন এসএফআই-এর প্রথম সভাপতি যিনি কেরালা বা বাংলার ছিলেন না।
সীতারাম ইয়েচুরির প্রথম বিয়ে হয়েছিল বিখ্যাত নারীবাদী বীণা মজুমদারের কন্যা ইন্দ্রাণী মজুমদারের সাথে । তাদের দুটি সন্তান ছিল, আখিলা নামে একটি মেয়ে এবং আশীষ নামে একটি ছেলে। আখিলা ইয়েচুরি, ইতিহাসের একজন অধ্যাপক এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান । ছেলে আশিস ইয়েচুরি ২০২১ সালের ২২ এপ্রিল ৩৪ বছর বয়সে কোভিড-১৯- এর কারণে মারা যান । অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্য সচিব, আইএএস মোহন কান্দা হলেন সীতারাম ইয়েচুরির মামা।
ইন্দ্রাণী মজুমদারের বিবাহবিচ্ছেদের পর সাংবাদিক সীমা চিশতিকে বিয়ে করেন সীতারাম ইয়েচুরি, যিনি বামপন্থী মিডিয়া আউটলেট দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পূর্বে বিবিসি হিন্দি সার্ভিসের দিল্লির সম্পাদক ছিলেন। তিনি দিল্লিতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আবাসিক সম্পাদক ছিলেন । ইয়েচুরি স্কুপহুপের একটি পর্বে বলেছিলেন যে তার দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে আর্থিকভাবে ভরণপোষণ করেছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে সীতারাম ইয়েচুরির দুই সন্তান রয়েছে…. ছেলে দানিশ এবং মেয়ে আকিলা ।।
