প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান,১৭ জানুয়ারী : বাংলা সাহিত্যের দুনিয়ায় চির অমর হয়ে আছে কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘দেবদাস’ উপন্যাস। সেই উপন্যাসের দেবদাস মিষ্টান্নের ভক্ত ছিলেন কিনা তা অবশ্য আজও কারুর জানা যায় নেই। তবে ’দেবদাস’ উপন্যাসকে আঁকড়ে পূর্ব বর্ধমানের কালনার ’হাতিপোতা’ গ্রাম চলা দেবদাস স্মৃতি মেলা প্রাঙ্গন শুধুই যেন মিষ্টি ময় । তাও আবার যে সে মিষ্টি নয়। পাঁচশো টাকা থেকে শুরু করে দু’হাজার টাকা পিস দরের এক একটা পেল্লাই মিষ্টি মেলায় বিক্রি হচ্ছে । যার স্বাদ নিতে বহু মানুষের ভিড় উপচে পড়ছে মেলা প্রাঙ্গনে। শীতের কঠিন ঠাণ্ডার মধ্যেও বিক্রি বাটা ভালো হওয়ায় দেবদাসের নামে জয়ধ্বনিও পড়ছে মেলা প্রাঙ্গনে। ওই বিশালাকৃতির মিষ্টান্নের নামকরণ করা হয়েছে, “নোড়া পান্তুয়া” ।
’হাতিপোতা’ গ্রামটি পূর্ব বর্ধমানের জেলার কালনা-১ ব্লকের নান্দাই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত। এলাকার মানুষেজন মনে করেন,’কথাসাহাত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই ’হাতিপোতা’ গ্রাম থেকেই দেবদাস উপন্যাস লেখার রসদ খুঁজে পেয়েছিলেন
। সেই বিশ্বাসে ভর করেই ’দেবদাস’ কে চিরস্মরণীয় করে রাখতে হাতিপোতা গ্রামের মানুষজন প্রতি বছর ‘দেবদাস স্মৃতিমেলা ও উৎসব’-এর আয়োজন করে থাকেন । এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি ।শরৎচন্দ্রের ছবিতে মালা পরিয়ে ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুক্রবার রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এবং সায়নী ঘোষ ২৬ তম বর্ষের ’দেবদাস স্মৃতি মেলার’ উদ্বোধন করেন। মেলা আগামী পাঁচ দিন চলবে।দেবদাস স্মৃতি মেলা ঘিরে এখন মাতোয়ারা গোটা হাতিপোতা গ্রাম। আয়োজকরা জানিয়েছেন,এবছর বাংলার বিশিষ্ঠ অভিনেতা তথা তৃণমূল সাংসদ দেব এই মেলা দেখতে হাতিপোতা গ্রামে আসতো পারেন ।
উৎসব আয়োজকদের পক্ষে রেজাউল মোল্লা এদিন জানান,কথা সাহিত্যিকের ‘দেবদাস’ উপন্যাসে অন্তিম অনুরোধ ছিল-’তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও’ । সেই প্রার্থনাতে সাড়া দিয়েই তাঁরা প্রতিবছর উপন্যাসিকের ’প্রয়াণ’ দিবসের দিনটিকে স্নরণ করে দেবদাস স্মৃতি মেলা ও উৎসবের আয়োজন করে থাকেন। রেজাউলের কথা অনুযায়ী,’উপন্যাসে উল্লিখিত জমিদার বাড়ির সব স্মৃতি আজ আর সম্পূর্ণ রুপে না থাকলেও আংশিক কিছুটা রয়ে গেছে । সেই টানেই সাহিত্য প্রেমী ও পর্যটকরা আজও হাতিপোতা গ্রামে আসেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে হাতিপোতা গ্রাম এখন রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রেও জায়গা করে নিয়েছে।’
হাতিপোতা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের কথায় জানা যায়,একদা হাতিপোতা গ্রামের প্রাক্তন জমিদার ছিলেন ভুবনমোহন চৌধুরী। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী তালসোনাপুরের ‘পার্বতী-ই’ ছিলেন দেবদাস উপন্যাসের নায়িকা ।প্রবীনরা এও জানান,উপন্যাসের একাংশে উল্লেখ রয়েছে,“পার্বতীর পিতা কাল বাটি ফিরিয়াছেন। এই কয় দিন তিনি পাত্র স্থির করিতে বাহিরে গিয়াছিলেন ।’ প্রবীনরা বিশ্বাস করেন, বর্ধমান জেলার হাতিপোতা গ্রামের জমিদারই সেই পাত্র ।
উপন্যাসের কাহিনীর এক অংশে হাতিপোতা গ্রামের নাম প্রকাশ পেয়েছে।তাই বাস্তবের হাতিপোতা গ্রামের মানুষজন আজও মনে করেন যে ১৮৯৫ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে শরৎচন্দ্র নিজেই নদীপথে তাঁদের গ্রামেই এসেছিলেন।তারপর দেবদাস’ উপন্যাসের দৌলতে ধন্য হয়েছে তাঁদের হাতিপোতা গ্রাম। বেড়েছে হাতিপোতা গ্রামের গুরুত্ব ।রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ বলেন,দেবদাস উপন্যাসের দৌলতেই আজ হাতিপোতা গ্রামের নাম বাংলার মানুষের মুখেমুখে ঘুরে বেড়ায়।কথা শিল্পীর উপন্যাস-ই এই গ্রামকে ধন্য করেছে ।’
এ তো না হয় গেল দেবদাস উপন্যাকে আঁকড়ে মেলা ও উৎসব আয়োজনের ইতিবৃত্ত।কিন্তু এটা হয়তো অনেকেই জানেন না,যে দেবদাস মেলা প্রাঙ্গনে মিষ্টান্ন কারবারীদের পেল্লাই সাইজের মিষ্টান্ন তৈরি করে বিক্রীর পিছনে রয়েছে এক অভিনব ভাবনা। এই প্রসঙ্গে মেলা আয়োজকদের পক্ষে রেজাউল মোল্লা বলেন,’মেলা শুরুর প্রথম বছরে দেবদাস উপন্যাসের ন্যায় বিখ্যাত কিছু একটা করে দেখানোর ভাবনা তৈরি হয় মেলায় দোকান বসানো মিষ্টান্ন কারবারীদের মধ্যে । সেই ভাবনা অনুযায়ী তাঁরা ’পেল্লাই সাইজের মিষ্টি’ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেন। তার পর থেকে বিশাল বিশাল আকৃতির নানা মিষ্টান্ন মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।’
নদীয়া থেকে এসে মেলায় মিষ্টির দোকান খুলে বসা আকবর আলী শেখ জানান,’ছানার সঙ্গে ময়দা ও অন্যান উপকরণ একসাথে মিশিয়ে তা ভাল করে মেখে তাঁরা ছোট সাইজ থেকে শুরু করে বড় আকারের নানা মিষ্টি তৈরী করছেন। তার মধ্যে খরিদ্দারের কাছে নজর কেড়েছে দুই হাজার টাকা পিস দরের পেল্লাই সাইজের ’নোড়া পান্তুয়া’।’ এছাড়াও আকার অনুযায়ী পাঁচশো ও হাজার টাকা পিস দরের মিষ্টিও তিনি তৈরি করেছেন বলে জাানন। অপর মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী বিশ্বনাথ মোদক বলেন, “দু-হাজার টাকা পিস দামের একটা মিষ্টি তৈরী করতে তাঁদের প্রায় ৪ কেজি ছানা লাগে । তার সঙ্গে থাকে ময়দা সহ অন্যান্য উপকরণ।রসে ডোবানোর পর ওই একটি মিষ্টির ওজন প্রায় ৭ কেজিতে গিয়ে দাঁড়ায় ।’ দেবদাস মেলায় বসা মিষ্টি কারবারীরা দাবি করেন,তাঁদের তৈরি এত দামি মিষ্ট অন্য কোন মেলায় তেমন বিক্রী হয় না। স্বাদে ও আকারে চমকপ্রদ পেল্লাই মিষ্টি একমাত্র দেবদাস মেলাতেই দেদার বিক্রী হয়। শুধু তাই নয় দুই হাজার টাকা পিস দরের পেল্লাই মিষ্টি দেখতে একবার চোখর দেখা দেখতেও দূরদূরান্তের অনেক মানুষ দেবদাস মেলায় আসেন বলে মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ।।

