এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,২৪ এপ্রিল : জন সমর্থন হারালে চৌর্য্যবৃত্তির কৌশল অবলম্বন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবনতা সাধারণত ভারতীয় রাজনীতিতেই দেখা যায় । এই পদ্ধতিটি ‘দ্য জেন্টেলম্যানস’ বলে পরিচিত বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অবলম্বন না করায় তাঁকে ২০১১ সালে গদি ছাড়তে হয়েছিল । তবে তাঁর পূর্বসূরি জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধে ‘ব্যালট বাক্স লুট’-এর বারবার অভিযোগ উঠেছে । রাজ্যের বর্তমান শাসক মমতা ব্যানার্জিকেও একই অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় । বৃহৎ সংখ্যক মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে না দিয়ে ‘ইভিএম লুট’ করে জনমত পালটে ফেলার ‘ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনিও । অভিযোগ উঠছে (বিশেষ করে বিরোধী দল বিজেপির) যে বৃহস্পতিবার রাজ্যের প্রথম দফার ভোটের পর বুথ থেকে স্ট্রংরুমে ইভিএম নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝপথেই বদলে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল শাসকদলের ভোট কুশলী সংস্থা “আইপ্যাক” । আর এই কাজে পুলিশ প্রশাসনের একাংশের প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগ উঠেছে । নির্বাচন কমিশনের একাংশের ভূমিকাও এক্ষেত্রে সন্দেহাতীত নয় বলে অভিযোগ ।
বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে এবং ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই প্রথম পর্বে, পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি কেন্দ্রে প্রায় ৩৬ লক্ষ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই মহিলা ভোটাররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। বহু নতুন ভোটারের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত, ভোটারদের উৎসাহ ছিল সুস্পষ্ট।
কিন্তু ভোট শুরুর প্রথম থেকেই শাসকদলের গাড়িতে ‘রিজার্ভ ইভিএম’ নিয়ে ঘোরার অভিযোগ ওঠে৷ অভিযোগটি প্রথম তোলেন বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খান । বাঁকুড়ার শালতোড়া কেন্দ্রে ইভিএম বোঝাই তৃণমূলের একটি গাড়ির ভিডিও পোস্ট করে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে প্রতিটি বিধানসভায় ২০ হাজার করে ইভিএম পাল্টানোর পরিকল্পনা করেছে তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক । তার এই অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর । যা স্পষ্টতই ভোটারদের সাথে প্রতারণা ও দেশের গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলে আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।
গতকাল ইভিএম লুটের প্রথম অভিযোগটি আসে বাঁকুড়ার শালতোড়া কেন্দ্র থেকে৷ বিজেপি প্রার্থী চন্দনা বাউরী অভিযোগ করেন যে, ভুয়ো সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ইভিএম কারছুপি করা হয়েছে এবং এতে ভোট প্রক্রিয়ায় কারচুপির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে৷ আসলে, বৃহস্পতিবার বিকালে আচমকাই শালতোড়ার তিলুড়ির কাছে একটি বোলেরো গাড়িতে বেশ কিছু ইভিএম দেখতে পেয়ে গাড়িকে ঘিরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শালতোড়ার বিজেপি প্রার্থী চন্দনা বাউরি। নিজের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে গোটা ঘটনার লাইভ করেন চন্দনা বাউরি। তাঁর অভিযোগ,তৃণমূলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে বুথে ভোট হওয়া ইভিএম বদল করে রিসিভিং সেন্টারে জমা করার উদ্দেশেই ওই গাড়িতে করে ইভিএম নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পাশাপাশি আরো অভিযোগ নির্দিষ্ট নিয়ম না মেনেই গাড়িতে ইভিএম বহন করা হচ্ছিল, রাস্তায় একটি ইলেকশন ডিউটি লেখা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্দেহ তৈরি হয়, আমাদের একটি ইলেকশন এজেন্ট গাড়িটি আটকায় পরে সেটিতে দেখা যায় গাড়িতে ঠাসা ইভিএম ভর্তি, এবং সিটের তলায় বের হয় একাধিক তৃণমূল দলের পতাকা ।
বিষয়টি সামনে আসতেই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায় এবং তারা ঘটনার তদন্তের দাবি জানান। অন্যদিকে এই ঘটনায় অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে না পৌঁছলে ইভিএম বোঝাই ওই গাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ফেলার হুঁশিয়ারি দেন বিজেপি প্রার্থী চন্দনা। ঘটনাকে ঘিরে একই অভিযোগে সামাজিক মাধ্যমে সরব হন বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁ। সৌমিত্র খাঁ এই ঘটনার সঙ্গে প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের যোগসাজসের অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। তবে ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন অবজারভার সহ নির্বাচনী আধিকারিক ও বিষ্ণুপুরের সাংসদ। অবজারভারের দাবি, ওই ইভিএমগুলিতে কোনও ভোট নেওয়া হয়নি। রিজার্ভে থাকা ইভিএম গুলিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তারপরেও গোটা ঘটনার তদন্ত করে পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট দেওয়ার আস্বাস দিয়েছেন অবজারভার। পুরো ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
তবে শুধু বাঁকুড়ার শালতোড়াই নয়, বিভিন্ন জেলা থেকে ‘রিজার্ভ ইভিএম’ ভর্তি গাড়ি ধরা পড়ায় উত্তেজনা ছড়ায় ৷ ঘাটালের পলাশপাই ২৫৯ বুথের ইভিএম বদলের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে বিজেপি । বোলপুরে সিল ছাড়াই ইভিএম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে । বুধবার রাতে আসানসোল উত্তরে ইভিএম ভর্তি গাড়ি ঘিরে একপ্রস্ত উত্তেজনা ছড়ায়৷ ভোটের পর রাস্তায় ইভিএম বদলের আশঙ্কা প্রকাশ করেন জঙ্গলমহল ঝাড়গ্রামের বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত সাউ । তিনি আইপ্যাক ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হন৷ বিজেপি প্রার্থীর অভিযোগ,বুথ থেকে স্ট্রংরুমে বাসে ইভিএম নিয়ে যাওয়ার এই ট্রানজিট পিরিয়ডে আইপ্যাক ইভিএম বদলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে । এতে পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের একাংশের মদতের অভিযোগ তোলেন লক্ষ্মীকান্ত সাউ৷ পাশাপাশি দলীয় এজেন্ট ও কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ।
এছাড়া,মালদার বামনগোলায় ইভিএম চুরির অভিযোগ উঠেছে । পাঁশকুড়া পশ্চিম (সাধারণ) বিধানসভা কেন্দ্রেও ইভিএম-কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় । অভিযোগ যে সিল করা ইভিএম সহ হরিনারায়নচক স্কুলে ভোট কর্মীদের যাওয়ার কথা ছিল , কিন্তু সেখানে না গিয়ে তারা পূর্তদপ্তরের মাঠে চলে আসে,সেখান থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। ঘটনাস্থলে বিজেপি প্রার্থী সিনটু সেনাপতি, পাশাপাশি আসে থানার আইসি সহ বিশাল কেন্দ্রীয়বাহিনী ।
কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ছাড়াই ইভিএম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় দাসপুর বিধানসভার ২৫৯ নম্বর বুথে ৷ সাড়ে ৫ টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিজেপি ইভিএম আটকে দেয় । শেষ পর্যন্ত রাত ১১:২০ নাগাদ কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দিয়ে ইভিএম নিয়ে যাওয়া হয় । কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়াই ইভিএম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
আজিমগঞ্জেও । পাশাপাশি পশ্চিম বর্ধমানের জামুরিয়া বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচন কর্মীদের গাড়ি থেকে ইভিএম উদ্ধার ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় ।মুর্শিদাবাদ, কুচবিহার, বীরভূমের কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া গতকাল প্রথম দফার ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হয়েছে । মানুষ ব্যাপক হারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন । রেকর্ড প্রায় ৯২% ভোট পড়েছে গতকাল । এই বিপুল ভোটদানকে শাসক ও প্রধান বিরোধী বিজেপি নিজের নিজের মত করে ব্যাখ্যা করেছে । একদিকে তৃণমূলের অভিষেক ব্যানার্জি বলেছেন, ‘প্রথম দফাতেই আমরা জিতে গেছি ।’ তিনি অন্তত ১৩৫ টি আসন তৃণমূল পাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন । অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা বলেছেন,’ভোট হওয়া ১৫২ টি আসনের মধ্যে অন্তত ১২৫ টি আসন পাবে বিজেপি ।’ এখন কার দাবি সত্য প্রমাণিত হয় সেটা ৪ঠা মে বেলা ১২ টার মধ্যেই স্পষ্ট হবে ।।
