• Blog
  • Home
  • Privacy Policy
Eidin-Bengali News Portal
  • প্রচ্ছদ
  • রাজ্যের খবর
    • কলকাতা
    • জেলার খবর
  • দেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলার খবর
  • বিনোদন
  • রকমারি খবর
  • ব্লগ
No Result
View All Result
  • প্রচ্ছদ
  • রাজ্যের খবর
    • কলকাতা
    • জেলার খবর
  • দেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলার খবর
  • বিনোদন
  • রকমারি খবর
  • ব্লগ
No Result
View All Result
Eidin-Bengali News Portal
No Result
View All Result

পন্ডিতম্মন্য  মানুষরা জন্মমৃত্যুর নাগরদোলায় ঘুরতেই থাকে,তাঁরা নিজে অন্ধ হয়ে আর এক অন্ধকে পথ দেখাতে চায়  : আচার্য চানক্য

Eidin by Eidin
June 12, 2026
in ব্লগ
পন্ডিতম্মন্য  মানুষরা জন্মমৃত্যুর নাগরদোলায় ঘুরতেই থাকে,তাঁরা নিজে অন্ধ হয়ে আর এক অন্ধকে পথ দেখাতে চায়  : আচার্য চানক্য
3
SHARES
49
VIEWS
Share on FacebookShare on TwitterShare on Whatsapp

মুণ্ডক উপনিষদ : প্রথম মুণ্ডক দ্বিতীয় অধ্যায়

মুণ্ডক উপনিষদের প্রথম মুণ্ডকের দ্বিতীয় অধ্যায়ে জাগতিক আচার-অনুষ্ঠান ও যজ্ঞের সীমাবদ্ধতা এবং পরম সত্য (ব্রহ্ম)-কে জানার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। ঋষি অঙ্গিরা শৌনক ঋষিকে বোঝাচ্ছেন যে, বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপ বা সকাম কর্ম দিয়ে মুক্তি মেলে না, বরং একমাত্র আত্মজ্ঞানই মানুষকে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা থেকে মুক্ত করে।

মুণ্ডক উপনিষদ : প্রথম মুণ্ডক দ্বিতীয় অধ্যায়ের ব্যাখ্যা

তদেতৎ সত্যম্‌—মন্ত্রেষু কর্মাণি কবয়ো
যান্যপশ্যংস্তানি ত্রেতায়াং বহুধা সন্ততানি।
তান্যাচরথ নিয়তং সত্যকামা।
এষ বঃ পন্থাঃ সুকৃতস্য লোকে॥১।।

অন্বয়: তদেতৎ (এই সেই); সত্যম্ (সত্য); কবয়ঃ (কবিগণ অর্থাৎ সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণ); মন্ত্রেষু (মন্ত্রেতে); কর্মাণি (অগ্নিহোত্রাদি কর্ম); অপশ্যন্ (দেখেছিলেন); যানি (যেগুলি); ত্রেতায়াম্ (তিনটি বেদে); বহুধা (নানাভাবে); সন্ততানি (ব্যাখ্যা করা হয়েছে); তানি (তাদের অর্থাৎ সেই কর্মসমূহকে); নিয়তম্ (সবসময়); সত্যকামাঃ (শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী কর্মফল কামনা করে); আচরথ (আচরণ কর); সুকৃতস্য লোকে (ভাল কাজ করে যে লোকে যায়); এষঃ (এই); বঃ (তোমাদের); পন্থাঃ (পথ)।

সরলার্থ: এ-ই সত্য—বেদমন্ত্রে যে সব যজ্ঞানুষ্ঠানের উল্লেখ আছে পণ্ডিত ব্যক্তিরা সেগুলি দেখেছেন। ঋক্‌, সাম, ও যজুঃ—এই তিনটি বেদে এই সব অনুষ্ঠান আবার নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে গেলে ওই সব যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান সবসময় করতে হবে। সৎ কর্ম করে মানুষ যে লোকে যায় সেই লোকে যাওয়ার এই হল উপায়।

ব্যাখ্যা: ব্রহ্ম আমাদের অনেকেরই ধারণার অতীত এক তত্ত্ব। তিনি অনন্ত এবং অনন্তের ধারণা করা বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠিন। এই জগতের মানুষ হিসেবে আমরা এমন কিছু চাই যা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে, যা আমরা উপভোগ করতে পারি। মনে বাসনা রয়েছে, অথচ চোখ বন্ধ করে বলছি আমার কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, তা কি হয়? আমি যা নই তা হওয়ার ভান করতে পারি না। নিজের কাছে নিজেকে সৎ থাকতে হবে। অন্তরে বাসনা থাকলে তা চরিতার্থ করার চেষ্টা করাই ভাল। তবে তা করার আগে ভাল করে চিন্তা করে নিতে হবে। তাই উপনিষদ বলছেন, ‘তৎ এতৎ সত্যম্‌’, এ-ই সত্য। এখানে সত্য বলতে বৈদিক যাগযজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। শাস্ত্রে বহুপ্রকার যজ্ঞানুষ্ঠানের বর্ণনা পাওয়া যায়। শাস্ত্র তথা বেদের দুটি ভাগ: কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডে নানা যাগযজ্ঞের কথা আছে। এখানে ‘কর্ম’ শব্দটির অর্থ যজ্ঞ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বৈদিক ক্রিয়াকর্ম। কর্মকাণ্ড বলে, আমাদের প্রতিটি কর্মের একটা ফল আছে; এবং বিশেষ বিশেষ যজ্ঞকর্ম করলে বিশেষ বিশেষ ফল পাওয়া যায়। যেমন, আমরা ধনসম্পদ, সুস্বাস্থ্য, সুসন্তান, স্বর্গলাভ প্রভৃতি কামনা করতে পারি। এর প্রত্যেকটিই আমাদের আকৃষ্ট করে। এই সব আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য শাস্ত্র কতগুলি নির্দিষ্ট যজ্ঞের বিধান দেন; এই সব যজ্ঞ ঠিক ঠিক করতে পারলে নির্দিষ্ট ফল লাভ হয়। এখনও এমন মানুষ আছেন যাঁরা এই সব যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। শত্রু দমন করার জন্যও আলাদা যজ্ঞ আছে। কিছু যজ্ঞ শুভ, আবার কিছু অশুভ। শুভ যজ্ঞে শুভ ফল পাওয়া যায়; যেমন, স্বাস্থ্যবান ও বুদ্ধিমান সন্তান, অর্থ, দীর্ঘ ও সুখী জীবন ইত্যাদি। প্রতিটি যজ্ঞের বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। শাস্ত্রের মন্ত্রগুলিতে এই সব যজ্ঞের বিশদ বর্ণনা আছে।
‘সত্যকামাঃ’—যিনি ফল কামনা করেন। এখানে ‘সত্য’ কথাটির অর্থ ফল, ‘কামাঃ’র অর্থ কামনা। যদি ফললাভ করতে চাই, তবে এই সব যজ্ঞ নিরন্তর করে যেতে হবে। বহু মানুষ নিয়মিতভাবে এই সব যজ্ঞ করে থাকেন। তাঁদের বিশেষ কোন ফলের আকাঙ্ক্ষা থাকে আর সেই ফল লাভের জন্যই তাঁরা যজ্ঞ করেন। যজ্ঞ কর্ম সম্পন্ন হলে তাঁরা বাঞ্ছিত ফল লাভও করে থাকেন।

যদা লেলায়তে হ্যর্চিঃ সমিদ্ধে হব্যবাহনে।
তদাঽঽজ্যভাগাবন্তরেণাঽঽহুতীঃ প্রতিপাদয়েৎ॥২।।

অন্বয়: যদা হি (যখনই); সমিদ্ধে হব্যবাহনে (সম্যক্‌ ভাবে প্রজ্বলিত অগ্নিতে); অর্চিঃ (শিখা); লেলায়তে (লেলিহান হয়); তদা (তখন); আজ্যভাগৌ (আজ্যভাগ দুটির অর্থাৎ অগ্নির দু-পাশের); অন্তরেণ (মধ্যভাগে); আহুতীঃ (আহুতি, ঘি); প্রতিপাদয়েৎ (অর্পণ করবে)।

সরলার্থ: লকলকে শিখাসহ অগ্নি যখন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে তখন তার দুপাশের মধ্যভাগে আহুতি দিয়ে যজ্ঞ আরম্ভ করা উচিত।

ব্যাখ্যা: যজ্ঞ করতে গেলে প্রথমে যজ্ঞের অগ্নি জ্বালাতে হবে। যজ্ঞাগ্নি যেন দাউদাউ করে জ্বলে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এই অগ্নির দুটি পাশ থাকে—দক্ষিণ পাশ ও বাম পাশ। ঘৃতাহুতি দিতে হবে এই দুটি পাশের মধ্যভাগে যজ্ঞাগ্নির কেন্দ্রস্থলে। আহুতি দেওয়ার সময় অগ্নি যেন দীপ্ত এবং লেলিহান থাকে। যজ্ঞের আগুন যাতে নিভে না যায় তার জন্যই এই ব্যবস্থা। নিভে গেলে ব্রাহ্মণ ঋত্বিকের পক্ষে প্রত্যবায় হবে। সে ক্ষেত্রে যজ্ঞের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাবে, এবং ভালর চেয়ে যজমানের মন্দই হবে বেশী। এই জাতীয় বহু খুঁটিনাটি বিবরণ শাস্ত্রে পাওয়া যায়।

যস্যাগ্নিহোত্রমদর্শমপৌর্ণমাস-
মচাতুর্মাস্যমনাগ্রয়ণমতিথিবর্জিতং চ।
অহুতমবৈশ্বদেবমবিধিনা হুত-
মাসপ্তমাংস্তস্য লোকান্ হিনস্তি॥৩।।

অন্বয়: যস্য (যার অর্থাৎ যে যজমানের); অগ্নিহোত্রম্‌ (অগ্নিহোত্র যাগটি); অদর্শম্‌ (দর্শ নামক যাগ বর্জিত); অপৌর্ণমাসম্‌ অচাতুর্মাস্যম্ অনাগ্রয়ণম্ (পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য এবং আগ্রয়ণ কর্মবর্জিত); অতিথিবর্জিতম্ (অতিথি সৎকার না করে); অবৈশ্বদেবম্ (বৈশ্বদেব কর্মশূন্য); অহুতম্ (অকালে আহুতি দেওয়া); অবিধিনা (অশাস্ত্রীয় ভাবে); হুতম্ (আহুতি যুক্ত), তস্য (তার [সেই যজমানের]); আসপ্তমান্‌ লোকান্‌ (সপ্তলোক পর্যন্ত); হিনস্তি (বিনষ্ট করে [অর্থাৎ যজ্ঞের আনুষঙ্গিক যা-যা করণীয় সেগুলি না করার জন্যে যজমানের সপ্তলোক তার হাতের বাইরে চলে যায়])।

সরলার্থ: (শাস্ত্রের নিয়ম না মেনে অর্থাৎ) দর্শ, পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য এবং আগ্রয়ণ ইত্যাদি আনুষঙ্গিক যজ্ঞ সম্পন্ন না করে, অতিথি সৎকার না করে, অথবা বৈশ্যদেব আচার না মেনে যদি কেউ অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করেন তাহলে সেই যজ্ঞ যথাযথ হয় না। এর ফলে যজমানের সপ্তলোক পর্যন্ত নাশ হয়।

ব্যাখ্যা: ধরা যাক নিখুঁতভাবে যজ্ঞ করা সম্ভব হল না। এই শ্লোকে সেই বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। সারা জীবন ধরে ব্রাহ্মণরা অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করে থাকেন। এখনও অনেক ব্রাহ্মণ পরিবার আছেন যাঁরা এই অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করেন। তাঁদের ঘরে পুরুষ পরম্পরা যজ্ঞাগ্নি জ্বলতে থাকে। প্রতিদিন এই অগ্নিতে আহুতি দিতে হয়। অগ্নিহোত্র যজ্ঞ অতি দুরূহ। এই যজ্ঞ করতে গেলে শুধু অগ্নিহোত্র করলেই হবে না। অন্যান্য আনুষঙ্গিক যজ্ঞ যথা—দর্শ, পৌর্ণমাস, চাতুর্মাস্য, আগ্রয়ণ এবং বৈশ্বদেব অনুষ্ঠানও এর সঙ্গে পালন করতে হবে। আবার যজ্ঞ চলাকালীন অতিথি সৎকার অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কেউ যদি এই অনুষ্ঠান আরম্ভ করেও শাস্ত্রের নিয়ম সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হন? সে ক্ষেত্রে তাঁর কী হবে? ‘আসপ্তমান্‌ লোকান্ হিনস্তি’ অর্থাৎ পৃথিবী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সাতটি লোক তিনি হারাবেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন: কলিযুগে এই সব যজ্ঞ করা কঠিন। কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠান এই যুগের উপযোগী নয়। এই যজ্ঞ একবার শুরু করলে এর সব নিয়মকানুন নিখুঁত ভাবে পালন করতে হয়। শাস্ত্রীয় বিধি লঙ্ঘন হলে যজমানের সর্বনাশ। শাস্ত্র বলেন, এর ফলে জীবনে যত পুণ্য কর্মের ফল সব নষ্ট হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন : এ যুগে মানুষ এত ব্যস্ত যে, শাস্ত্রের কঠোর নিয়মকানুন পালন করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য। কিন্তু কর্ম সবাইকেই করতে হয়। আমরা যে চিন্তা করি তাও একপ্রকার কর্ম। কাজেই কর্মছাড়া আমরা এক মুহূর্তও থাকতে পারি না। কিন্তু শাস্ত্রবিহিত কর্মযজ্ঞ করা এ যুগে আর সম্ভব নয়।

কালী করালী চ মনোজবা চ
সুললাহিতা যা চ সুধূম্রবর্ণা।
স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচী চ দেবী
লেলায়মানা ইতি সপ্তজিহ্বাঃ॥৪।।

অন্বয়: কালী (কালী); করালী (করালী); চ (এবং); মনোজবা (মনোজবা); চ (এবং); সুলোহিতা (সুলোহিতা); যা চ সুধূম্রবর্ণা (এবং যা সুধূম্রবর্ণা [নামেও পরিচিত]); চ (এবং); স্ফুলিঙ্গিনী (স্ফুলিঙ্গিনী); চ (এবং); দেবী বিশ্বরুচী (জ্যোতির্ময়ী বিশ্বরুচী); ইতি (এই); সপ্ত (সাতটি); লেলায়মানাঃ (লেলিহান [অগ্নির]); জিহ্বাঃ (জিহ্বা)।

সরলার্থ: কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী এবং জ্যোতির্ময়ী বিশ্বরুচী—যজ্ঞাগ্নির এই সাতটি লেলিহান জিহ্বা (যা আহুতি গ্রহণ করে)।

ব্যাখ্যা: যজ্ঞাগ্নির সাতটি জিহ্বা এবং প্রতিটির পৃথক নাম আছে। প্রতিটি শিখাকে আলাদাভাবে স্মরণে রাখতে হবে, তাদের আহুতি দিতে হবে, এবং রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। একটি শিখাকেও উপেক্ষা করা চলবে না। সব নিয়ম ঠিক ঠিক পালন করা হলে যজমানের যজ্ঞ সাধন সার্থক হবে।

এতেষু যশ্চরতে ভ্ৰাজমানেষু
যথাকালং চাহুতয়ো হ্যাদদায়ন্‌।
তং নয়ন্ত্যেতাঃ সূর্যস্য রশ্ময়ো
যত্র দেবানাং পতিরেকোঽধিবাসঃ॥৫।।

অন্বয়: এতেষু (এই); ভ্ৰাজমানেষু (লেলিহান অগ্নিশিখাতে); যথাকালং হি (যথা সময়েই); যঃ (যিনি); চরতে (যজ্ঞ করেন); এতাঃ (এই); আহুতয়ঃ চ (আহুতি-সমূহ); সূর্যস্য রশ্ময়ঃ (সূর্যকিরণ [অর্থাৎ সূর্যকিরণ হয়ে]); তম্ (সেই যজমানকে); আদদায়ন্‌ (গ্রহণ করে); নয়ন্তি (নিয়ে যায়); যত্র (যেখানে); দেবানাম্‌ (দেবতাগণের); একঃ পতিঃ (অধিপতি [অর্থাৎ ইন্দ্র]); অধিবাসঃ (সবার উপরে বাস করেন)।

সরলার্থ: যথাসময়ে দীপ্ত লেলিহান অগ্নিশিখাসমূহে আহুতি দিয়ে যাঁরা অগ্নিহোত্র যজ্ঞ করেন, তাঁদের আহুতি সূর্যকিরণে রূপান্তরিত হয়ে তাঁদের দেবলোকে নিয়ে যায়। সেখানে দেবরাজ ইন্দ্র সবার উপরে বসে আছেন।

ব্যাখ্যা: ধরা যাক, ঋত্বিক সব শিখাতেই উপযুক্ত আহুতি দিয়েছেন, যজ্ঞের সব শর্ত পালন করেছেন এবং শাস্ত্রের নিয়ম মেনে যজ্ঞ করেছেন। যজমান তখন কি পুরস্কার পাবেন? তাঁর দেওয়া আহুতি সূর্যকিরণে পরিণত হবে, সূর্যকিরণের সঙ্গে এক হয়ে যাবে। এই সূর্যকিরণই তখন তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যাবে। যজ্ঞ সুসম্পন্ন করায় তিনি ইন্দ্রলোক অর্থাৎ যে-লোকে দেবরাজ ইন্দ্রের বাস সেই লোক প্রাপ্ত হবেন।

এহ্যেহীতি তমাহুতয়ঃ সুবর্চসঃ
সূর্যস্য রশ্মিভির্যজমানং বহন্তি।
প্রিয়াং বাচমভিবদন্ত্যোঽর্চয়ন্ত্য
এষ বঃ পুণ্যঃ সুকৃতো ব্রহ্মলোকঃ॥৬।।

অন্বয়: এহি এহি ইতি (এস এস এইরূপে); সুবৰ্চসঃ আহুতয়ঃ (দীপ্যমান আহুতি-সমূহ); তম্ (সেই); যজমানম্ (যজমানকে); সূর্যস্য (সূর্যের); রশ্মিভিঃ (কিরণ পথে); বহন্তি (বহন করে নিয়ে যায়); প্রিয়াং বাচম্ (স্তুতিবাক্য); অভিবদন্ত্যঃ (উচ্চারণ করতে করতে); অৰ্চয়ন্ত্যঃ (অর্চনা করতে করতে); এষঃ (এই); বঃ (তোমাদের); পুণ্যঃ (পুণ্য); সুকৃতঃ (সুকর্মের ফলস্বরূপ); ব্রহ্মলোকঃ (ব্রহ্মলোক অর্থাৎ স্বর্গলোক)।

সরলার্থ: ‘স্বাগত, স্বাগত। নিজ সুকৃতির দ্বারা তুমি পবিত্র স্বর্গলোক অর্জন করেছ’—এই সুবচনে অভিনন্দিত করে জ্বলন্ত আহুতিসমূহ যজমানকে সসম্মানে সূর্যের কিরণপথে (স্বর্গলোকে) নিয়ে যায়।

ব্যাখ্যা: যজ্ঞাগ্নির শিখাসমূহকে যদি ভালভাবে সেবা করা যায়, তাদের উদ্দেশে আহুতি দেওয়া যায়, তবে তারা যজমানের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়। যজমানের মৃত্যুর সময় এই সব আহুতি সূর্যরশ্মিতে পরিণত হয় এবং তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যায়। ঘরে অতিথি এলে যেভাবে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়, সেইভাবে মধুর বচনে আপ্যায়ন করতে করতে সূর্যরশ্মি যজমানকে স্বর্গে নিয়ে যায়।

প্লবা হ্যেতে অদৃঢ়া যজ্ঞরূপা
অষ্টাদশোক্তমবরং যেষু কর্ম।
এতচ্ছ্রেয়ো যেঽভিনন্দন্তি মূঢ়া
জরামৃত্যুং তে পুনরেবাপি যন্তি॥৭।।

অন্বয়: এতে হি (এই সকল); অষ্টাদশ যজ্ঞরূপাঃ প্লবাঃ (আঠারজন ব্যক্তির দ্বারা কৃত যজ্ঞরূপ ভেলাগুলি); অদৃঢ়াঃ (অদৃঢ়, অনিত্য); যেযু (যাতে অর্থাৎ যে আঠারজন ব্যক্তিকে আশ্রয় করে); অবরং কর্ম (নিকৃষ্ট কর্ম); উক্তম্‌ (শাস্ত্রে বলা হয়েছে); যে মূঢ়াঃ (যে অবিবেকী ব্যক্তিরা); এতৎ শ্রেয়ঃ অভিনন্দন্তি (শ্রেয়োলাভের উপায় রূপে প্রশস্তি করেন); তে পুনঃ এব (তাঁরা পুনরায়); জরামৃত্যুম্‌ অপিযন্তি (জরামৃত্যুকে প্রাপ্ত হন)।

সরলার্থ: যজ্ঞে আঠারো জন ব্যক্তির প্রয়োজন : যজমান স্বয়ং, তাঁর পত্নী ও ষোলজন ঋত্বিক বা পুরোহিত। তাঁরা সকলেই মরণশীল, অতএব তাঁরা যা করেন তাও ক্ষণস্থায়ী ও বিনাশী। সেই অর্থে তাঁরা যে যজ্ঞ করেন তা নিকৃষ্ট কর্ম। ভেলার মতোই তাঁদের যজ্ঞকর্ম অনিত্য এবং (সংসার সমুদ্র পার করতে) অক্ষম। তবু কিছু নির্বোধ মানুষ আছেন যাঁরা এই কর্মকে শ্রেয়োলাভের উপায় বলে মনে করেন। বস্তুত এই কর্মের ফলে স্বর্গলাভ হতে পারে, কিন্তু এই স্বর্গসুখ নেহাতই সাময়িক। স্বর্গের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেই তাঁদের পুনর্জন্ম হয়, এবং আবার তাঁরা জন্মমৃত্যুর চক্রে প্রবেশ করেন।

ব্যাখ্যা: অগ্নিহোত্র ও অন্যান্য যজ্ঞ সম্পাদন করতে আঠারোজন ব্যক্তির প্রয়োজন—যজমান, তাঁর পত্নী ও যোলজন পুরোহিত। এই যজ্ঞ খুবই জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাধ্য। সেকালে মানুষের অর্থও ছিল, অবসরও ছিল। আর ছিল এইসব ক্রিয়াকর্মের প্রতি শ্রদ্ধা। সুতরাং জটিল হলেও তাঁরা এই যজ্ঞ করতে পিছপা হতেন না। কিন্তু শাস্ত্র বড় স্পষ্ট বক্তা। শাস্ত্র সরাসরি বলে দেন যে, এই জাতীয় অনুষ্ঠান সুখপ্রদ হতে পারে কিন্তু মোক্ষ দিতে পারে না। জীবনের উদ্দেশ্য হল মোক্ষলাভ। মোক্ষ বলতে কি বোঝায়? এ এমন এক অবস্থা যেখানে আমি স্বয়ং আমার প্রভু, আমার কর্তা। আর কিছু আমাকেবিচলিত করতে পারে না। ধনী বা নির্ধন—উভয় অবস্থাতেই আমি সুখী। আমার কোন অভাব নেই, অভাববোধও নেই। কেউ হয়তো বলবেন, ‘এ যে দেখছি হেরেই বসে আছে। অর্থের অভাব, তাই বলছে “আঙুর ফল টক”।’ আসলে কিন্তু তা নয়। এ ব্যাপারে শাস্ত্র খুব স্পষ্ট। যদি আমার মনে বাসনা থাকে, আর তা পূরণের জন্য যজ্ঞ করতে চাই, তবে শাস্ত্র বলবেন, ‘তথাস্তু’। শাস্ত্র আপত্তি করবেন না, কিন্তু আমাদের সতর্ক করে দেবেন, ‘মনে রেখো, এই সুখভোগ বেশি দিনের জন্য নয়। একটা সময় আসবে যখন তুমি ক্লান্ত বোধ করবে, হয়তো বা ভোগের ক্ষমতাই থাকবে না। অথবা দেখবে সব সুখই হাতের ফাঁক দিয়ে গলে গেছে, সুখের আর লেশমাত্র নেই।’ জীবন এভাবেই বয়ে চলে। একে হেরে যাওয়া বলে না; এ হল বাস্তবকে স্বীকার করে নেওয়া। আমরা যেন দুহাত দিয়ে চোখ ঢেকে বলছি, ‘সব ঠিক চলছে’। কিন্তু চলছে কি? পরিবর্তনই জগতের স্বভাব, একথা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে। জগতে কোন বস্তুই চিরস্থায়ী নয়—বিবেকী ব্যক্তি একথা মনে রাখেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা ভুলে যায়। তারা বারবার বিষয়সুখের পিছনে ছোটে এবং পরিণামে দুঃখ পায়।

শাস্ত্র আচার-অনুষ্ঠানের নিন্দা করছেন না। শাস্ত্র বলেন, এইসব ক্রিয়াকর্ম আমাদের কিছু দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়, আমাদের আত্মসংযম শেখায়, কিন্তু মোক্ষ দিতে পারে না। যজ্ঞ করে বিত্ত, দীর্ঘ পরমায়ু, সৌন্দর্য, স্বর্গ এসব হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু মোক্ষ দিতে পারে একমাত্র আত্মজ্ঞান। উপনিষদ বলছেন, ‘মূঢ়াঃ অভিনন্দন্তি এতৎ শ্রেয়ঃ’—নির্বোধ ব্যক্তিরা এই ক্রিয়াকর্মের পথকেই শ্রেষ্ঠ বলে প্রশস্তি করে। কেন করে? কারণ এ পথে তারা স্বর্গে যেতে পারবে এবং দেবদেবী এমন-কি ইন্দ্রপদও লাভ করতে পারবে। কিন্তু এরা মূর্খ। যজ্ঞকর্ম যেন ‘অদৃঢ়া প্লবাঃ’—পলকা ভেলা মাত্র। সমুদ্র পার হতে গেলে প্রয়োজন একটি মজবুত নৌকা, তাতে ছিদ্র থাকলে চলবে না। মুমুক্ষু ব্যক্তি যদি যাগযজ্ঞ করে মোক্ষ পেতে চান তাহলে বুঝতে হবে বাহন হিসেবে তিনি এমন একটি নৌকা বেছে নিয়েছেন, যা অত্যন্ত পলকা এবং নিজেই ডুবতে বসেছে। এ পথ মোক্ষের পথ নয়। বেদান্ত বারবার বলছেন—একমাত্র আত্মজ্ঞানই মোক্ষ দিতে পারে। বেদান্ত আরও বলেন, নির্বোধ ব্যক্তি আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা করে না, অতএব জরামৃত্যুর অধীন হয়ে একই জায়গা থেকে তাকে বারবার শুরু করতে হয়—‘জরামৃত্যুং তে পুনঃ এব অপিযন্তি’।

এর অর্থ কি এই, যিনি মুক্ত যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন তাঁর আর মৃত্যু হয় না? না, তা নয়। মোক্ষলাভ হলেও মানুষের মৃত্যু হবেই। কিন্তু আত্মজ্ঞ ব্যক্তির মৃত্যুবোধ থাকবে না। কারণ তিনি জানেন তিনি দেহ থেকে আলাদা। তাঁর কাছে মৃত্যুর কোন গুরুত্ব নেই। তিনি জানেন এ শুধু তাঁর দেহের মৃত্যু। দেহ জরা-ব্যাধিগ্রস্ত হলে তাকে পুরনো ছেঁড়া কাপড়ের মতো ত্যাগ করাই ভাল। এই দেহ তখন ছিন্নবস্ত্রের মতো। কিন্তু সাধারণ মানুষ মৃত্যুভয়ে কাতর। বস্তুত মৃত্যুর ধারণা তার কাছে ভয়াবহ। সে মরতে চায় না। অন্যদিকে, যাঁর মোক্ষলাভ হয়েছে তিনি জানেন মৃত্যুর অর্থ শরীরের মৃত্যু, তাঁর মৃত্যু নেই।

অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানাঃ
স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতং মন্যমানাঃ।
জঙ্‌ঘন্যমানাঃ পরিযন্তি মূঢ়া
অন্ধেনৈব নীয়মানা যথান্ধাঃ॥৮।।

অন্বয়: মূঢ়াঃ (অবিবেকী ব্যক্তিরা); অবিদ্যায়াম্ অন্তরে (অবিদ্যার মধ্যে অর্থাৎ অজ্ঞানতার মধ্যে); বর্তমানাঃ (থেকে); স্বয়ম্ (নিজেকে); ধীরাঃ পণ্ডিতম্‌ (বুদ্ধিমান পণ্ডিত); মন্যমানাঃ (মনে করেন [তাঁরা]); জঙ্‌ঘন্যমানাঃ (নানা অনর্থে বার বার পীড়িত হয়ে); যথা (যেমন); অন্ধেন (অন্ধব্যক্তির দ্বারা); নীয়মানাঃ (পরিচালিত হয়ে); অন্ধাঃ (অন্ধব্যক্তিগণ); পরিযন্তি (ঘুরপাক খেতে থাকেন)।

সরলার্থ: অজ্ঞানে নিমজ্জিত কিছু নির্বোধ ব্যক্তি আছেন, যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিমান ও সর্বজ্ঞ বলে মনে করেন। এমন ব্যক্তিরা একটার পর একটা অনর্থে পড়েন—ঠিক যেমন এক অন্ধের দ্বারা চালিত হয়ে অন্য অন্ধ ব্যক্তিরা শুধু ঘুরপাকই খেতে থাকেন।

ব্যাখ্যা: কিছু মানুষ আছেন যাঁরা নিজেদের অত্যন্ত বুদ্ধিমান মনে করেন। কিন্তু আসলে তাঁরা অজ্ঞানতার গাঢ় অন্ধকারে ডুবে আছেন। তাঁরা অজ্ঞান, কিন্তু ‘স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতং মন্যমানাঃ’, তাঁরা নিজেদের বিজ্ঞ ও পণ্ডিত বলে মনে করেন। ‘জঙ্‌ঘন্যমানাঃ পরিযন্তি’—তাঁরা এই জন্মমৃত্যুর নাগরদোলায় ঘুরতেই থাকেন। তাঁদের বারবার জন্ম হয়, বারবার মৃত্যু। ‘মূঢ়াঃ’—এই নির্বোধ ব্যক্তিরা পেণ্ডুলামের মতো জন্মমৃত্যুর মাঝে দুলছেন। ‘অন্ধাঃ’—তাঁরা অন্ধ, আবার আরেক অন্ধকে পথ দেখাতে চান। এই অঘটন সবসময় ঘটে চলেছে। এই সব মানুষ গভীর চিন্তা করেন না, নিত্য-অনিত্য ভালমন্দ বিচার করেন না। ধীরে ধীরে তাঁরা অজ্ঞানতার অন্ধকারে তলিয়ে যান। এ তো আত্মহত্যার সামিল।

আবার কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন, বিবেকী এবং চিন্তাশীল। তাঁরা একবার দেখেই বস্তুর মর্মার্থ গ্রহণ করতে পারেন। এই জগৎ ক্ষণস্থায়ী তা তাঁরা জানেন। তাই তুচ্ছ সুখভোগে তাঁদের স্পৃহা নেই। কঠ উপনিষদের নচিকেতার চরিত্র এর দৃষ্টান্ত। অর্থ, দীর্ঘ পরমায়ু ও নানা ভোগের উপকরণ দিয়ে যম নচিকেতাকে বারবার প্রলুব্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু নচিকেতা জানতেন এসব ক্ষণস্থায়ী বস্তু তাঁকে তৃপ্তি দিতে পারবে না। আর এই অতৃপ্তি মানুষের পক্ষে কল্যাণকর। এই অতৃপ্তিই মানুষকে ঈশ্বরের কাছে, সত্যের কাছে পৌঁছে দেবে। এই রকম ব্যক্তি পরম সত্য ছাড়া অন্য কিছুই গ্রহণ করেন না।

কিন্তু অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিই অগভীর; তাঁরা বস্তুর মর্মস্থলে পৌঁছতে পারেন না। ‘অবিদ্যায়াম্‌ অন্তরে বর্তমানাঃ’—তাঁরা অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। একটু বিত্ত, একটু সাফল্য, একটু সৌন্দর্য, এবং অল্প বিদ্যালাভ হলেই অধিকাংশ মানুষ সন্তুষ্ট। এঁদের বুদ্ধি শিশুর মতোই অপরিণত। তাঁরা কিন্তু মনে করেন তাঁরা খুব ভাল আছেন। উপনিষদকাররা এই সব মানুষদের জন্য দুঃখ বোধ করেন, এঁদের সতর্ক করে দিতে চান। তাই যাঁরা ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটছেন, এই শ্লোকে তাঁদের উদ্দেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।

অবিদ্যায়াং বহুধা বর্তমানা
বয়ং কৃতার্থা ইত্যভিমন্যন্তি বালাঃ।
যৎ কর্মিণো ন প্রবেদয়ন্তি রাগাৎ
তেনাতুরাঃ ক্ষীণলোকাশ্চ্যবন্তে॥৯।।

অন্বয়: বালাঃ (মূর্খব্যক্তিগণ); অবিদ্যায়াম্ (অবিদ্যাতে); বহুধা (নানাভাবে); বর্তমানাঃ (থেকে); বয়ম্ (আমরা); কৃতার্থাঃ (কৃতার্থ); ইতি (এইরূপ); অভিমন্যন্তি (অভিমান করেন অর্থাৎ অহঙ্কার করেন); যৎ (যেহেতু); রাগাৎ (কর্মফলে আসক্তিবশত); [এই মুর্খ] কর্মিণঃ (সকাম কর্মিগণ); প্রবেদয়ন্তি ন (প্রকৃত পথ [জ্ঞানের পথ] জানেন না); তেন (সেই হেতু); ক্ষীণলোকাঃ (কর্মফল-ভোগাবসানে); আতুরাঃ (পীড়িত হয়ে); চ্যবন্তে (স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হন)।

সরলার্থ: কিছু নির্বোধ ব্যক্তি আছেন যাঁদের আচরণ শিশুসুলভ। বহু বিষয়েই তাঁরা অজ্ঞানতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তবু নিজেদের সর্বজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান বলে জাহির করেন। তাঁরা নিজেদের বিশেষ কৃপাপ্রাপ্ত বলে দাবী করেন। আসলে কর্মফলে আসক্তিবশত তাঁরা যাগযজ্ঞ নিয়ে মত্ত থাকেন। সঠিক পথ তাঁদের অজানা। তাই তাঁরা কিছুকাল স্বর্গসুখ ভোগ করেন ঠিকই, কিন্তু অচিরেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁরা স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হন এবং অশেষ দুঃখকষ্ট ভোগ করেন।

ব্যাখ্যা: এই অংশে উপনিষদ বলছেন, মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমটি জ্ঞানের পথ অর্থাৎ বিচারের পথ; অন্যটি যাগযজ্ঞ তথা সকাম কর্মের পথ। উপনিষদ বলছেন, যদি মোক্ষ উদ্দেশ্য হয় তাহলে আত্মজ্ঞান লাভ করতে হবে। নিজের প্রকৃত স্বরূপ জানলে তবেই মুক্তিলাভ হয়। আত্মজ্ঞানী জানতে পারেন তাঁর ভেতরেই সব রয়েছে, তিনি বাইরে কোন কিছুর অধীন নন। তিনি নিজেই নিজের প্রভু, সদামুক্ত, সদাপ্রসন্ন।

কিন্তু কিছু নির্বোধ মানুষ আছেন যাঁরা সকাম কর্মের পথ (অর্থাৎ যাগযজ্ঞ) বেছে নেন। উপনিষদ বলছেন, তাঁরা ‘অবিদ্যায়াং বর্তমানাঃ’—অজ্ঞানতায় ডুবে আছেন, ‘বহুধা’—নানাভাবে। অর্থাৎ তাঁরা নিজেরাও জানেন না তাঁরা অজ্ঞান। তাঁরা মনে করেন, ‘বয়ং কৃতার্থাঃ’—আমরা সব পেয়েছি, আমরা কৃতার্থ। সন্তান, বিত্ত, রূপ, যৌবন, সবই তাঁদের আছে। তাই তাঁরা বলেন, ‘আমরা ভাল আছি।’ কিন্তু তাঁদের কিসের অভাব তা তাঁরা নিজেরাই জানেন না। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘উটের অবস্থা দেখ! তারা কাঁটাঘাস খেতে ভালবাসে। খেতে গিয়ে মুখ দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ে, কিন্তু ছাড়ে না।’ আমাদের অনেকের অবস্থাই এই রকম, জগতের অসার বস্তুর পিছনে ছুটে চলেছি। এই জন্যই একে বলে মায়া। এঁরা কেন এমন করেন তার ব্যাখ্যা মেলে না। তাঁরা যে একেবারেই অজ্ঞ তা নয়। তাঁরা জানেন এপথে দুঃখ অনিবার্য। তবু তাঁরা এই পথই বেছে নেন, এবং নিজেদের বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমান বলে মনে করেন। উপনিষদ তাঁদের ‘বালাঃ’ অর্থাৎ শিশু বলে উল্লেখ করেছেন। শিশুদের মতোই তাঁরা অপরিণত-বুদ্ধি। অথচ অধিকাংশ মানুষই এইভাবে ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছোটে। কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সারাজীবন ধরে যাগযজ্ঞ করেন—তাঁরাই হলেন ‘কর্মিণঃ’। ‘ন প্রবেদয়ন্তি’—তাঁরা চিন্তা করেন না, বিচার করেন না, কিছু ধারণা করতেও পারেন না। কিন্তু কেন? ‘রাগাৎ’—তাঁরা ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত। তাঁরা অন্ধ। তাঁদের জীবনের পরিণতি কি? ‘আতুরাঃ’—তাঁরা দুঃখভোগ করেন। দীর্ঘায়ু, মান-যশ এমনকি স্বর্গলোকও তাঁরা লাভ করতে পারেন, কিন্তু ‘ক্ষীণলোকাঃ’ অর্থাৎ তাঁদের পুণ্যকর্মের ফল ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে। এখানে ‘লোকাঃ’ শব্দটির অর্থ কর্মফল। যত সুকৃতিই থাকুক না কেন তার মূল্য অতি সামান্যই, কারণ তারা স্বল্পমেয়াদী। সেই সুকৃতির ফল অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন তাঁরা স্বর্গ থেকে বিচ্যুত হন।
ইষ্টাপূর্তং মন্যমানা বরিষ্ঠং

নান্যচ্ছ্রেয়ো বেদয়ন্তে প্রমূঢ়াঃ।
নাকস্য পৃষ্ঠে তে সুকৃতেঽনুভূত্বে-
মং লোকং হীনতরং বা বিশন্তি॥১০।।

অন্বয়: প্রমূঢ়াঃ (অত্যন্ত মূঢ় ব্যক্তিরা); ইষ্টাপূর্তম্‌ (যাগযজ্ঞ এবং কূপ খনন প্রভৃতি পূর্তকর্মকে); বরিষ্ঠম্‌ (শ্রেষ্ঠ কর্ম); মন্যমানাঃ (মনে করেন); অন্যৎ (অন্য কিছুকে); শ্রেয়ঃ (শ্রেয়); ন বেদয়ন্তে (জানেন না); তে (তাঁরা); সুকৃতে (পুণ্যকর্ম করে); নাকস্য (স্বর্গের); পৃষ্ঠে (উপরিভাগে); অনুভূত্বা (তাঁদের কর্মফল ভোগ করেন); ইমং লোকম্‌ (এই মনুষ্য লোকে); হীনতরং বা (অথবা তার থেকেও হীনতর লোকে); বিশন্তি (প্রবেশ করেন)।

সরলার্থ: কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চূড়ান্ত নির্বোধ। তাঁরা মনে করেন যাগযজ্ঞ এবং (কূপ, দীঘি খনন ইত্যাদি) জনহিতকর কর্মই সর্বোত্তম। এর চেয়ে মহত্তর কিছু থাকতে পারে তা তাঁরা জানেন না। এই সব সৎ কর্মের ফলে মৃত্যুর পর তাঁদের স্বর্গলাভ হয়, এবং নির্দিষ্ট কাল ব্যাপী তাঁরা স্বর্গসুখ ভোগ করেন। কিন্তু মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে তাঁরা আবার এই জগতে ফিরে আসেন (এবং মনুষ্যরূপে অথবা ইতর প্রাণী রূপে তাঁদের পুনর্জন্ম হয়)।

ব্যাখ্যা: উপনিষদ বারবার প্রশ্ন করছেন : আমরা কোন্ পথ বেছে নেব? বেদে দুটি পথের কথা বলা হয়েছে: কর্মকাণ্ড (কর্মের পথ) ও জ্ঞানকাণ্ড (জ্ঞানের পথ)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রবর্তিত আর্যসমাজের কথা আমরা অনেকেই জানি। তিনি বলতেন, ‘চলুন, আমরা কর্মকাণ্ডে ফিরে যাই, বৈদিক ক্রিয়াকর্ম করি।’ কিন্তু বেদান্ত বলেন, ‘যাঁরা ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত, তাঁদের জন্য কর্মকাণ্ড।’ এ পথে মোক্ষলাভ হয় না। মুক্তি পেতে গেলে জ্ঞানের পথ অনুসরণ করতে হবে; জ্ঞান ও বিচারের অনুশীলন করতে হবে। উপনিষদে প্রধানত জ্ঞানকাণ্ডের কথাই বলা হয়েছে।

বর্তমান উপনিষদে কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত দু-ধরনের কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে : ইষ্টম্‌ ও পূর্তম্‌। ইষ্টম্‌ বলতে যাগযজ্ঞ করাকে বোঝায়, আর পূর্তম্‌ বলতে বোঝায় জনহিতকর কর্ম—যেমন কূপ খনন, পথঘাট নির্মাণ ইত্যাদি। এই সব কার্য উত্তম ও নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু এর দ্বারা মোক্ষলাভ করা যায় না। ‘ইষ্টাপূর্তং মন্যমানা বরিষ্ঠম্‌’—কিছু মানুষ আছেন যাঁরা এই সব কর্মকে ‘বরিষ্ঠ’ অর্থাৎ অতি উত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট বলে মনে করেন। উপনিষদ এই সব মানুষকে বলছেন ‘প্রমূঢ়া’ অর্থাৎ অসার, নির্বোধ এবং অজ্ঞ। ‘অন্যৎ শ্রেয়ঃ ন বেদয়ন্তি’—এর চেয়ে ভাল কোন কিছু তাঁদের জানা নেই। দরিদ্রসেবা, কূপ খনন, যাগযজ্ঞ ইত্যাদি সুকৃতির বলে তাঁরা হয়তো স্বর্গলাভ করেন (নাকস্য পৃষ্ঠে)। কিছু কাল তাঁরা স্বর্গসুখ ভোগও করেন (অনুভূত্বা); পাঁচ বছর, দশ বছর বা আরও বেশি। কিন্তু তারপর তাঁদের এই পৃথিবীতে (ইমং লোকম্) ফিরে আসতে হয় অথবা পৃথিবীর চেয়েও কোন নিম্নতর লোকে তাঁদের যেতে হয় (হীনতরং বা)। কেন তাঁদের এই নিম্নতর লোকে যেতে হয়? তাঁরা স্বর্গে গিয়েছিলেন তাঁদের সৎকর্মের জন্য, কিন্তু হয়তো তাঁরা কিছু অসৎ কর্মও করেছেন; সুতরাং এই অসৎ কর্মের ফলভোগও তাঁদের করতে হবে। আর সেইজন্যই তাঁদের হীনতর লোকে গমন করতে হয় (‘হীনতরং বিশন্তি’—অর্থাৎ প্রবিশন্তি বা প্রবেশ করেন)। এই সব মানুষ নির্বোধ ও অশেষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন (আতুরাঃ)। জন্মমৃত্যুর চক্রে তাঁরা বারবার বদ্ধ হন। এই চক্রের থেকে নিষ্কৃতি লাভ কিভাবে সম্ভব? কেবলমাত্র আত্মজ্ঞানের দ্বারা।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, জনহিতকর কার্য থেকে মানুষ বিরত থাকবে, অথবা কোন কর্মই সে করবে না। এখানে কর্ম বলতে শাস্ত্র সকাম কর্মকে বুঝিয়েছেন। নাম, যশ, সন্তান, বিত্তলাভ অথবা স্বর্গপ্রাপ্তি ইত্যাদি। কোন ফল আকাঙ্ক্ষা করে কর্ম করাকে সকাম কর্ম বলা হয়। এই যুগে এসব ফললাভের জন্য মানুষ যাগযজ্ঞ করে না। মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা উপাসনা ইত্যাদি করতে পারে। কিন্তু এর দ্বারা মোক্ষলাভ হয় না। আবার মানুষ নিষ্কাম কর্মও করতে পারে। কর্মফলে আসক্তি না রেখে কর্ম করাকে বলে নিষ্কাম কর্ম। নিষ্কাম কর্মই ভগবদ্‌গীতার মূল বাণী—ফলের আকাঙ্ক্ষা না করে সব কর্ম কর। সৎ কর্ম কর; যথাসাধ্য এবং আন্তরিকভাবে কর্ম কর। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। সংবাদপত্রে নিজের নাম দেখার জন্য যদি জনহিতকর কর্মও করে থাক তবে তাও সকাম কর্ম। লোকহিতে কাজ উত্তম সন্দেহ নেই, কিন্তু তা তোমাকে মোক্ষের পথ দেখাতে পারবে না।

তাই শাস্ত্র মানুষকে পথের নির্দেশ দেন, কর্মফল ব্যাখ্যা করেন কিন্তু আসল দায়িত্ব মানুষের নিজের ওপর। সে ভালমন্দ, নিত্য-অনিত্য বিচার করবে। নিজের পথ সে বেছে নেবে। এককথায়, সে নিজেই হবে তার ভাগ্যবিধাতা।

তপঃশ্রদ্ধে যে হ্যুপবসন্ত্যরণ্যে
শান্তা বিদ্বাংসো ভৈক্ষ্যচর্যাং চরন্তঃ।
সূর্যদ্বারেণ তে বিরজাঃ প্রয়ান্তি
যত্রামৃতঃ স পুরুষো হ্যব্যয়াত্মা॥১১।।

অন্বয়: যে হি (যাঁরা); শান্তাঃ (সংযতেন্দ্রিয়); বিদ্বাংসঃ (জ্ঞানী ব্যক্তিগণ); ভৈক্ষ্যচর্যাম্ (ভিক্ষাবৃত্তি); চরন্তঃ (অবলম্বন করে); অরণ্যে (বনে); তপঃশ্রদ্ধে (তপস্যা ও শ্রদ্ধার অনুষ্ঠান করেন); উপবসন্তি (বাস করেন); তে (তাঁরা); বিরজাঃ (রজোগুণ শূন্য হয়ে); সূর্যদ্বারেণ (উত্তরায়ণ পথে); [তত্র] প্রয়ান্তি (প্রবেশ করেন); যত্র (যেখানে); সঃ (সেই); অমৃতঃ (অমর); অব্যয়াত্মা (অব্যয় আত্মা); পুরুষঃ (পুরুষ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ [বাস করেন])।

সরলার্থ: কিছু সংযতেন্দ্রিয়, বিদ্বান ব্যক্তি আছেন যাঁরা অরণ্যে বাস করেন এবং ভিক্ষান্নে জীবন ধারণ করেন। পরম সত্য লাভ করার উদ্দেশ্যে তাঁরা কৃচ্ছ্র সাধন ও তপস্যা করেন। এভাবে তাঁদের চিত্ত শুদ্ধ হয়। মৃত্যুর পর সূর্যদ্বার পথে (উত্তরায়ণ মার্গে) তাঁরা সেই লোকে যান যেখানে অবিনাশী অক্ষয় পুরুষ হিরণ্যগর্ভ বাস করেন। একেই বলে ব্রহ্মলোক।

ব্যাখ্যা: এখানে উপনিষদ আর এক শ্রেণীর মানুষের কথা বলছেন। এই সব মানুষ গৃহীর জীবন যাপন করলেও বুঝে নিয়েছেন যে আত্মোপলব্ধিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। পারিবারিক এবং সামাজিক, সর্বপ্রকার দায়িত্ব পালনের পর তাঁরা বৃদ্ধ হয়েছেন। তাই তাঁরা সংসার থেকে অবসর নিয়ে বানপ্রস্থ হয়েছেন। অধিকাংশ উপনিষদ এই সব বানপ্রস্থদের রচনা। সংসারের অসারতা তাঁরা দেখেছেন, তাঁদের বিবেক-বৈরাগ্য জেগেছে; তাই তাঁরা অবসর নিয়েছেন। এ ছিল প্রাচীন ভারতের রীতি। ছেলে বড় হলে পরিবারের সকল দায়িত্ব পিতামাতা তার উপর অর্পণ করে নিজেরা বনবাসী হতেন, এবং শাস্ত্র অধ্যয়ন ও ধ্যান-ধারণায় সময় কাটাতেন।

এই বানপ্রস্থগণ ছিলেন ‘শান্তাঃ’—তাঁদের অন্তরে ছিল শান্তি। তাঁদের সকল বাসনা দূর হয়েছে, তাঁরা সংযতেন্দ্রিয়। তাঁরা ‘বিদ্বাংসঃ’ অর্থাৎ শাস্ত্রজ্ঞ, বিদ্বান, পণ্ডিত, প্রাজ্ঞ এবং চিন্তাশীল। ‘বিরজাঃ’—তাঁদের সকল মলিনতা দূর হয়ে গেছে। কি এই মলিনতা? বাসনা এবং অহং-বুদ্ধি। ‘ভৈক্ষ্যচর্যাং চরন্তঃ’—যেদিন যা ভিক্ষা পাওয়া যেত তাই দিয়েই চলে যেত তাঁদের জীবন। অর্থাৎ তাঁরা ছিলেন বাসনামুক্ত। ‘যথেষ্ট ভোগ করেছি, আর নয়। এখন আধ্যাত্মিক জীবনচর্যার সময়। এই জীবনের অর্থ কি, উদ্দেশ্য কি, আমি জানতে চাই। কিভাবে শান্তি পাব?’— এই ছিল তাঁদের মনোভাব।

আমরা অধিকাংশ মানুষই জানি না কখন সংসার ত্যাগ করতে হয় বা কখন অবসর নিতে হয়। আর সেইজন্যই এত দুঃখ পাই। জীবনে একটা সময় আসে যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ‘এই সংসারে যথেষ্ট হয়েছে। এখন অবসর নেব।’ এর অর্থ এই নয় যে, তুমি জীবন থেকে পালিয়ে যাচ্ছ অথবা দীর্ঘ অবকাশ কাটাতে চলেছ। এ আর একরকমের জীবন, যে-জীবন আরও কঠিন, আরও সংগ্রামের। হয়তো কোন ব্যক্তি সংসারে ধনী ছিলেন, বিলাসিতায় অভ্যস্ত ছিলেন। এখন এই বনবাসে আরামের কোন অবকাশই নেই। কিন্তু অচিরেই দেখা যায় এর জন্য তাঁর মনে কোন অভাববোধও নেই। আপন অন্তরের সম্পদ তিনি আবিষ্কার করেছেন।

স্বামী বিবেকানন্দের দুজন ইংলণ্ডের শিষ্য ছিলেন—ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ও তাঁর পত্নী শ্রীমতী সেভিয়ার। তাঁরা স্বামীজীর সঙ্গে ভারতে এসে মায়াবতীতে একটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক বছরের মধ্যে স্বামীজীর ও ক্যাপ্টেন সেভিয়ারের মৃত্যু হয়। তখন সকলেই ভাবলেন শ্রীমতী সেভিয়ার আর মায়াবতীতে থাকতে পারবেন না। স্থানটি যেমন দুর্গম, তেমনি নির্জন। সেখানে আরামের কোন ব্যবস্থাই ছিল না। তিনি কিন্তু খুশী হয়েই সেখানে থেকে গেলেন। একবার তাঁর কাছে একজন জানতে চেয়েছিলেন ওই নির্জন জীবন তিনি সহ্য করছেন কেমন করে! উত্তরে শ্রীমতী সেভিয়ার জানান, ‘স্বামী বিবেকানন্দের বহু স্মৃতি আমার মনে সঞ্চিত রয়েছে। সেই স্মৃতির আনন্দ এবং প্রেরণাই কি আমার বেঁচে থাকার পক্ষে যথেষ্ট নয়?’ বহুবছর তিনি মায়াবতীতে একক জীবন অতিবাহিত করেছেন; শেষের দিকে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। তখন সকলের পরামর্শে তিনি ইংলণ্ডে ফিরে যান এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

অধিকাংশ মানুষই এরকম জীবন যাপনকে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করবেন। কঠ উপনিষদ বলছেন, ঈশ্বর আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে স্বভাবতই তারা বহির্মুখী। চোখ, কান ইত্যাদি সকল ইন্দ্রিয়ই বাইরের দিকে দেখছে। যদি ওই ইন্দ্রিয়গুলিকে ভিতরদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, দেখব অন্য এক জগৎ। বর্তমানে আমরা সেই জগৎ সম্পর্কে সচেতন নই, যদিও সেই অন্তর্জগৎ বাইরের জগতের মতোই সত্য। বরং কোন কোন মানুষের কাছে এই অন্তর্জগৎই বেশী সত্য। ধ্যানের দ্বারা এই জগতের বিভিন্ন দিক তাঁরা আবিষ্কার করেন। আনন্দ, প্রেরণা এবং শক্তির নিত্য নতুন উৎস সেখানে খুঁজে পান। আরাম, আনন্দ বা শক্তির জন্য তাঁরা বাইরের জগতের অপেক্ষা করেন না। সব সম্পদ তাঁদের অন্তরেই রয়েছে। উপনিষদ বলেন : ‘আত্মাই সকল বস্তুর উৎস।’

এখন কেউ বলতে পারেন যে, বাইরের বস্তুতে অবশ্যই আনন্দ আছে। কিন্তু বেদান্ত বলেন: যদি তাই হয়, তবে কেন একই বস্তু একজনের কাছে সুখপ্রদ আবার অন্যের কাছে দুঃখজনক। আনন্দ যদি সেই বস্তুরই ধর্ম হয়, তবে তা সর্বত্র সকলের কাছেই আনন্দদায়ক হবে। ধরা যাক—ক্ষেতে একজন কাজ করছে আর তুমি তাকে একটি কবিতা পড়ে শোনাচ্ছ। সে বলে উঠতে পারে: ‘কি যা তা সব পড়ে যাচ্ছ।’ অন্যান্য ব্যাপারে সে হয়তো বুদ্ধিমান কিন্তু কবিতার বিষয়বস্তু সে কিছুই বুঝতে পারছে না। আবার কোন দর্শকের কাছে আধুনিক চিত্রকলা অর্থহীন বলে মনে হতে পারে; কিন্তু আর একজন হয়তো বলছে, ‘চমৎকার হয়েছে’। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আনন্দ বাইরের বস্তুতে নেই। আনন্দ রয়েছে আমাদের অন্তরে।

কিভাবে এইসব গৃহীরা জেনেছেন যে আনন্দ বা শান্তি বাইরের জগতে নেই, কেমন করেই বা তাঁরা তাঁদের মনকে অন্তর্মুখী করেছেন তার বর্ণনা উপনিষদে পাই। উপনিষদ বলেন, মৃত্যুর পর এই সব মানুষ সূর্যদ্বার পথে অর্থাৎ উত্তরায়ণ মার্গে যান। এই বানপ্রস্থগণ প্রাজ্ঞ, তাই তাঁরা আলোর পথ অর্থাৎ সূর্যের পথ অনুসরণ করেন। কোথায় যান তাঁরা? হিরণ্যগর্ভ তথা ব্রহ্মলোকে। অবশ্য তখনও তাঁরা সম্পূর্ণ মুক্ত নন। তখনও তাঁদের মোক্ষলাভ হয়নি, তবে মোক্ষের পথে চলেছেন। এ এক মধ্যবর্তী অবস্থা, মোক্ষের কাছাকাছি তাঁরা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এই পৃথিবীতে ফিরে আসেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরা না চাইলে ফিরে আসতে হয় না। কালে ব্রহ্মলোকে তাঁদের পরাগতি অর্থাৎ মোক্ষলাভ হয়।

পরীক্ষ্য লোকান্ কর্মচিতান্ ব্রাহ্মণো
নির্বেদমায়ান্নাস্ত্যকৃতঃ কৃতেন।
তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ
সমিৎপাণিঃ শ্ৰোত্ৰিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্॥১২।।

অন্বয়: কর্মচিতান্‌ (কর্মের দ্বারা অর্থাৎ যাগযজ্ঞের দ্বারা লব্ধ); লোকান্ (লোকসকলকে); পরীক্ষ্য (পরীক্ষা করে); ব্রাহ্মণঃ (ব্রাহ্মণ যিনি ব্রহ্মজিজ্ঞাসু); নির্বেদম্ (বৈরাগ্য); আয়াৎ (অভ্যাস করবেন); [যেহেতু] কৃতেন (কর্মের দ্বারা); অকৃতঃ (অকৃত অর্থাৎ নিত্যবস্তু); ন অস্তি (হয় না; লাভ হয় না); তৎ (সেই নিত্যবস্তু); বিজ্ঞানার্থম্‌ (জানবার জন্য); সঃ (তিনি); সমিৎপাণিঃ (সমিধ কাঠ হাতে নিয়ে); শ্রোত্রিয়ম্ (বেদজ্ঞ); ব্রহ্মনিষ্ঠম্‌ গুরুম্ (ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুর কাছে); এব অভিগচ্ছেৎ (যান)।

সরলার্থ: আনুষ্ঠানিক উপাসনাদির ফল যে ক্ষণস্থায়ী একথা ব্রহ্মজিজ্ঞাসু জানেন। তাই এই জাতীয় অনুষ্ঠান তাঁকে আকর্ষণ করে না। যা নিত্য তা অনিত্য-ক্রিয়াকর্মের দ্বারা পাওয়া যায় না, একথা তিনি জানেন। এই জন্যই তিনি ব্রহ্মনিষ্ঠ বেদজ্ঞ আচার্যের অনুসন্ধান করেন। নম্রতার প্রতীক হিসেবে সমিধ কাঠ হাতে নিয়ে তিনি আচার্যের নিকট উপস্থিত হন।

ব্যাখ্যা: ‘পরীক্ষ্য’ কথাটির অর্থ পরীক্ষা করা, বিবেচনা করা, পরিমাপ করা। নিত্য-অনিত্য বিচার করতে হবে। কি পরীক্ষা করব? ‘কর্মচিতান্‌’—কর্মফল। ‘অকৃতঃ’—কথাটির অর্থ যার সৃষ্টি নেই। আত্মার সৃষ্টি নেই। এখানে উপনিষদ বলছেন, যজ্ঞাদি অনিত্য কর্মের দ্বারা (কৃতেন) অকৃতকে অর্থাৎ নিত্যকে পাওয়া যায় না। সকাম কর্মের অনুষ্ঠান করে আমরা কি ফল পাব তা আগে বিবেচনা করে দেখতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে : ‘এর দ্বারা কি মনের শান্তি পাওয়া যাবে? আমার কি মোক্ষলাভ হবে?’ এইভাবে বিচার করলে তবেই ‘নির্বেদম্‌ আয়াৎ’ অর্থাৎ বৈরাগ্য আসবে। তখন সব কিছু ত্যাগ করতে হবে। কঠ উপনিষদের নচিকেতার উপাখ্যান এরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যখন নানা উপচারে যম নচিকেতাকে প্রলুব্ধ করতে চাইলেন, তখন নচিকেতা নিজেকে প্রশ্ন করলেন ‘এই সব বস্তু কি আমাকে মুক্তি দিতে পারে? অথবা মনের শান্তি?’ যখন উত্তর পেলেন ‘না, তা পারে না’ তৎক্ষণাৎ সেই সব বস্তু প্রত্যাখ্যান করলেন। একবার শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামী বিবেকানন্দকে কিছু অলৌকিক শক্তি (অষ্ট সিদ্ধি) দিতে চান; স্বামীজী জিজ্ঞাসা করেন এই সব শক্তির দ্বারা মোক্ষ তথা আত্মজ্ঞান লাভ করা যাবে কি না। প্রত্যুত্তরে যখন শ্রীরামকৃষ্ণ জানালেন—‘না তা যাবে না’ তখন স্বামীজী বললেন : ‘তবে ওসবে আমার প্রয়োজন নেই।’ এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন নির্মম, আপসহীন। একূল ওকূল দুকূল রাখতে গেলে কোন দিকই রক্ষা পায় না, দুকূলই ভেসে যায়। তাই মোক্ষলাভের জন্য চাই আপসহীন তীব্র ব্যাকুলতা—‘আমি আত্মজ্ঞান চাই, আর কিছুই চাই না। এই দেহের যা হয় হোক, আমি সত্যকে জানবই।

সুতরাং এই পরমসত্য শোনার জন্য আচার্যের কাছে যেতে হবে। আচার্য কিরকম হবেন? ব্রহ্মনিষ্ঠম্‌—অর্থাৎ ব্রহ্মে যাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠা। তিনি ব্রহ্ম তথা পরমাত্মাকে উপলব্ধি করেছেন, তিনি সত্য জ্ঞান লাভ করেছেন। তা যদি তিনি নাকরে থাকেন, স্বয়ং আচার্যই যদি অজ্ঞান হন, তবে শিষ্যকে তিনি কিভাবে সাহায্য করবেন? কি শিক্ষা দেবেন তাকে? উপযুক্ত আচার্যের কাছে ‘সমিৎপাণি’—অর্থাৎ সমিধ কাঠ হাতে নিয়ে যেতে হবে। এটি শিষ্যের নম্রতার নিদর্শন।

তস্মৈ স বিদ্বানুপসন্নায় সম্যক্‌
প্রশান্তচিত্তায় শমান্বিতায়।
যেনাক্ষরং পুরুষং বেদ সত্যং
প্রোবাচ তাং তত্ত্বতো ব্রহ্মবিদ্যাম্॥১৩।

অন্বয়: সঃ বিদ্বান্ (সেই ব্রহ্মজ্ঞ গুরু); সম্যক্‌ (সম্যক্‌-রূপে); প্রশান্তচিত্তায় (সংযতচিত্ত); শমান্বিতায় (সংযতেন্দ্রিয়); উপসন্নায় তস্মৈ (তাঁর কাছে যে এসেছে সেই শিষ্যকে); তাং ব্রহ্মবিদ্যাম্‌ (সেই ব্রহ্মবিদ্যা); তত্ত্বতঃ (স্বরূপত); প্রোবাচ (প্রকৃষ্টরূপে বললেন); যেন (যার দ্বারা অর্থাৎ যে বিদ্যার দ্বারা); সত্যম্‌ (সত্যস্বরূপ); অক্ষরম্‌ (বিনাশহীন); পুরুষম্‌ (অন্তর্যামীকে; পুরুষকে); বেদ (জানা যায়)।

সরলার্থ: সর্বপ্রথম শিষ্যকে নিজের মন ও ইন্দ্রিয়ের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তারপর তিনি ব্রহ্মজ্ঞ আচার্যের কাছে যাবেন। সেই আচার্য তখন শিষ্যকে ব্রহ্মের স্বরূপজ্ঞান দান করবেন।

ব্যাখ্যা: যখন কোন ব্যক্তি কোন আচার্যের নিকট উপস্থিত হয়ে ব্রহ্মজ্ঞান প্রার্থনা করেন, তখন প্রথমেই আচার্য শিষ্যকে পরীক্ষা করেন। শিষ্য প্রশান্তচিত্ত কি না অর্থাৎ সে আত্মসংযম আয়ত্ত করেছে কি না তা আচার্য পরীক্ষা করে দেখেন। তিনি জানতে চান শিষ্য সংযম অভ্যাস করেছে কি না—‘শমান্বিতায়’। নিজেকে আত্মজ্ঞান লাভের উপযুক্ত করে তুলতে বেদান্ত ছয়টি প্রয়োজনীয় সাধন-সম্পদের কথা বলেছেন: (১) শম—মনের সংযম, (২) দম—ইন্দ্রিয় সংযম, (৩) তিতিক্ষা—সহিষ্ণুতা, অধ্যবসায়, (৪) উপরতি—ত্যাগ, বৈরাগ্য, (৫) শ্রদ্ধা—বিশ্বাস, (৬) সমাধান—একাগ্রতা। অভ্যাসের দ্বারা এই ষট্ সম্পদ আয়ত্ত হলে বুঝতে হবে, শিষ্য এই পথে অনেক এগিয়ে গেছেন এবং আত্মজ্ঞান লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। বেদান্ত বলছেন: ‘এই প্রস্তুতি যেখানে নেই, সেখানে ব্রহ্মবিদ্যা দান নিরর্থক। বাইবেলেও আমরা দেখছি যীশুখ্রীষ্ট তাঁর শিষ্যদের বলছেন : ‘শুয়োরের সামনে মুক্তো ছড়িও না।’ ধরা যাক একদল শুয়োরের সামনে মুক্তো ছড়ানো হল। তারা মুক্তো সম্বন্ধে কিই বা জানে? একইভাবে যার আত্মতত্ত্ব ধারণা করার প্রস্তুতি নেই সেই শিষ্যকে আচার্য ব্রহ্মবিদ্যা দান করেন না। এই হল বেদান্তের ‘অধিকারী ভেদ’। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ক্ষমতাও ভিন্ন ভিন্ন। সব মানুষ এক রকম হয় না। শিক্ষাদানকালে আচার্য ছাত্রদের মধ্য থেকে যোগ্য অধিকারী নিবার্চন করেন।
উপযুক্ত শিষ্য পেলে আচার্য প্রসন্ন হন। তখন তিনি শিষ্যকে পুরুষ তথা আত্মা তথা ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দেন। আচার্য স্বয়ং সেই পুরুষকে জেনেছেন। কালে তিনি সেই ব্রহ্মজ্ঞান শিষ্যকে দান করেন, ‘তত্ত্বতঃ’ অর্থাৎ শাস্ত্র অনুসারে।

।। মুণ্ডক উপনিষদের প্রথম মুণ্ডকের দ্বিতীয় অধ্যায়  সমাপ্ত।।

Tags: Mundaka UpanishadSanatan DharmaVedic Mantra
Previous Post

ইসরায়েল-বিরোধী মন্তব্যের কারণে ফরাসি সাংবাদিককে দেশে ঢুকতে দিল না ইসরায়েল 

No Result
View All Result

Recent Posts

  • পন্ডিতম্মন্য  মানুষরা জন্মমৃত্যুর নাগরদোলায় ঘুরতেই থাকে,তাঁরা নিজে অন্ধ হয়ে আর এক অন্ধকে পথ দেখাতে চায়  : আচার্য চানক্য
  • ইসরায়েল-বিরোধী মন্তব্যের কারণে ফরাসি সাংবাদিককে দেশে ঢুকতে দিল না ইসরায়েল 
  • হিন্দু ধর্মস্থলা কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্রে সামিল অভিনেতা প্রকাশ রাজ : এই ষড়যন্ত্রে ২০০ কোটি টাকার বাজেট আসে সিপিএম শাসিত কেরালা থেকে 
  • বন্দুকের মুখে বারবার ধর্ষণ করছিল বৃদ্ধ শ্বশুর : স্বামী তার বাবাকে সহযোগিতা করার পরামর্শ দেয়, প্রতিবাদ করলে ফোনে তিন তালাক 
  • আজানের সময় ভজন গাওয়ার অপরাধে পুজারিকে কুপিয়ে খুন, ঘাতক আতিকের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল ইউপির উন্নাও প্রশাসন 
  • প্রচ্ছদ
  • রাজ্যের খবর
  • দেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলার খবর
  • বিনোদন
  • রকমারি খবর
  • ব্লগ

© 2023 Eidin all rights reserved.

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
No Result
View All Result
  • প্রচ্ছদ
  • রাজ্যের খবর
    • কলকাতা
    • জেলার খবর
  • দেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলার খবর
  • বিনোদন
  • রকমারি খবর
  • ব্লগ

© 2023 Eidin all rights reserved.