এইদিন আন্তর্জাতিক ডেস্ক,০৫ নভেম্বর : সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে ফিরে আসছে বাংলাদেশের নারীরা । গত ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ জন নারী শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি (৯৭৯ জন) ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। উদ্বেগের বিষয় হল যে,তাদের মধ্যে অনেকেই অন্তঃসত্ত্বা ।
ঢাকা পোস্টকে সাভারের শিলা বেগম নামে এক নারী শ্রমিক সৌদি আরবে অবস্থানকালে যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা চমকে দেওয়ার মত । ভাইবোনের খরচ জোগাতে গৃহকর্মী হয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে মরুর দেশ সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি । তবে দেশটিতে যাওয়ার এক বছর না পেরোতেই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গত এপ্রিলে দেশে ফিরে এসেছেন ।ফেরার কারণ হিসেবে শিলা বলেন, ‘ওরা তো মানুষ নয় । দিন-রাত কাজ করায়, ঠিকমতো খেতে দেয় না। ঘুমাতে হতো রান্নাঘরে। বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না। জেলখানার মতো জীবন, বন্দি থাকতে হয়। সহ্য করতে না পেরে দেশ থেকে টাকা নিয়ে দেশে চলে আসি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের সঠিক হিসাব নেই সরকার কিংবা কোনো সংস্থার কাছে। তবে যারা আউটপাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে দেশে ফেরেন, তাদের হিসাব রাখে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৯৭৯ জন নারী কর্মী। অর্থাৎ ৫৮.৬২ শতাংশ ফেরত পাঠানো হয়েছে দেশটি থেকে। এ ছাড়া, জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা ৫২ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত ।
রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব থেকে পাঠানো হয়েছে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া, ঠিকমতো বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, শারীরিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা ফেরত আসেন।কর্মকর্তারা আরও জানান, দেশে ফিরে আসা নারী কর্মীরা কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ করেন। কেউ কেউ নির্যাতন-নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেন। যৌন নির্যাতনের শিকার কেউ কেউ ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে। কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হন।
একটি রিপোর্ট অনুযায়ী,ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের ৯৪% শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এবং প্রায় ৪৭% যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া অনেককে বিনা বেতনে কাজ করানো, অবরুদ্ধ করে রাখা এবং একাধিকবার হাতবদল করার মতো অভিযোগও রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে গৃহকর্মীর কাজের কথা বলে নেওয়ার পর যৌনকর্মে বাধ্য করা হয় অথবা শারীরিক নির্যাতনের ফলে অনেকে গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
অপর্যাপ্ত কারিগরি ও ভাষাগত প্রশিক্ষণ, দালাল চক্রের প্রতারণা, দুর্বল দ্বিপক্ষীয় শ্রম চুক্তি এবং সৌদিতে থাকা বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় দূতাবাসের পর্যাপ্ত ও কার্যকর আইনি বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে ।
মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন
সৌদি আরবের মক্কার মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের(চুম্বন) অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তারা হলেন—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তার। তবে এ সিদ্ধান্তের আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর আসার পর সৌদি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে চিঠি দিয়ে তাদের বিষয়ে তথ্য ও বিস্তারিত জানতে চেয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট। জেদ্দার পররাষ্ট্র দপ্তরে এই চিঠি পাঠানো হয়।বাংলাদেশকে না জানিয়ে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় দেশে সৌদি আরবের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নিয়েও।
ঢাকা পোস্টে বলা হয়েছে, বৈদেশিক শ্রমবাজার বহুমুখী করলেও বাংলাদেশ এখনো সৌদি আরবনির্ভরই রয়ে গেছে। দেশের শ্রমবাজার হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক, বিশেষ করে সৌদি আরবকেন্দ্রিক। এ ছাড়া, যেখানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে, বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে সবচেয়ে বেশি অদক্ষ কর্মী।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যার দুই-তৃতীয়াংশই অর্থাৎ ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন গেছেন সৌদি আরবে। আর চলতি বছর বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন, এর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদি আরবের।
নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে সৌদি পাড়ি দিয়েছিলেন দোহারের জাহানারা বেগম। কিন্তু শারীরিক নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে ফেরত আসেন তিনি। জাহানারা বলেন, স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তালাক হয়। ভাইদের পরিবারের বোঝা ছিলাম। সেজন্য নিজের যা ছিল সব বিক্রি ও ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলাম সুখের আশায়। কিন্তু জালিম মালিকের নির্যাতনের কারণে চলে এসেছি। আমার মালিকের চরিত্র খারাপ ছিল। কুপ্রস্তাব দিত, রাজি না হলে নির্যাতন করত।
শিলা-জাহানারার মতো ফিরে আসা নারী কর্মীদের অনেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করছেন। তবুও তারা বেঁচে তো দেশে ফিরেছেন। কারও কারও ভাগ্যে সেটিও জোটে না। তাদের স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়েই দেশে ফিরে আসে। প্রতি বছর এরকম শতাধিক নারীর কফিন আসে দেশে। মৃত্যুসনদে কারণ লেখা থাকে হয় ‘স্বাভাবিক’, নয়তো ‘আত্মহত্যা’।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে ৮২ শতাংশ কর্মীকে।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে নারী কর্মী পাঠাতে শুরু করে বাংলাদেশ । নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই সময় থেকে দেশটিতে নারী কর্মী পাঠাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন সময়ে নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে দেশটিতে কর্মী পাঠানো বন্ধের আলোচনাও হয়েছে। এদিকে সৌদি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে,নারী কর্মীদের না পাঠালে তারা বাংলাদেশের পুরুষ কর্মীদের গ্রহন করবে না।।
