চলতি বাদল অধিবেশনে সংসদে প্রিভেনশনস অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনর (সংশোধনী) বিল,২০২৬ পাশ হয়েছে। ২৯ জুলাই রাজ্যসভা এবং ৩০ জুলাই লোকসভায় বিলটি অনুমোদিত হয়। পরে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সম্মতিও মেলে। নতুন আইনে ‘বন্দে মাতরম’-এর মর্যাদা রক্ষায় অতিরিক্ত আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় গানের অপমান করা বা তার পরিবেশনে বাধা দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
কিন্তু প্রবীণ অভিনেত্রী বেগম আয়েশা সুলতানা ওরফে শর্মিলা ঠাকুর সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে ‘বন্দে মাতরম’ গানের প্রথম দুটি স্তবক সবার জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও, পরের স্তবকগুলিতে হিন্দু দেব-দেবীর রূপক থাকার কারণে একশ্বরবাদী বা ভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য তা সম্পূর্ণ গাওয়া কঠিন হতে পারে। তিনি বলেছেন,’ভারতে বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাসের মানুষ বসবাস করেন। অনেকেই এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, বহু ঈশ্বরে নয়। বন্দে মাতরমের একটি স্তবকে সব দেবতার বন্দনা করা হয়েছে। পড়লেই বুঝতে পারবেন, দেবতাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। যাঁরা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, তাঁদের পক্ষে দেবতাদের নাম উচ্চারণ করা কঠিন। তাই সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে গেলে প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া ভালো।’
তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় মুখ খুলেছেন আর এক অভিনেত্রী তথা বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াত।সাংসদ লিখেছেন,’একটি সাহিত্যের অংশ নিয়ে এমন সংকীর্ণ আর কৃত্রিম মনোভাব কেন! কবিতা বা গানে এক একটা শব্দ রূপক হিসেবে ব্যবহার হয়। কবি তাঁর মনের কল্পনা দিয়ে শব্দচয়ন করেন। আর বন্দে মারতম গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। শক্তিকে জাগ্রত করার কথা বলেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’ শর্মিলা ঠাকুর কীভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে ওই গানকে জড়িয়ে দিচ্ছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কঙ্গনা।
“বন্দেমাতরম” বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশ থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা উপন্যাসিক তসলিমা নাসরিন । এই বিষয়ে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন,”আমি নির্দ্বিধায় ‘বন্দে মাতরম্’ বলি। এই উচ্চারণে আমি কোনও ধর্মীয় পরিচয় ঘোষণা করি না; আমি স্বীকার করি আমার ইতিহাস, আমার শিকড়, আমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
আমি দেশভাগের পরে জন্মেছি, কিন্তু আমার বাবা-মা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মানুষ। ১৯৪৭ সালে একটি সীমান্তরেখা তাঁদের ভূগোলকে ভাগ করেছে। রাষ্ট্র ভাগ হয়েছে, কিন্তু ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি—এসব তো কাঁটাতারের নির্দেশ মেনে ভাগ হয়ে যায় না।”
তিনি লিখেছেন,”আমার বাঙালি পরিচয়ও কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে জন্মায়নি। তার শিকড় ঐতিহাসিক ভারতবর্ষের দীর্ঘ সভ্যতায়। বাংলা ভাষার বিকাশ সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশের দীর্ঘ ভাষাগত ধারার সঙ্গে যুক্ত; বাংলার সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ঐতিহ্য আছে, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারা আছে, রামায়ণ-মহাভারতের লোকায়ত রূপ আছে, সুফি প্রভাব আছে, ব্রাহ্ম আন্দোলন আছে, পাশ্চাত্য আধুনিকতার অভিঘাতও আছে। অর্থাৎ বাংলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে আদানপ্রদানের মধ্য দিয়েই নিজের স্বতন্ত্র রূপ তৈরি করেছে।”
তসলিমার কথায়,”কিন্তু সম্পর্কটি একমুখী নয়। বাংলা শুধু ভারতীয় সভ্যতার কাছ থেকে নেয়নি, ভারতীয় সভ্যতাকেও দিয়েছে অসামান্য চিন্তা, সাহিত্য, সংগীত, সংস্কার ও বিদ্রোহ। বাংলা ও ভারতবর্ষের সম্পর্ক অধীনতার নয়, বরং আত্মীয়তার, পারস্পরিক নির্মাণের।
এই কারণেই চর্যাপদ থেকে চণ্ডীদাস, বিদ্যাসাগর থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল, রোকেয়া থেকে জসীমউদ্দিন—এই সমগ্র উত্তরাধিকার আমার। আজকের রাষ্ট্রসীমা টেনে কাউকে ‘ভারতের’ আর কাউকে ‘বাংলাদেশের’ বলে আমার সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে ভাগ করা যায় না। রাষ্ট্রের পাসপোর্ট আছে, সংস্কৃতির নেই।”
বাংলাদেশি লেখিকা লিখেছেন,”ভারতীয় সভ্যতাও কোনও একটি ধর্ম, জাতি বা মতের সম্পত্তি নয়। বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু দর্শন, বহু বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দীর্ঘ সহাবস্থান এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে এটি তৈরি হয়েছে। এর শক্তি একরূপতায় নয়, এর শক্তি বহুত্বে। সেই বহুত্বেরই আমি উত্তরাধিকারী।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। কিন্তু আমার বাঙালি সাংস্কৃতিক ইতিহাস ১৯৭১ সালে জন্ম নেয়নি। আমার ভাষা তার চেয়ে বহু পুরোনো, আমার সাহিত্য তার চেয়ে বহু পুরোনো, আমার পূর্বপুরুষের ইতিহাস তার চেয়ে বহু পুরোনো। সেই ইতিহাসের শিকড় ঐতিহাসিক ভারতবর্ষের মাটিতে বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত।
তাই আমি যখন অখণ্ড ভারতমাতাকে প্রণাম করি, কোনও রাজনৈতিক অখণ্ড ভারতের দাবি করি না। আমি প্রণাম করি দেশভাগের আগের সেই সাংস্কৃতিক ভারতবর্ষকে—যার ইতিহাসে আমার পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীরা আছেন, যার সভ্যতার ভেতর দিয়ে আমার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে, এবং যাকে গড়ে তুলতেও বাংলা বিরাট অবদান রেখেছে।”
পরিশেষে তিনি লিখেছেন,”আমার জন্মরাষ্ট্রের বয়সের চেয়ে আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বয়স অনেক বেশি।দেশভাগ মানচিত্র ভাগ করেছে, আমার ইতিহাস নয়।সীমান্ত রাষ্ট্র নির্ধারণ করতে পারে; আমার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্ধারণ করতে পারে না।এই বোধ থেকেই আমি নির্দ্বিধায় বলি—বন্দে মাতরম্।”
উল্লেখ্য,শর্মিলা ঠাকুর মনসুর আলি খান পতৌদির সঙ্গে বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বেগম আয়েশা সুলতানা নাম নেন। যদিও নিজের কাজের সুবিধার্থে তিনি নতুন ইসলামি নাম ব্যবহার না করে এখনো পূর্বের নামই ব্যবহার করেন ।।
