জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্কুলের অবস্থার বিরুদ্ধে ফ্রান্স জুড়ে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ চলছে । দেশটির রাস্তা বর্তমানে অভিবাসীদের দখলে । দোকানপাট, বড়বড় স্টোর লুটপাট করা হচ্ছে । সবচেয়ে মজার বিষয় হল যে,যেসমস্ত বামপন্থীরা উদার অভিবাসনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করতেন, তাদের ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও রেয়াত করা হচ্ছে না৷ এমনই এক বামপন্থী নেত্রীর একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে । তিল তিল করে গড়ে তোলা নিজের দোকান লুট হতে দেখে দাঙ্গাকারীদের উদ্দেশ্যে তাকে চিৎকার করে বলতে শোনা যাচ্ছে : “আমি তোমাদেরই একজন! তোমরা এটা কেন করছো? দয়া করে, থামো!” তিনি অসহায়ভাবে চিৎকার করেন,তিনি তাঁদেরই একজন। তাঁদের সাহায্য করার জন্য তিনি ভোট দিয়েছিলেন। তাঁদের আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পক্ষেও তিনি ভোট দিয়েছিলেন । কিন্তু লুন্ঠনকারীরা তার সেই আর্তিতে সাড়া দেয়নি । ওই ফরাসি উদারপন্থী (লিবারাল ও কমিউনিস্ট) মহিলা বর্তমানে চিহ্নিত হচ্ছেন “ইউজফুল ইডিয়ট” নামে ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই বামপন্থী নেত্রীর নাম প্রকাশ্যে না আনা হলেও বলা হচ্ছে যে,ঘটনাটি ঘটেছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে । রবিবার সন্ধ্যাতেও প্যারিসের রু এতিয়েন মার্সেল-এ অবস্থিত শিনজো স্টোরটি লুটেরাদের হামলার শিকার হয়েছে । কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ওই বামপন্থী নেত্রী এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল । কারন,বলা হচ্ছে যে,এই সেই মহিলা যিনি কিছুদিন আগেও “স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম”, “রিফিউজিস ওয়েলকাম হেয়ার”, “নো টু ইসলামফোবিয়া এন্ড অ্যান্টি সেমিটিজম” এবং “স্টপ স্ক্যাপেগোটিং মাইগ্রেন্টস” লেখা পোস্টার হাতে প্যারিসের রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন । কিন্তু আজ তাকেই তার সদ্য লুট হওয়া স্টোরের সামনে কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে বলতে শোনা যাচ্ছে : “আমরা এমনটা চাইনি” ।
বহুল চর্চিত ওই বামপন্থী ফরাসি মহিলা সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা বলা হচ্ছে তার কিছু অনুবাদ তুলে ধরা হল : “সেই হতবাক ফরাসি মহিলা… তিনি ফরাসি বামপন্থী দলের একজন একজন কর্মী, উত্তর আফ্রিকার মানুষদের জন্য অভিবাসন উন্মুক্ত করার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, এবং যখনই তারা কোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয় ঘটায়, তিনি তাদের পক্ষ নেন, আর যারা এই বর্বরদের স্রোত থামাতে চায়, তাদের বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত করেন…
একটি অভিজাত এলাকায় তার একটি ছোট অভিজাত বুটিক আছে, তিনি তার দোকানকে লুটপাট ও চুরি থেকে বাঁচানোর জন্য সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, এবং যেহেতু তিনি একজন বিখ্যাত কর্মী… তিনি তাদের বলেন, “আমি অমুক, আশ্রয়ের জন্য আন্দোলনকারী, আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি তোমাদের এবং ফ্রান্সে তোমাদের প্রবেশ ও থাকার পক্ষ নিয়েছি।” তারা তার উপর থুথু ফেলে, তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এবং পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়। ভাগ্যিস তিনি এখনও বেঁচে আছেন।
আর তারা পুরো দোকানটা লুট করে নিল, মহিলাটির কপালে জুটল লোহার শিক, এক মুহূর্তে তার সারাজীবনের সংগ্রাম আর পরিশ্রম সব শেষ হয়ে গেল…সেখানে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে, বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এই চোর, দাঙ্গাবাজ, অপরাধী, বর্বর দলই হলো তারা, যাদেরকে সে সারাজীবন ধরে রক্ষা করে এসেছে, এবং তার দেশ আক্রমণ করে ধ্বংস করার জন্য তাদেরকে সমর্থন জুগিয়েছে।
উত্তর আফ্রিকার শরণার্থীদের পক্ষ নেওয়ার জন্য তার খ্যাতির কারণে, গতকাল সমস্ত ফরাসি গণমাধ্যম তার লুট হওয়া দোকানের সামনে তার ছবি আর তার গল্প প্রচার করছিল। বেচারি, তার পুরো জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল এবং সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার নিজের বোকামির মাত্রা ফ্রান্সকে এই সর্বনাশ আর ধ্বংসের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।”
আর একজন ফরাসি লিখেছেন : “তার জন্য আমার সত্যিই খারাপ লাগছে। কাউকে তার সারাজীবনের পরিশ্রম ধ্বংস না করার জন্য একদল উন্মত্ত জনতার কাছে কাকুতি-মিনতি করতে দেখাটা খুবই ভয়াবহ।
কিন্তু আরে, প্যারিসের একজন তরুণী, অবিবাহিতা উদ্যোক্তা? আমি বাজি ধরে বলতে পারি, সে বছরের পর বছর ধরে সেইসব রাজনীতিবিদদেরই ভোট দিয়ে এসেছে যারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে, আর যারা তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছে, তাদের সবাইকে সে তাচ্ছিল্যের সাথে বর্ণবাদী বলে আখ্যা দিয়েছে।
আর সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশটা হলো: আপনি তার পক্ষ নিয়ে, তার আর লুটপাটকারীদের মাঝে নিজেকে দাঁড় করিয়ে, তার ব্যবসা রক্ষা করতে গিয়ে নিজের মাথা ফাটিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যদি আপনি সেই লুটপাটকারীদের একজনকে গালি দিতেন, তাহলে সে প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাদের পক্ষ নিত এবং তাদের এই উদ্দেশ্যহীন ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে আপনার ভাষায় বেশি ক্ষুব্ধ হতো।
তাই হ্যাঁ, দোকানটার জন্য দুঃখিত। কিন্তু যারা তাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিল, তাদের প্রতি সে যতটুকু সহানুভূতি দেখিয়েছে, তার চেয়ে বেশি সহানুভূতি আমি তাকে দেখাতে পারি না।”
ওই ফরাসি বামপন্থী মহিলার ছবি দেওয়া “ইউজফুল ইডিয়ট” (useful idiot) /’ju:sfəl ‘idiət/ লেখা পোস্টারও ভাইরাল হয়েছে । যাতে আরও লেখা হয়েছে : বিশেষ ১. এমন একজন পশ্চিমা ব্যক্তি, যিনি শান্তি, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা বা মানবাধিকার রক্ষার কথা বিশ্বাস করে—অজান্তেই এমন সব কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ও চরমপন্থী আন্দোলনের স্বার্থসিদ্ধিতে সহায়তা করেন, যারা আসলে সেই মূল্যবোধগুলোকেই ধ্বংস করতে চায়। ইউরোপীয় সংস্করণ: এমন একজন ব্যক্তি, যিনি পশ্চিমা স্বাধীনতার সুযোগ ভোগ করেন, অথচ সেই শক্তিগুলোরই জয়গান গান যারা এই স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। আরও দেখুন: ‘কিয়ার্স ফর গাজা’ (Queers for Gaza), ‘চিকেনস ফর কেএফসি’ (Chickens for KFC)।”
জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্কুলের অবস্থার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভ সপ্তাহান্তে তীব্র আকার ধারণ করার পর কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে ফরাসি পুলিশ । প্রতিবেদন অনুযায়ী,এই অস্থিরতায় ২৫০০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ অস্থিরতা দমনের চেষ্টা করায় প্যারিস, বোর্দো, নিস ও লিওঁসহ বড় শহরগুলোতে সোমবার রাতে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়। কিছু বিক্ষোভকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলে।।

