এইদিন ওয়েবডেস্ক,কলকাতা,১৮ অক্টোবর : শনিবার মহাসপ্তমীর দিন সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজো কমিটির দুর্গাপূজা মণ্ডপে পদপৃষ্ঠ হয়ে ১৯ জন দর্শণার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ৷ আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন । এদিকে এই মর্মান্তিক গনমৃত্যুর ঘটনার পরেও ‘ঘৃণ্য রাজনীতি’ করার অভিযোগ উঠছে কালীঘাট তৃণমূলের সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে । তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের অন্যতম কর্মকর্তা মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো দীপ অধিকারীর গ্রেপ্তারির দাবি জানিয়ে “রাজধর্ম পালন” করার দাবি জানিয়েছেন । অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী ২০২৫ সালে দুর্গাপূজার সময় কলকাতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির “ডান্ডিয়া নাচ”-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ।
অভিষেক ব্যানার্জি চোরবাগানে পদপৃষ্ঠ হওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘চোরবাগান সর্বজনীন পুজো কমিটিতে শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপোর যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। অপরাধী ভাইপোকে জেলে কবে ঢোকাচ্ছেন Suvendu বাবু ? ১৮ জনের মৃত্যুর দাগ কিন্তু Double Engine Washing Machine এও উঠবেনা আর ভাইপোর সাথে বিজয় ওঝা আর তমোঘ্ন ঘোষকেও ভুলবেন না । রাজধর্ম পালন করুন।’
এদিকে শনি ও রবিবার মধ্যরাতে হাসপাতালের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেকের ওই পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন,’আর আমি বিগত সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ২০২৫ সালে দূর্গা পূজা ও লক্ষ্মীপূজার সময় দুটো ঘটনা ঘটেছিল । তার মধ্যে একটা কলকাতায় মাঝরাতে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টিতে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে ১৩ জন মারা গিয়েছিলেন , মনে আছে আপনাদের । তারপরে মুখ্যমন্ত্রীর ডান্ডিয়া নাচটাও আপনারা দেখেছিলেন। এবং গত বছর ৫ই অক্টোবর দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে হড়পা বানে প্রায় ১০০ জন মারা গিয়েছিলেন । সেদিন সরকারটাকে পুরো রেড কার্নিভালে আটকে রাখা হয়েছিল । সেটাও মানুষ দেখেছি । তাই সমালোচনা করার আগে নিজেদের কৃতকর্মের বিষয়ে একটু সজাগ হয়ে বলবেন৷ আমি এটা নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না ।’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন,’আমি প্রথম আটটা কুড়িতে সিপির কাছে খবর পাই । আমি মাননীয় গৃহমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলাম । আমি এখানে নটা পাঁচে এসেছি। এখন মধ্যরাত্রি একটা । আরো এক ঘন্টা আমি ঘটনাস্থলে যাব । এক ঘন্টা ভিজিট করব । তারপর ফিরে আসে ফের সকালবেলায় মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে নিয়ে আমি আহতদের দেখতে যাব । মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ নেব । মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে মুখ্য সচিবের কাছে ফোন করে বিস্তারিত বিবরণ নেওয়া হয়েছে । পি এম সাহেব নিজের টুইট করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন । আমরা এরকম একটা শোকের আবহে একযোগে কাজ করতে চাই ।’
তিনি বলেন,’১৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । একটা পরিবারের একাধিক সদস্যও আছে । বিহারের মুজাফফরপুরের দুজন আছে । আমি ১২-১৩ টি মৃতের পরিবারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছে । আমাদের মন্ত্রী, বিধায়ক, ডিজি এবং সিপি উপস্থিত ছিলেন । আমি তাদের প্রত্যেকের কাছে দুটো কথা বলেছি । এক হচ্ছে, কলকাতা পুলিশের এআরএস সিসিটিভি ফুটেজ কালেক্ট করেছে । যাদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল । তাদের যাদের যাদের মধ্যে ত্রুটি পাওয়া যাবে, সে ক্লাবের ভলেন্টিয়ার হতে পারে। অস্থায়ী হোম গার্ড হতে পারে । পুলিশের লোক হতে পারে । ক্লাব প্রাইভেট সিকিউরিটি এজেন্সিতে লাগিয়েছিল তারা হতে পারে । তাদেরকে কিন্তু এয়ার মার্ক করে আমরা লিগ্যাল অ্যাকশন নেব । একটা সুনির্দিষ্ট মামলাও ওখানে স্টার্ট করা হবে । কোন স্তরে কোন ত্রুটি রাখা হবে না, প্রাথমিকভাবে আমি এটা বলতে পারি ।’
মুখ্যমন্ত্রী এও বলেন,’কলকাতা হাইকোর্টের সম্মানীয় প্রধান বিচারপতিকে আমি অনুরোধ করব, একজন সিটিং বিচারকের নেতৃত্বে আমরা একটা সিট বানাবো । তারা তদন্ত করুন কলকাতা পুলিশ বা অন্য কারোর গাফেলতি আছে কিনা । যেহেতু পারমিশন নেওয়া পুজো ।’ তিনি বলেন,’ঘটনাস্থলেই ১৭ জনের মৃত্যু হয় । পরে আরজি কর হাসপাতালে এক শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় । অ্যাপোলেতে নিয়ে যাওয়ার পথে একজনের মৃত্যু হয় । ফরেন্সিক, এসটিএফ,দমকলের নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল থাকবে । ঘটনার ফ্যক্ট ফাইন্ডিং করব ।’
তিনি বলেন,’মোট ২৫ জন আহত হয়েছে৷ তার মধ্যে একজনার অবস্থা গুরুতর । ২৪ জন বিপদমুক্ত । আমি ভগবানের কাছে, মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করব তারা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যায় । তাদের সমস্ত চিকিৎসার দায়িত্ব সরকার নিয়েছে । যারা মারা গেছেন তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে আমরা ২৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেবো এবং একটি করে সরকারি চাকরি দেবো । যারা আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া এবং ৫ লক্ষ টাকা করে সহযোগিতা করা হবে ।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন,’মৃত্যুর কোন ক্ষতিপূরণ হয় না । কিন্তু বহু গরীব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ তাদের মধ্যে কেউ রিক্সা চালক, তার মেয়ে মারা গেছে । কেউ কাটা কাপড়ের কাজ করে মুড়াগাছাতে, তার কলেজ পড়ুয়া মেয়ে মারা গেছে। ছোট বাচ্চা মারা গেছে । প্রচুর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ তাদের জীবন হারিয়েছে । খুব মর্মান্তিক, দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক ঘটনা ।’
তিনি বলেন,’এর আগেও অনেক এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে । আমার মনে পড়ছে না যে,প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তারা এই ধরনের কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন । আমি অন্য কাউকে বলছি না । কারণ সোশ্যাল মিডিয়াতে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত কিছু লোক এটাকে নিয়ে লিখছেন । লিখতেই পারেন, ঘটনা ঘটেছে সরকারের সমালোচনা করবেন তাতে আমার কোন আপত্তি নেই । কিন্তু আমি খুব খুশি যে, ১৩ টা মৃতের পরিবার বলে গেছে যে, মুখ্যমন্ত্রী আপনার উপর আমাদের আস্থা আছে ; আপনি তদন্তও করবেন এবং পরিবারগুলোকে দেখবেন । এটা আমার কাছে বড় প্রাপ্তি ।’
মুখ্যমন্ত্রী পূজো কমিটিগুলির কাছে আহ্বান জানান, থিমের নামে মন্ডপের ভেতর অন্ধকার করে রেখে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করবেন না । মানুষের জীবন আরো মূল্যবান । পুজোর আরো যে কটা দিন রয়েছে আপনারা পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ মেনে কাজ করবেন, করজোড়ে বিনীতভাবে আপনাদের কাছে আবেদন করব ।।

